চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৩ জুলাই, ২০২৬

সরকারিতে ‘নিখোঁজ’ চিকিৎসক চাকরি করছেন বেসরকারিতে!

সরকারিতে ‘নিখোঁজ’ চিকিৎসক চাকরি করছেন বেসরকারিতে!

ইমাম হোসাইন রাজু

২৫ মে, ২০২৬ | ১১:২২ পূর্বাহ্ণ

সরকারি নথিতে তিনি ‘নিখোঁজ’ একজন চিকিৎসক। যার খোঁজে চমেক হাসপাতাল ও কক্সবাজারে হন্যে হয়ে চিঠি চালাচালি করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অথচ সেই বিসিএস কর্মকর্তা ডা. জাসটিন ক্লাম্প নিশ্চিন্তে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজে চাকরি করছেন ‘সহকারী অধ্যাপক’ হিসেবে। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি চাকরি থেকে আনুষ্ঠানিক অব্যাহতি না নিয়েই তিনি বেসরকারি মেডিকেলে যোগ দিয়েছেন। এ নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের মধ্যে আলোচনা- সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর। স্বাস্থ্যঅধিদপ্তরের এক প্রজ্ঞাপনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের রেডিওলজিস্ট ডা. জাসটিন ক্লাম্পকে কক্সবাজার ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতালে বদলি করা হয়। আদেশে ৫ কর্মদিবসের মধ্যে যোগদানের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তিনি কর্মস্থলে যাননি।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মং টিং ঞো ২০২৫ সালের ১১ মার্চ তারিখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো এক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেন, আদেশের ১১৮ দিন পার হলেও ডা. জাসটিন সেখানে যোগদান করেননি। চমেক হাসপাতাল থেকে ২০২৪ সালের ১২ নভেম্বর ছাড়পত্র (রিলিজ) নেওয়ার পর থেকেই তিনি দাপ্তরিকভাবে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত রয়েছেন। এর আগে ২০২৪ সালের ১৬ নভেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শৃঙ্খলা বিভাগ থেকেও চমেক হাসপাতালের পরিচালকের কাছে তাঁর অননুমোদিত অনুপস্থিতির বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দিন বলেন, বদলি আদেশ হওয়ার পরপরই ডা. জাসটিনকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র (রিলিজ) দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর তিনি কোথায় আছেন বা কেন নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি, সে বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।

 

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ডা. জাসটিন ক্লাম্প সর্বশেষ ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে সরকারি বেতন গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ, বদলি আদেশ জারির মাস থেকেই তিনি সুকৌশলে সরকারি হাজিরা ও বেতন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। যদিও সরকারি নিয়মানুযায়ী পদত্যাগপত্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত তিনি একজন সরকারি কর্মচারী। এই আইনি বাধ্যবাধকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গত ১১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে তিনি ‘চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজে’ রেডিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।

 

 

ইন্টারভিউ ছাড়া সরাসরি চেয়ারে! 

ডা. জাসটিনের এই দ্বৈত চাকরির চেয়েও বড় বিস্ময় ও অনিয়মের চিত্র সামনে এসেছে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজের নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ডা. জাসটিন ক্লাম্পকে সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের কোনো নিয়মই মানা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী চিকিৎসকদের উচ্চপদে নিয়োগের জন্য ইন্টারভিউ কার্ড ইস্যু করা, নিয়োগ বোর্ড গঠন করা এবং আনুষ্ঠানিক মৌখিক পরীক্ষা (ভাইভা) নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও ডা. জাসটিনের ক্ষেত্রে এর কিছুই করা হয়নি। কোনো নিয়োগ বোর্ড ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ একটি প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে তাকে এই পদে নিয়োগ দেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। স¤প্রতি এই অনিয়ম ও পরীক্ষা ছাড়া নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে খোঁজখবর শুরু হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের শীর্ষ প্রশাসকদের মধ্যে একে অপরের ওপর দায় চাপানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম আজাদ বলেন, যখন ডা. জাসটিন এখানে চাকরির আবেদন করেন, তখন স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছিল- সরকারি বিধিমালা ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে নিয়োগের সুযোগ নেই। তিনি কাগজপত্র জমা দিয়েছেন কিনা, সেই বিষয়টি কলেজের অধ্যক্ষ (প্রিন্সিপাল) ভালো বলতে পারবেন। এটি সম্পূর্ণ উনার আওতাধীন বিষয়।

