আমার খুব কাছের বন্ধুর খুব মন খারাপ কারণ সে গত কয়েকদিন ধরে তার এক্সের প্রোফাইল স্টক করছিলো! এতদিন ব্লক লিস্টে ফেলে রাখার পর তার মনে হয়েছে যাই দেখে আসি কি অবস্থা!
ওর ভাষায় ‘দেখতে ইচ্ছা হয়েছিল এখন কার জীবন নষ্ট করছে’।
বেশ খানিকক্ষণ ঘুরে ফিরে ওর মনে হল, ওর এক্স খুব ভালো আছে। বিয়ে করেছে, টুইন বেবি হয়েছে ওদের।
বেশ অনেকগুলো পোস্ট পড়ে ওর আরও মনে হয়েছে যেসব ব্যাপার নিয়ে ওর মনে অনেক আফসোস ছিল, এইবার বিয়ের পর লোকটা আর এসব করছে না। এই বউকে খুব সুখে রেখেছে।
শুরুতে আমার একটু মেজাজ খারাপ হল। নিজের বিদেশি জীবনের যন্ত্রণায় আমি অতিষ্ঠ। সময় বলতে কিছু নাই জীবনে। এর মধ্যে কাছের লোকজনের দুঃখ দেখলে বেশি খারাপ লাগে।
সেই দুঃখ যদি আবার নিজের টেনে আনা হয়, তখন খারাপ হয় মেজাজ। আমি কাউকে ব্লক করেছি মানে সে আমার কাছে মৃত। আমি যত এসব দেখতে যাবো, তত মন খারাপ হবে। অনেক স্মৃতি ফিরে আসবে। মনে হবে ‘আমার সাথে অনেক অন্যায় করা হয়েছে। প্রতিবাদ করতে পারিনি, শাস্তি দিতে পারিনি। আমি আসলে বোকা। আমার সাথে তো এমনই হবে!’ জেনে শুনে কেন আমি এ টর্চার সেলে ঢুকবো?
মানুষ খুব চালাক প্রাণী। একই মানুষ সবার সাথে এক রকম আচরণ করে না। নরম মানুষকে যত সহজে মাড়িয়ে যাওয়া যায়, শক্ত কাউকে তত সহজে মাড়ানো যায় না। তার ওপর মানুষ বদলায়ও সময়ের সাথে। ভেঙ্গে যাওয়া সম্পর্ক থেকে অনেক কিছু শেখেও অনেক সময়।
বন্ধুর এক্সের ক্ষেত্রে এর যে কোনটা হতে পারে। ওর দুঃখ লাগছিলো এই ভেবে যে এই কাজগুলো ওর সাথে করলে ওর সম্পর্কটা টিকত! ওকে কেন এভাবে ট্রিট করলো না? ও ভালবাসতে শিখিয়ে দিয়ে এলো আর সে ভালোবাসা পাচ্ছে এখন আরেকজন।
বন্ধু একবারও এটা কন্সিডার করছে না যে ফেসবুকে যে জীবন দেখানো হয়, তার পুরোটা সত্যি না। আমরা কেউ আমাদের জীবনের কালো অধ্যায়গুলো ফেসবুকের হাইলাইটে রাখি না।
বাস্তব জীবনে ক্লান্ত হয়ে ফেসবুকে এলেও সবচে হাসিখুশি, সুখী ছবিটা পোস্ট করি।
আমার এক্স আমার প্রোফাইল দেখতে এলে আমার সুখ দেখে জ্বলে পুড়ে খাক হবে এই ভেবে সুখী ছবি তুলে ক্যাপশনও দিই প্রেমের কবিতা থেকে। হতে পারে তার এক্স আসলেই খুব ভালো আছে। হতে পারে যা দেখাচ্ছে তার ৮০% সুখে আছে। হতে পারে তেমন ভালো নেই। ফেসবুক দেখে কোন কিছু বিশ্বাস করার কোন মানে হয় না।
তারচেয়েও বড় কথা ওই মানুষটা এখন কেমন আছে এটা কোনভাবেই আর আমার বন্ধুর কন্সার্ন হওয়া উচিত না। যে ‘অতীত’ তাকে অতীতেই থাকতে দেয়া উচিত।
আমার বন্ধু মানুষটাকে বেশি ভালবেসেছে বলেই হয়তো এখনও মুভ অন করতে পারেনি। তার এও মনে হয়েছে যে এবার বিয়ে করে ভালো থেকে সেও দেখিয়ে দেবে।
আমি তাকে এবং তার মতো দুঃখ পাওয়া যারা লেখাটা পড়ছে তাদের সবাইকে বলতে চাই, যদি মনে হয় একটা সুন্দর সম্পর্কে গিয়ে সেটা ফেসবুকে পোস্ট করলে জীবনে সুখী হওয়া যাবে, করুক।
কিন্তু সেটা নিজের জন্য হোক। কাউকে দেখিয়ে দেয়ার জন্যে, প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে কিছু করে মানুষ আসলে তেমন সুখী হয় বলে আমার মনে হয় না। কেউ সত্যিকার সুখী হলে সে এক্সের প্রোফাইল ঘাটতে যায় না। সে তার বর্তমান জীবন নিয়ে এতো ব্যস্ত থাকে যে অতীতের পেছনে এ সময়টা দেবার কথা মনেই থাকে না তার।
কথায় আছে ‘Living well is the best revenge.’ আমি অনেক মানুষকে চিনি যারা তাদের জীবনে প্রচণ্ড ভালো আছে। কিন্তু ফেসবুকে তার কিছুই পোস্ট করে না তারা। এক দল করে না কারণ তারা বদনজরে বিশ্বাস করে। তাই সুখ ব্রডকাস্ট করে না। দ্বিতীয় দল সুন্দর একটা জীবন কাটাতে এতো ব্যস্ত যে সে জীবনের রিপোর্ট ফেসবুকে দেয়ার কথা মাথাতেই নেই তাদের।
ফেসবুককে জীবনে এতো সিরিয়াসলি নেয়ার কিছু নেই আসলে। ভালো থাকতে হবে নিজের জন্য, নিজের ভালোবাসার মানুষের জন্য। সেটা ফেসবুকে পোস্ট করাটা যদি মুখ্য হয়, কোথাও কিছু একটা সমস্যা আছে।
বন্ধু আমার জ্ঞানী জ্ঞানী কথা শুনে কান্না বন্ধ করে খুব ডিটারমাইন্ড হয়ে ফোন রেখেছে। আমি জানি সে আবার কাঁদতে কাঁদতে ফোন করবে আমাকে। এতো সহজে মানুষ বদলায় না। ওর মাথায় ঢুকেছে সে আর বাংলাদেশে থাকবে না। আমার মতো দেশ ছেড়ে দেবে। ওর সাথে IELTS এর প্রিপারেশন নিয়ে কথা বলতে বলতে আমার মনে হল লেজকাটা শেয়ালের গল্প। কেন কে জানে?
লেখিকা: কানাডা প্রবাসী লেখক এবং শিক্ষক।
পূর্বকোণ/জেইউ/পারভেজ


















