চট্টগ্রাম শনিবার, ০৮ আগস্ট, ২০২৬

সর্বশেষ:

অগ্নিঝরা মার্চ

‘চমেক হাসপাতালে ৫ পাকিস্তানি কর্মকর্তাকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করি’

নিজস্ব সংবাদদাতা, রাঙ্গুনিয়া

১৮ মার্চ, ২০২২ | ১০:৩২ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পাহারার দায়িত্ব পালনকালে পাঁচজন পাকিস্তানি কর্মকর্তাকে একটি রুমে নিয়ে আটকে ব্রাশফায়ার করে আমরা হত্যা করেছি। খবর পেয়ে পাঞ্জাবি রেজিমেন্টের সৈন্যরা এসে আর্টিলারি গোলা নিক্ষেপ করলে কয়েক মাইল এলাকা ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যায়। এরপর পাহারারত আমরা ২২/২৩ জন পালিয়ে চান্দগাঁওয়ের হামিদচরে আত্মগোপন করি। সেখানেও গোলাবর্ষণ করে পাঞ্জাবি সৈন্যরা।

হামিদচর থেকে পালিয়ে সাম্পানে কর্ণফুলী নদী পার হয়ে বোয়ালখালীর বেঙ্গুরা ও পটিয়া মাদ্রাসা এলাকায় দায়িত্ব পালন করি। মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কথাগুলো বলেছেন তৎকালীন পাকিস্তান আর্মির ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক পদে কর্মরত আবদুল করিম (৭০)। তিনি রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার ৮ নং ওয়ার্ড সৈয়দবাড়ি গ্রামের মৃত সাইদুল হকের পুত্র। পাকিস্তান আর্মিতে কর্মরতকালীন একটি ত্রি নট ত্রি রাইফেল ও ৭০ রাউন্ড গুলি নিয়ে দেশ স্বাধীনের জন্য বেরিয়ে পড়া এই বীরযোদ্ধা স্বাধীনতার ৫০ বছর পর ২০২১ সালে এসে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ভাতা পাচ্ছেন।

মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা আবদুল করিম পূর্বকোণকে বলেন, ১৯৭০ সালের আগস্ট মাসে আমি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে সৈনিক পদে যোগদান করি। ৬ মাস ট্রেনিং শেষে প্রথম পোস্টিং হয় চট্টগ্রামের ষোলশহর সেনানিবাসে। ৭ মার্চ রেসকোর্সে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রেডিওতে শুনি। ঐতিহাসিক এই ভাষণের পরই মূলত বাঙালি সৈন্যদের মাঝে দেশ স্বাধীনের পক্ষে জনমত গড়ে উঠতে থাকে। ২৫ মার্চ কালরাতে ষোলশহর সেনানিবাসে বাঙালি সৈনিকদের ওপর হামলা করে পাঞ্জাবি সৈন্যরা। এসময় অনেক বাঙালি সৈন্যের মৃত্যু হয়।

তিনি বলেন, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধীনে ছিল ৫টি কোম্পানি। তৎমধ্যে আলফা, ব্রেভো ও চার্লি কোম্পানির সবাই ছিল বাঙালি সৈনিক। তখন চট্টগ্রাম শহরজুড়ে বঙ্গবন্ধুর ডাকে স্বাধীনতার পক্ষে আন্দোলন চলছিল। তখন পাকিস্তানি অফিসাররা ফন্দি আঁটেন কিভাবে তাদের শেষ করা যায়। তখন বলা হলো আন্দোলনরতদের দমিয়ে রোড পরিষ্কার করতে হবে এবং পাকিস্তানি ‘যুদ্ধ জাহাজ বাবর’ থেকে অস্ত্র খালাস করতে হবে। একথা বলে তিনটি কোম্পানির সৈন্যদের চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে যান। সেখানে নিয়ে তিন কোম্পানির সব বাঙালি সৈন্যদের ব্রাশ ফায়ার করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

রেজিমেন্টের বাকি দুটি কোম্পানি হলো হেড কোয়ার্টার ও ডালডা কোম্পানি। ডালডা কোম্পানির নেতৃত্বে ছিলেন বাঙালি অফিসার মেজর মীর শওকত আলী। তাঁর নেতৃত্বেই সৈনিক পদে ডালডা কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আবদুল করিম। ১১০ জনের ডালডা কোম্পানির সকলেই পাকিস্তানিদের প্রতিরোধে অংশ নিতে গিয়ে ১০/১২ জন্য নিহত হন।

তিনি আরো বলেন, পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও বীভৎসতা দেখে মূলত আমরা বঙ্গবন্ধুর ডাকে দেশ স্বাধীনের যুদ্ধে বেরিয়ে পড়ি। সেনানিবাস থেকে অস্ত্র ও গুলি নিয়ে বেরিয়ে পড়ার পর কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র, বোয়ালখালী ও পটিয়ায় পাকিস্তানিদের প্রতিরোধে অংশ নেন। এরপর পটিয়ার পাহাড় পেরিয়ে চলে যাই রাঙ্গুনিয়ার পদুয়া রাজারহাট ফরেস্ট অফিসে। সেপ্টেম্বর মাসে সেখান থেকে মুক্তিকামী যুবকদের একটি দলের সাথে পাহাড়ি পথে ঠেগামুখ হয়ে ভারতের দেমাক্রি পৌঁছান। তার কাছে থাকা ত্রি নট ত্রি রাইফেলটি দেমাক্রি ক্যাম্পে জমা দেন। সেখানে তিন মাস মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে সুবেদার মেজর টিএম আলীর নেতৃত্বে রাঙামাটির সাজেক বর্ডার দিয়ে আবারো বাংলাদেশে ঢুকেন। অবশ্য দেশে ঢুকার কয়েক দিনের মধ্যেই পাকিস্তানিরা অস্ত্র সমর্পণ করলে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ।

 

পূর্বকোণ/সাফা/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট