চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬

সর্বশেষ:

বোয়ালখালীতে দুই ভাইয়ের কৃতিত্ব খিতাপচর যেন এক টুকরো রাজশাহী

বোয়ালখালীতে দুই ভাইয়ের কৃতিত্ব

খিতাপচর যেন এক টুকরো রাজশাহী

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

৫ জুন, ২০২৬ | ১২:২৪ অপরাহ্ণ

গাছের একটি ডালে ঝুলছে বড় আকারের চারটি আম। ওজন দুই কেজির কাছাকাছি। আমের নাম নাকি ‘ফোর কে’। তাইওয়ানের জাত। এই আমের ওজন চার কেজি পর্যন্ত হয়। তাই নাম ‘ফোর কে’ রাখা হয়েছে। অল্প কিছু দূরে খালের ধারে ঝুলছে ‘ব্রুনাই কিং’। ওজন প্রায় আড়াই কেজি। ব্রুনাই শহরের নামে নামকরণ করা হয়েছে। এ আমের ওজন নাকি ৬-৭ কেজি হয়। আরেক সারিতে ড্রেনের ধারে দেখা গেল লাল রঙের লোভাতুর আম।

দেশি-বিদেশি নানাজাতের নানা নামের আম শোভা পাচ্ছে বোয়ালখালীর সারোয়াতলী ইউনিয়নের পূর্ব খিতাপচরে। দেশি জাত ছাড়াও বিদেশি অন্তত ১০ দেশের জাতের আম রয়েছে।

গত সোমবার বোয়ালখালী সদর থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন ধরে পৌঁছাই বেঙ্গুরা রেল স্টেশন। এরপর যাত্রা গ্রামীণ আঁকা-বাঁকা পিচঢালা পথ ধরে উপজেলার শেষ সীমানা পূর্ব খিতাপচর গ্রামে। মেসার্স হক এগ্রো খামারে।

হাজা-মজা একটি খাল পেরিয়ে বাগানে যেতেই চোখ যেন ছানাবড়া। বাগান সংলগ্ন পুকুরের এক পাড়ে সারি সারি আম গাছ। রাস্তার ধারে থোকায় থোকায় দুলছে দেশি নানা জাতের আম। আমের সঙ্গে আলতো হাত বুলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পুকুর ঘাটে যাই। পুকুর পাড় ও রাস্তার ধারে সারি সারি আমগাছে ঝুলছে কাঁচা-পাকা আম। যেন জিভে পানি এসে যায়। বাগানি তানভীরুল হক ইমন

বললেন, ‘পুকুর পাড়ে আমরুপালি ও বারি-৪ জাতের গাছগুলোর বয়স দেড় বছর। ভালো ফলন হয়েছে।’
বাগানে যেন এলাহিকান্ড। চারিদিকে শুধু আম আর আম। নানা জাতের নানা রঙের আম। পাচিং পদ্ধতিতে লাগানো হয়েছে আমগাছ। ড্রেন ও ছোট ছোট পুকুর ধারে শোভাপাচ্ছে আম আর আম। বেশির ভাগ ডালে ঝুলানো আম কাগজের টোঙায় (কাগজের প্যাকেট) মোড়ানো। বাগানি জানালেন, ২৫ হাজার আমে প্যাকেট লাগানো হয়েছে। প্যাকেট মুড়িয়ে দিলে আমের গুণগতমান ভালো থাকে। পোকা-মাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়।

এই বাগানের উদ্যোক্তা হলেন, তানভীরুল হক ইমন ও সাইদুল হক তুহিন। ২০২০ সালে কলেজ পড়ুয়া দুই ভাই ছোট পরিসরে পূর্বপুরুষের পতিত, ডোবা ও জঙ্গলাকীর্ণ জমিতে ফলবাগান শুরু করেছিলেন। তৎকালীন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আতিক উল্লাহর পরামর্শ ও সহায়তা কৃতজ্ঞচিত্রে স্মরণ করেন তারা।

তারা বললেন, দুই একর জমিতে আম, পেয়ারা ও বরই গাছ রোপণ করে বাগানের যাত্রা শুরু করেছিলেন। বগুড়া ও রংপুর থেকে চারা সংগ্রহ করেছিলেন। এখন বাগানের পরিধি প্রায় ৩০ কানি।

টি বাগানের জন্য সোনায় সোহাগায় পরিণত হয়েছে। হাজা-মজা পতিত জমি এখন সোনায় পরিণত হয়েছে। আম, বরই ও পেয়ারার জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। আমের জন্য মিনি রাজশাহী খ্যাতি পেয়েছে।

দুই ভাই বললেন, তাদের বাগানে দেশি আমের জাত ছাড়া থাইল্যান্ড, ব্রুনাই, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের অন্তত ১৪-১৫ জাতের আম রয়েছে। দেশি জাত ছাড়া থাইল্যান্ডের ফোর কে, কিউজাই, চিয়াংমাই, থাই বানানা, হানিডে, ডক থাই, রেড আইভেরী, আমেরিকার রেড পালমার, ব্রুনাই কিং, সূর্য ডিম মিলে ১০ এর বেশি জাতের আম উৎপাদন হয়।

চলতি মৌসুমে ১০ টন আম বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে বলে জানান তানভীর ও তুহিন। তাদের বাগানে উৎপাদিত আমসহ নানা ফলমূল সরাসরি বাগান থেকে ও অনলাইনে বিক্রি করা হয়।

তুহিন বললেন, তাদের বাগানে বর্তমানে ৮শ আমগাছ রয়েছে। প্রতিটি গাছে ভালো ফলন দিচ্ছে। ৮০ গাছ দিয়ে বরই বাগান শুরু হয়েছিল। এখন বরইগাছ আছে ৪৬৫টি। চলতি মৌসুমে ৫ টন বরই বিক্রি করেছেন।

খিতাপচর এলাকার এই মেসার্স হক এগ্রো খামার দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসেন। অনেকেই পরিবার নিয়ে আসেন। বাগান ঘুরে ঘুরে নিজের মতো করে ফলমূল সংগ্রহ করে ক্রয় করার সুযোগ রয়েছে।

শুধু আম নয়, পেয়ারা, বরই, লেবু, কলাসহ গাছে গাছে ঝুলছে নানা ফলমূল। শুধু কী তাই, আছে মাল্টা, লিচুও। চলতি মৌসুমে চায়না-৩ জাতের লিচুর ভালো ফলন হয়েছে। বাগানটি যেন দেশি-বিদেশি জাতের ফলমূলের ভান্ডার। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সবজি, গবাদিপশু ও মাছের সমন্বিত খামার। ছায়া হিসেবে রয়েছে তাদের বাবা বিদেশ ফেরত মিনারুল হক মিন্টু। বাবা ও দুই ছেলে-তিনজনের ইচ্ছেশক্তি ও কঠোর পরিশ্রমে তারা এখন কৃষির মডেল। কৃষি বিভাগের ঢাকা ও চট্টগ্রামের কর্মকর্তারা ছুটে যান তাদের খামারে। অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য আসেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও।

বাগান নিয়ে পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তানভীরুল হক ইমন বললেন, বাগানের ড্রেনে বাণিজ্যিকভাবে থাইল্যান্ডের মনোসেক্স পদ্ধতির তেলাপিয়া মাছের চাষাবাদ শুরু করার ইচ্ছে। এছাড়া বাইকুনুন পদ্ধতি আঙ্গুর চাষ শুরু করার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিশেষ জিওব্যাগে মাটি ও জৈবসার ব্যবহারে এ পদ্ধতিতে আঙ্গুর চাষ করা হয়।

পূর্বকোণ/আদর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট