ফিলিস্তিন কি পশ্চিমের বিবেককে বদলে দিচ্ছে? প্রশ্নটি আজ আর কেবল মানবাধিকারকর্মীদের নয়, পশ্চিমা রাজনীতি ও কূটনীতিরও। গাজার দীর্ঘ যুদ্ধ, অসংখ্য প্রাণহানি, ধ্বংসস্তূপে পরিণত জনপদ এবং পশ্চিম তীরে অব্যাহত বসতি সম্প্রসারণ-সব মিলিয়ে ফিলিস্তিন প্রশ্নে পশ্চিমা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে যে পরিবর্তন শুরু হয়েছে, তা আর উপেক্ষা করার মতো নয়।
তবে এই পরিবর্তনকে ‘পশ্চিম ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চলে গেছে’-এমন সরল সমীকরণে দেখা ভুল হবে। পরিবর্তনটি বরং আরও গভীর। পশ্চিমা জনমতের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ এখন ইসরায়েলের নিরাপত্তার অধিকার এবং ইসরায়েল সরকারের প্রতিটি নীতির প্রতি সমর্থনকে এক করে দেখছে না। একই সঙ্গে তারা ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা, মর্যাদা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রীয় অধিকারের প্রশ্নকে সামনে আনছে।
যুক্তরাষ্ট্রেই এর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। গ্যালাপের ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জরিপে ৪১ শতাংশ আমেরিকান জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে তাদের সহানুভূতি ফিলিস্তিনিদের প্রতি; ইসরায়েলিদের প্রতি ৩৬ শতাংশ। মাত্র এক বছর আগে চিত্রটি ছিল উল্টো-ইসরায়েলিদের প্রতি ৪৬ শতাংশ এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি ৩৩ শতাংশ।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ, ৫৭ শতাংশ আমেরিকান একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পরিবর্তনটি আরও স্পষ্ট। ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের ৫৩ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল, যেখানে ইসরায়েলিদের প্রতি এই হার ২৩ শতাংশ।
এটি শুধু একটি জরিপের সংখ্যা নয়। এটি আমেরিকার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। কারণ আজকের তরুণেরাই আগামী দিনের ভোটার, নীতিনির্ধারক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৬ সালের জরিপও একই প্রবণতার আরেকটি ছবি তুলে ধরেছে। ইসরায়েলি জনগণের প্রতি আমেরিকানদের ইতিবাচক মনোভাব ২০২২ সালের ৬৭ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালে ৫২ শতাংশে নেমেছে। ইসরায়েল সরকারের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৩২ শতাংশে; নেতিবাচক মনোভাব বেড়ে হয়েছে ৬২ শতাংশ। বিপরীতে, ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রায় ৫০ শতাংশে স্থিতিশীল রয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতি মানেই হামাসের প্রতি সমর্থন নয়। একইভাবে ইসরায়েলি জনগণের নিরাপত্তার প্রতি সমর্থন মানেই ইসরায়েল সরকারের সব কর্মকাণ্ডের অনুমোদন নয়। পশ্চিমা জনমতের একটি অংশ যেন ধীরে ধীরে এই মৌলিক পার্থক্যটি স্পষ্ট করে তুলছে।
ইউরোপে পরিবর্তনের রেখাটি আরও দৃশ্যমান!
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা, স্পেন, নরওয়ে, আয়ারল্যান্ডসহ পশ্চিমা দেশগুলো ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে অবস্থান কঠোর করেছে এবং দুই-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। যুক্তরাজ্য স্পষ্ট করেছে-৭ অক্টোবরের হামলার নিন্দা করলেও সেই হামলা গাজা ও পশ্চিম তীরে পরবর্তী সব কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেয় না।
এই অবস্থান পরিবর্তনের গুরুত্ব এখানেই যে, পশ্চিমা কূটনীতি দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও বাস্তব নীতিতে দুইয়ের মধ্যে যে ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন ছিল, তা অনেক সময় দেখা যায়নি।
আজ সেই পুরোনো ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের প্রাক্কালে প্রায় ১০০টি রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার অংশগ্রহণে গঠিত দুই-রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়নের জন্য বৈশ্বিক জোট ঘোষণা করেছে, ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন-দুই রাষ্ট্রের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পথ। তাদের ভাষায়, দুই-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে আন্তর্জাতিক ঐকমত্য সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য।
জনমত এগোচ্ছে; রাষ্ট্রনীতি কি এগোচ্ছে?
ইউরোপের কিছু সরকার নীতিগত ও কূটনৈতিক অবস্থান বদলালেও ওয়াশিংটনের ক্ষেত্রে পরিবর্তনটি এখনও সীমিত ও জটিল। মার্কিন সিনেটে পশ্চিম তীরে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদন চাওয়ার একটি প্রস্তাব ৪৭-৫১ ভোটে আটকে গেছে। ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক আচরণেও পুরোনো নীতির ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে।
অর্থাৎ আমেরিকার সমাজে যে পরিবর্তনের ঢেউ উঠেছে, ওয়াশিংটনের রাষ্ট্রীয় নীতি এখনও তার সঙ্গে পুরোপুরি তাল মেলাতে পারেনি।
প্রশ্ন হলো-আর কতদিন?
ইসরায়েলের জন্যও এটি একটি ঐতিহাসিক প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক সমালোচনা এখন আর শুধু গাজার যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, ভূমি দখল, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং সম্ভাব্য ভূখণ্ড সংযুক্তিকরণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সম্ভাব্য ভূখণ্ডই যদি ক্রমাগত সংকুচিত হতে থাকে, তাহলে দুই-রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবে কোথায় দাঁড়াবে?
আর এখানেই ফিলিস্তিন প্রশ্নের সবচেয়ে কঠিন সত্যটি সামনে আসে।
ইসরায়েলের নিরাপত্তা কি ফিলিস্তিনিদের অনিরাপত্তার ওপর স্থায়ীভাবে দাঁড় করানো সম্ভব?
অথবা উল্টো করে প্রশ্ন করলে-ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রীয় অধিকার অস্বীকার করে কি ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব?
সম্ভবত এখানেই পশ্চিমা জনমতের পরিবর্তনের গভীর তাৎপর্য।
ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় নীতি প্রায়ই জনমতের পরে পরিবর্তিত হয়েছে। প্রথমে মানুষের বিবেক বদলায়, তারপর বদলায় রাজনৈতিক ভাষা, এবং শেষ পর্যন্ত বদলায় রাষ্ট্রের নীতি। আজকের তরুণ আমেরিকান ও ইউরোপীয়রা যদি ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রীয় অধিকারের প্রশ্নকে আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়, তাহলে আগামী দিনের পশ্চিমা রাজনীতিতে এই প্রশ্ন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
ফিলিস্তিন তাই আর শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূখণ্ডগত বিরোধ নয়। এটি পশ্চিমা বিশ্বের ঘোষিত মূল্যবোধেরও পরীক্ষা-মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন, আত্মনিয়ন্ত্রণ, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের সমতার পরীক্ষা।
গাজা ধ্বংস হয়েছে অসংখ্য ঘরবাড়ি; কিন্তু একই সঙ্গে এটি পশ্চিমা সমাজে একটি পুরোনো রাজনৈতিক ধারণার ভিতও নাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রশ্নটি এখন শুধু-ইসরায়েলের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে?
ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় অধিকার ছাড়া ইসরায়েলের নিরাপত্তাই বা কতটা স্থায়ী হতে পারে?
পশ্চিমা জনমত হয়তো এই প্রশ্নটি ইতোমধ্যে করতে শুরু করেছে। এখন দেখার বিষয়-পশ্চিমা রাষ্ট্রনীতিও কি সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াবে?

















