২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার সোনারগাঁ হোটেলে আয়োজিত মেডিকেল অনকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের (এমওএসবি) বার্ষিক সম্মেলনে প্রায় ৭০০ চিকিৎসক, শিক্ষানবিশ চিকিৎসক, অনকোলজি নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী অংশ নেন। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটির এই সম্মেলন ক্যানসার চিকিৎসার অগ্রগতি, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে মতবিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
এবারের সম্মেলনে কানাডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. মার্গট বার্নেল ক্যানসার চিকিৎসার পর রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা নিয়ে বক্তব্য দেন। আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজির (এএসসিও) পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ডা. পীযূষ শ্রীবাস্তব এমওএসবির সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। বাংলাদেশের অনকোলজি শিক্ষার উন্নয়নে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ডা. ফরহাদ হালিম ডোনারকে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়। আমার আলোচনার বিষয় ছিল ‘অনকোলজি প্রশিক্ষণে সমসাময়িক বৈশ্বিক মানদÐ ও বাংলাদেশ’। আলোচনায় যে প্রশ্নটি তুলেছি, সেটি আমাদের সবার- আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসার জন্য আমরা কি চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও কাজের সুযোগ দিতে পারছি?
বিশ্বের অনেক দেশে মেডিকেল অনকোলজি ও রেডিয়েশন অনকোলজি পৃথক বিশেষায়িত ক্ষেত্র। মেডিকেল অনকোলজিস্টরা কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি ও হরমোন চিকিৎসার মতো পদ্ধতিতে বিশেষজ্ঞ। রেডিয়েশন অনকোলজিস্টরা নির্ধারণ করেন কোন রোগীর রেডিওথেরাপি প্রয়োজন, কীভাবে তা নিরাপদে দেওয়া হবে এবং চিকিৎসার ফল ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কীভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। রোগীর চিকিৎসায় তাঁদের পরস্পরের সঙ্গে এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হয়।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন একজন চিকিৎসকই অনেক সময় কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপিÑদুই ধরনের চিকিৎসা দিয়েছেন। সীমিত জনবল ও যন্ত্রপাতির মধ্যে তাঁরা অসংখ্য রোগীর সেবা করেছেন। সেই অবদানকে সম্মান জানিয়েই বলতে হবে, চিকিৎসার জ্ঞান ও প্রযুক্তি এখন অনেক বদলেছে। দুই ক্ষেত্রেই দক্ষ হতে প্রয়োজন গভীর ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ। তাই মেডিকেল অনকোলজি ও রেডিয়েশন অনকোলজির জন্য পৃথক, সুস্পষ্ট প্রশিক্ষণপথ গড়ে তোলা জরুরি।
রেডিয়েশন অনকোলজির প্রশিক্ষণে একটি বড় বাধা সচল লিনিয়ার অ্যাকসেলারেটর বা ‘লিন্যাক’-এর স্বল্পতা। চিকিৎসার জন্য শরীরের কোন অংশ নির্ধারণ করতে হবে, আশপাশের সুস্থ অঙ্গ কীভাবে রক্ষা করা হবে, পরিকল্পনা অনুযায়ী রেডিয়েশন দেওয়া হচ্ছে কি নাÑএসব শুধু বই পড়ে শেখা যায় না। অভিজ্ঞ রেডিয়েশন অনকোলজি বিশেষজ্ঞ, মেডিকেল ফিজিসিস্ট, ডোসিমেট্রিস্ট ও রেডিয়েশন থেরাপি টেকনোলজিস্ট এর সমন্বয়ে গঠিত টিম এর সঙ্গে নিয়মিত কাজ করে শিখতে হয়। অথচ সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষানবিশ চিকিৎসকের সেই সুযোগ সীমিত। চট্টগ্রামেও সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষানবিশদের নিয়মিত সচল লিন্যাকে প্রশিক্ষণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা রয়েছে। উড়োজাহাজে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া যেমন পাইলট তৈরি করা যায় না, তেমনি রেডিয়েশন চিকিৎসার যন্ত্রপাতি থেকে দূরে রেখে পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ দেওয়া কঠিন। এর প্রভাব রোগীদের ওপরও পড়ে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সরকারি হাসপাতালে মাত্র পাঁচটি রেডিওথেরাপি যন্ত্র সচল থাকার কথা বলা হয়েছে। বড় কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আবার কোথাও কেনা যন্ত্র স্থাপন ও চালু করা যায়নি। একটি যন্ত্র কেনার পরও যদি তা রোগীর কাজে না আসে, তাহলে সেই বিনিয়োগের উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।
এখন প্রয়োজন প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা। প্রথমেই দেশের রেডিওথেরাপি যন্ত্রগুলোর হালনাগাদ হিসাব প্রকাশ করা উচিতÑকোথায় কতটি আছে, কোনগুলো সচল, কোনগুলো অচল এবং কেন। অচল যন্ত্র মেরামত ও আগে কেনা যন্ত্র চালুর কাজকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। লিন্যাক কেনার পাশাপাশি তার জন্য উপযুক্ত ভবন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, প্রশিক্ষিত জনবল, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও মাননিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হবে। যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচল লিন্যাক নেই, সেখানকার শিক্ষানবিশদের স্বীকৃত সচল কেন্দ্রে নির্দিষ্ট সময় হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের সুযোগ দিতে হবে। শুধু চিকিৎসা কার্যক্রম দেখার সুযোগ পেলেই প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ হয় না।
বাংলাদেশে ঠিক কতটি যন্ত্র ও কতজন প্রশিক্ষিত কর্মী প্রয়োজন, তারও নির্ভরযোগ্য হিসাব চাই। আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থার হিসাবে, ২০২২ সালে বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার নতুন ক্যানসার রোগী হওয়ার অনুমান করা হয়েছিল। তাঁদের কতজনের রেডিওথেরাপি প্রয়োজন হতে পারে এবং একটি সচল যন্ত্র বছরে কতজনকে চিকিৎসা দিতে পারবে, তা বিবেচনায় নিয়েই জাতীয় লক্ষ্য ও বাস্তবায়নের সময়সূচি নির্ধারণ করা উচিত।
সম্প্রতি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস আরও ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার আদেশ দিয়েছে। দেশের যোগাযোগ ও অর্থনীতির জন্য বিমান পরিবহনের গুরুত্ব রয়েছে। পাশাপাশি এই প্রশ্নও করা প্রয়োজন- ক্যানসার চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়াতে আমরা কতটা বিনিয়োগ করছি? উড়োজাহাজগুলোর দাম ও অর্থায়নের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ‘একটি উড়োজাহাজের দামে ৩৫-৪০টি লিন্যাক কেনা যাবে’-এমন হিসাব যাচাই ছাড়া নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। সরকার বিমান কেনা এবং রেডিওথেরাপি সম্প্রসারণÑউভয়ের পূর্ণ ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ করলে জাতীয় অগ্রাধিকার নিয়ে তথ্যভিত্তিক আলোচনা সম্ভব হবে।
দেশের ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা বিপুল রোগীর চিকিৎসার দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের নিষ্ঠাকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি কাজের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকদের দিতে হবে মানসম্মত প্রশিক্ষণ; রোগীদের দিতে হবে সময়মতো চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ। এমওএসবির সম্মেলনে যে আলোচনা হয়েছে, তাকে বাস্তব পরিবর্তনে রূপ দেওয়ার সময় এখনই।
লেখক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্টজন রেজিওনাল হসপিটাল, নিউব্রান্সউইক; এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।
পূর্বকোণ/ইবনুর

















