তেল ছাড়া আজকের পৃথিবী এক দিনও চলে না। বাস-ট্রাক, কলকারখানা, সেচের পাম্প, রান্নার গ্যাস- সবকিছুর পেছনে আছে অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল। তাই প্রয়োজনের সময় সাশ্রয়ী দামে নিশ্চিতভাবে জ্বালানি পাওয়া অর্থাৎ জ্বালানি নিরাপত্তা, এখন প্রতিটি দেশের বড় দুশ্চিন্তা।
২০২৬ সালে এই দুশ্চিন্তা আরও গভীর হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বারবার ব্যাহত হয়েছে, সেপ্টেম্বরে ব্রেন্ট তেলের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ৯৭ ডলার ছাড়িয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেও অক্টোবরের মাঝামাঝি রাশিয়ার শোধনাগারে ড্রোন হামলার খবর এসেছে।
আমাদের অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ আসে সৌদিআরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে, অথচ দেশের একমাত্র শোধনাগার শুধু এক ধরনের তেলই শোধন করতে পারে। বাংলাদেশের জ্বালানি খাত তাই এক সংকটময় মোড়ে দাঁড়িয়ে।
সব তেল এক রকম নয়:
মাটির নিচের তেলকে সহজ উপমায় বোঝা যায়। হালকা তেল পাতলা ডালের মতো, সহজে গড়ায় এবং গরম করলেই পেট্রোল-ডিজেলের মতো দামি জিনিস বেশি দেয়। ভারী তেল ঘন খিচুড়ির মতো, আর অতিভারী তেল প্রায় আলকাতরার মতো আঠালো।
সৌদি আরবের ‘আরব লাইট’ বা ইরানের ‘ইরানিয়ান লাইট’ হালকা তেল। রাশিয়ার প্রধান রপ্তানি তেল ‘ইউরালস’ মাঝারি ঘনত্বের হলেও গন্ধক বেশি থাকায় শোধন কঠিন। আর ভেনেজুয়েলার ওরিনোকো অঞ্চলের তেল পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী তেলগুলোর একটি। তেল যত ভারী, তাতে তত বেশি গন্ধক, ধাতু আর বড় অণু থাকে, যা ভাঙতে আলাদা যন্ত্রপাতি লাগে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি: তেলের ‘তলা-ওপর’ ভাগাভাগি
চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ১৯৬৮ সালে চালু হওয়া ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) দেশের একমাত্র অপরিশোধিত তেল শোধনাগার, বার্ষিক ক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ টন।
শোধনের মূল কাজ হয় পাতন স্তম্ভ নামের একটি উঁচু টাওয়ারে। গরম তেলের বাষ্প ওপরে উঠতে উঠতে ঠাণ্ডা হয়, আর প্রতিটি উপাদান নিজের স্ফুটনাঙ্ক অনুযায়ী আলাদা তলায় জমে। একদম ওপরে গ্যাস ও এলপিজি, তার নিচে পেট্রোল ও ন্যাপথা, এরপর কেরোসিন ও ডিজেল, আর সবচেয়ে নিচে ফার্নেস অয়েল ও রাস্তার পিচ বিটুমিন। ন্যাপথা থেকে আরও প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় অকটেন।
কিন্তু ইআরএলে’র নকশা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের হালকা তেলের জন্য। ভারী তেল ঢাললে নিচে অবিক্রিত ঘন অবশেষ বেশি জমবে, যন্ত্রে ক্ষয় বাড়বে, আর বাড়তি গন্ধক সরানোর ব্যবস্থাও সীমিত। ফলে সরবরাহ বন্ধ হলে অন্য দেশের সস্তা ভারী তেল দিয়ে চালিয়ে নেওয়ার সুযোগ প্রায় নেই।
অন্য শোধনাগারে এআই যা করছে:
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই হলো এমন কম্পিউটার প্রোগ্রাম, যা বিপুল তথ্য থেকে শিখে ভবিষ্যদ্বাণী ও সিদ্ধান্তে সাহায্য করে। বড় তেল কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যে এর সুফল পাচ্ছে। সৌদি আরামকো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইমারসনের সঙ্গে মিলে শোধনাগার পরিকল্পনায় এআই-ভিত্তিক মডেল চালু করেছে। কোন তেল কতটা মেশাতে হবে, কী মানের জ্বালানি বেরোবে আর কত লাভ হবে, তা এটি আগেভাগে হিসাব করে দেয়; গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে এর পূর্বাভাস প্রায় ৯৮.৫ শতাংশ নির্ভুল বলে জানানো হয়েছে।