 

জানতে চাইলে মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ অধ্যক্ষ ডা. অসীম কুমার বড়ুয়ার বলেন, ‘ডা. জাসটিনকে যেদিন নিয়োগ দেওয়া হয়, সেদিন আমি উপস্থিত ছিলাম না। বিষয়টি আমি জেনেছি পরে। নিয়োগের সময় তিনি একটি লিখিত কাগজ দিয়েছিলেন, কিন্তু সেটি পদত্যাগপত্র ছিল না। পরবর্তীতে তাকে মন্ত্রণালয়ের মূল কাগজপত্র দেখাতে বলেছি, যা তিনি এখন পর্যন্ত দেখাতে পারেননি।’

 

চাপের মুখে পদত্যাগপত্রের কপি সংগ্রহের উদ্যোগ

এদিকে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চাপের মুখে নিজের অনিয়মের অভিযোগ ঢাকতে মরিয়া হয়ে ডা. জাসটিন প্রথমে চমেক হাসপাতালে একটি ইস্তফাপত্র নিয়ে গেলেও চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করেনি বলে জানা গেছে। পরে গত ১৭ মে দুপুরে ডা. জাসটিন চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরে তড়িঘড়ি করে একটি আবেদন জমা দিয়ে আসেন। যদিও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একজন বিসিএস কর্মকর্তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ বা অনুমোদনের কোনো আইনি এখতিয়ার বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের নেই।

 

যা বললেন ডা. জাস্টিন ক্লাম্প

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ডা. জাস্টিন ক্লাম্প বলেন, ‘২০২৪ সালের নভেম্বরে চমেক থেকে আমাকে কক্সবাজারে বদলি করা হয় এবং ১২ নভেম্বর চমেক আমাকে ছাড়পত্র দিয়ে দেয়। কিন্তু আমি যেহেতু সরকারি চাকরি আর করব না সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তাই আমি কক্সবাজারে যোগদান করিনি।’

 

মন্ত্রণালয় থেকে পদত্যাগপত্র গৃহীত হওয়ার কোনো কাগজ বা প্রমাণপত্র আছে কি না- জানতে চাইলে তিনি সিস্টেমের দীর্ঘসূত্রতাকে দায়ী করে বলেন, ‘আমি সরাসরি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে (মিনিস্ট্রিতে) আমার রেজিগনেশন লেটার পাঠিয়ে দিয়েছি। সরকারি চাকরি অব্যাহতির প্রক্রিয়াটি অনেক দীর্ঘ, অনেকগুলো টেবিল ঘুরতে হয়, এটি একটি লম্বা প্রসেস। সেই প্রসেসটি বর্তমানে চলমান আছে। তবে সেই কপি সংগ্রহ রাখা হয়নি।’

 

বেসরকারি মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেলে কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়া যোগদানের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেহেতু মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ এখন রিসিভিং কপি চাচ্ছে, তাই আমি চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় থেকে পদত্যাগপত্রের একটি রিসিভিং কপি করিয়ে নিয়েছি। ওটা মা ও শিশু হাসপাতালে জমা দিয়ে দেব। এই কাগজ দিয়ে যদি তারা (কলেজ কর্তৃপক্ষ) মনে করে আমার চাকরি হবে, তাহলে করব; আর না হলে করব না।’

 

আইন কী বলে ?

সরকারি কর্মচারী (শৃংখলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী, যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে তা গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত কোনো সরকারি কর্মচারী অন্য কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারেন না। ডা. জাসটিন ক্লাম্প সরকারি বেতন স্কেল-৭ ভুক্ত একজন নিয়মিত কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তথ্য গোপন করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়ে দ্বৈত সুবিধার পাশাপাশি সরকারি চাকরির বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।

 

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট এস এম দিদার উদ্দিন বলেন, কোনো সরকারি কর্মচারী পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে তা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত অন্য কোনো লাভজনক প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন না। ঠিক তেমনি কোনো নিয়োগ বোর্ড ও ইন্টারভিউ ছাড়া একজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটিও সমভাবে অপরাধ করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন ছাড়া এই নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নিয়োগকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটিও দায় এড়াতে পারে না, কারণ এনওসি যাচাই করা তাদের আইনি দায়িত্ব।

পূর্বকোণ/পুষ্প

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট