কারাগারের অভ্যন্তরে অপরাধের বিস্তার রোধ এবং বন্দী ব্যবস্থাপনা সুশৃঙ্খল করতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা বন্দীদের জন্য আলাদা কারাগার নির্মাণের প্রস্তাব করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। একই সাথে দেশের অপরাধের বহুমাত্রিক প্রকৃতি বিবেচনা করে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মাদক মামলার আসামি, কিশোর অপরাধী এবং মহানগর এলাকার বন্দিদের জন্য আরও তিনটি ভিন্ন ক্যাটাগরির বিশেষায়িত কারাগার স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কারা উপমহাপরিদর্শকের (ডিআইজি-প্রিজন) কার্যালয় থেকে গত ১৯ মে এ-সংক্রান্ত একটি সার-সংক্ষেপ ঢাকা আইজি-প্রিজনের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবটি যাচাই-বাছাই শেষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। তবে সরকারের নীতিনির্ধারক মহল থেকে ইতিমধ্যেই এ বিষয়ে নীতিগত সম্মতি মিলেছে বলে জানা গেছে।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও বেসরকারি হিসাব মতে, কক্সবাজারের ৩৩টি ক্যাম্পে বর্তমানে ১২ থেকে ১৫ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। এদের একটি অংশ সীমান্তপথে মাদক পাচার, অস্ত্র কারবার, অপহরণ, খুন এবং আরসা ও আরএসও-এর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতায় জড়িয়ে নিয়মিত গ্রেপ্তার হচ্ছে।
শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, বর্তমানে গড়ে হাজারখানেক রোহিঙ্গা বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছে। ১০৯ বছরের পুরোনো কক্সবাজার জেলা কারাগারের ধারণক্ষমতা মাত্র ৪০০ জন হলেও সেখানে গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার বন্দি থাকে, যার প্রায় অর্ধেকই রোহিঙ্গা।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় ডিআইজি-প্রিজন মোহাম্মাদ ছগির মিয়া এই সামাজিক বাস্তবতার ঝুঁকি তুলে ধরে বলেন, “রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি বন্দিদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বড় ফারাক রয়েছে। অথচ ধারণক্ষমতার চার-পাঁচ গুণ বেশি বন্দী থাকায় তাদের একই সেলে রাখতে হচ্ছে। ফলে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়ে একজনের অপরাধপ্রবণতা অন্যজনের মধ্যে সংক্রমিত হচ্ছে।”
কারা বিধির আধুনিকায়নের তাগিদ দিয়ে কর্তৃপক্ষ জানায়, বর্তমানে কারাগারে মাদক, নারী ও শিশু নির্যাতন, কিশোর অপরাধী এবং রাজনৈতিক মামলার বন্দীর সংখ্যাই বেশি। এর মধ্যে শুধু মাদক আইনের বন্দীই প্রায় ৩৫ শতাংশ। ব্রিটিশ আমলের কারাবিধি দিয়ে এই আধুনিক ও বহুমাত্রিক অপরাধের ব্যবস্থাপনা অসম্ভব।
এই সংকট উত্তরণে সার-সংক্ষেপে ৪টি নতুন সুনির্দিষ্ট কারাগারের পাশাপাশি নোয়াখালীর সমতল থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলায় ৭টি উপকারাগার (সাব-জেল) নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
এরই মধ্যে গত ৩১ মে চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সেখানে চট্টগ্রামের দ্বিতীয় কারাগার নির্মাণের বিষয়ে সম্মতি প্রকাশ করেছেন এবং এর জন্য জমিও নির্ধারণ করা হয়েছে।
ক্যাম্পের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ১৪ এপিবিএন-এর অধিনায়ক (অতিরিক্ত ডিআইজি) মোহাম্মদ সিরাজ আমীন জানান, বেকারত্ব, সীমিত শিক্ষার সুযোগ ও আর্থিক লোভের কারণেই রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ অপরাধে জড়াচ্ছে।
অন্যদিকে, কারাগারকে কেন্দ্র করে নতুন অপরাধী চক্র গড়ে ওঠার প্রবণতা ঠেকাতে এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান বলেন, “কারাগারে বসে বাইরে অপরাধ সংঘটনের পরিকল্পনা বা অপরাধীদের সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে তোলার অসংখ্য রেকর্ড আছে। এখন যদি শ্রেণিবিন্যাস করে বন্দীদের আলাদা রাখা যায়, তবে অপরাধের বিস্তার ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা অনেকটাই রোধ করা সম্ভব হবে।”
উল্লেখ্য, বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগের ১২টি কারাগারে মোট ধারণক্ষমতা ৭ হাজার ৭৭৫ জন হলেও সেখানে গড়ে ১৬ থেকে ২০ হাজার বন্দী থাকছেন। নতুন এই প্রস্তাবনা বাস্তবায়িত হলে আবাসন ধারণক্ষমতা আরও অন্তত ১০ হাজার বৃদ্ধি পাবে এবং কারা ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।
পূর্বকোণ/সিজান/পারভেজ

