বিশ্বখ্যাত জ্বালানি কোম্পানি শেলও পিছিয়ে নেই। তারা কন্ট্রোল ভালভ, পাম্প ও কম্প্রেসরসহ ১০ হাজারেরও বেশি যন্ত্র এআই দিয়ে নজরদারির আওতায় এনেছে, যাতে কোনো যন্ত্র বিকল হওয়ার আগেই তা ধরা পড়ে। আবুধাবির এডনকও একই পথে হাঁটছে। তেলক্ষেত্র ও গ্যাস প্ল্যান্টের কম্প্রেসর ও ভালভের চাপ, তাপ ও কম্পনের তথ্য দেখে এআই আগেভাগেই জানিয়ে দেয় কোন যন্ত্র বিগড়াতে চলেছে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে এতে অপরিকল্পিত বন্ধ প্রায় অর্ধেকে নামানোর সম্ভাবনা দেখা গেছে। অর্থাৎ এআই কোনো দূরের কল্পনা নয়; অনেক দেশ এখনই একে কাজে লাগিয়ে খরচ কমাচ্ছে।
ভবিষ্যৎ প্রকল্পে এআই: যেকোনো উৎসের তেলের জন্য
ভারী ও অতিভারী তেল শোধনের প্রথম শর্ত যন্ত্রপাতি। দরকার ‘ভ্যাকুয়াম ডিস্টিলেশন’, ঘন অবশেষ ভেঙে আবার ডিজেল-পেট্রোল বানানোর ‘কোকার’ বা ‘হাইড্রোক্র্যাকার’, শক্তিশালী গন্ধক অপসারণ ব্যবস্থা এবং ঘন তেল গরম রাখার ট্যাংক ও পাইপলাইন। এআই যন্ত্রের সীমা বাড়াতে পারে না, কিন্তু এমন বহুমুখী শোধনাগারকে যেকোনো উৎসের তেলে লাভজনক রাখতে পারে।
কাজটা শুরু হবে তেল চেনা দিয়ে। জাহাজ বন্দরে ভিড়লেই সেন্সর আর এআই মিলে দ্রুত বলে দেবে তেলটি কতটা ভারী ও কতটা গন্ধকযুক্ত। এরপর এআই হিসাব করবে সৌদি, রুশ বা ভেনেজুয়েলার তেল কোন অনুপাতে মেশালে যন্ত্র নিরাপদে চলবে আর লাভ সবচেয়ে বেশি হবে। নকশার সময় থেকেই পুরো শোধনাগারের একটি কম্পিউটার-প্রতিরূপ, যাকে বলা হয় ‘ডিজিটাল যমজ’, বানিয়ে রাখলে নতুন তেল ঢালার আগেই পর্দায় ফলাফল পরীক্ষা করে নেওয়া যাবে।
শোধন চলার সময় এআই প্রতি মুহূর্তে তাপ ও চাপ ঠিক করে চাহিদা অনুযায়ী বেশি ডিজেল, অকটেন বা এলপিজি বের করে আনবে। ভারী তেলে যন্ত্রের ক্ষয় বেশি, তাই কোন যন্ত্রাংশ কবে বদলাতে হবে, তা-ও আগেভাগে জানিয়ে দেবে। এমনকি যুদ্ধ, জাহাজভাড়া ও দামের ওঠানামা বিশ্লেষণ করে কখন কোথা থেকে কোন তেল কেনা লাভজনক, সে পরামর্শও দিতে পারবে।
এ জন্য শুরু থেকেই পর্যাপ্ত সেন্সর, তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও সাইবার নিরাপত্তা রাখতে হবে, আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পেট্রোলিয়াম প্রকৌশল ও এআই, দুই ক্ষেত্রেই দক্ষ তরুণ তৈরি করতে হবে।
সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনই:
আশার কথা, দীর্ঘ বিলম্বের পর ইআরএলে’র দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল-২) এগোচ্ছে। এটি চালু হলে শোধন ক্ষমতা বছরে ১৫ লাখ থেকে বেড়ে ৪৫ লাখ টন হবে, তৈরি হবে ইউরো-৫ মানের জ্বালানি। নতুন ইউনিটটি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের তেলও শোধন করতে পারবে বলে জানানো হয়েছে; পরীক্ষামূলক উৎপাদনের আশা ২০২৯ সালে। তবে এটি অতিভারী তেল কতটা সামলাতে পারবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তাই নকশা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ভারী তেল ভাঙার যন্ত্র ও এআই-ব্যবস্থা এতে যুক্ত করা জরুরি।
যুদ্ধ কবে থামবে, কেউ জানে না। কিন্তু যে দেশ নানা উৎসের তেল নিজেই শোধন করতে পারে, সংকটে সে-ই টিকে থাকে। ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়ন তাই শুধু একটি কারখানার প্রকল্প নয়, বাংলাদেশের জ্বালানি স্বাধীনতার প্রশ্ন।
লেখক: অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী বিশ্বের শীর্ষ ২% বিজ্ঞানীদের একজন।


















