ফিফাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় প্রশাসনিক সংকট। সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বিতর্কিত বাণিজ্যিক পরিকল্পনা প্রত্যাহার করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলেও উয়েফা তাদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। বরং বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতা বয়কটের হুমকি বহাল রেখে তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে শুধু ক্ষমা নয়, আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন।
সমস্যার সূত্রপাত ফিফার বিতর্কিত ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ পরিকল্পনা ঘিরে। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরিকল্পনাটি সামনে আসতেই ইউরোপের বিভিন্ন ফুটবল সংস্থা, খেলোয়াড় প্রতিনিধি এবং প্রশাসনিক মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।
অভিযোগ ওঠে, সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে যথাযথ আলোচনা ছাড়াই ফুটবলের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদকে বাণিজ্যিক বিনিয়োগের আওতায় আনার চেষ্টা হয়েছে। বিতর্ক তীব্র হলে মরক্কোর রাবাতে জরুরি বৈঠক ডাকে ফিফা। সেখানে ইনফান্তিনো পরিকল্পনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন এবং ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান। একই সঙ্গে ফিফা জানায়, ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও স্বচ্ছতা ও সদস্য দেশগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু এই ঘোষণায় সন্তুষ্ট হয়নি উয়েফা।
তাদের বক্তব্য, শুধু পরিকল্পনা বাতিল করলেই হবে না; ভবিষ্যতে এমন উদ্যোগ আর নেওয়া হবে না এমন নিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের স্পষ্ট রূপরেখা প্রয়োজন। উয়েফা জানিয়েছে, তাদের বয়কটের হুমকি এখনও বহাল রয়েছে এবং আস্থা পুনর্গঠন না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান পরিবর্তনের প্রশ্নই ওঠে না। উয়েফার এই অবস্থান বিশ্ব ফুটবলে নতুন করে বিভাজনের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর অনেক ফুটবল সংস্থা ইতোমধ্যেই ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছে। ইংল্যান্ড, নরওয়ে, আলবেনিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার মতো কয়েকটি জাতীয় ফুটবল সংস্থা তাঁর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশনের পক্ষ থেকে ইনফান্তিনোর পদত্যাগের দাবিও তোলা হয়েছে।
অন্যদিকে ফিফা সভাপতির পাশে দাঁড়িয়েছে বিশ্বের অন্য কয়েকটি প্রভাবশালী অঞ্চল। দক্ষিণ আমেরিকার কনমেবল, আফ্রিকার কনফেডারেশন (ঈঅঋ), আর্জেন্টিনা ও মেক্সিকোর ফুটবল ফেডারেশন প্রকাশ্যে ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তাদের যুক্তি, ভুল স্বীকার করে পরিকল্পনা প্রত্যাহার করায় এখন প্রয়োজন সংলাপের মাধ্যমে সংকটের সমাধান।
এই বিভক্ত অবস্থান ফিফার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেও জটিল করে তুলেছে। একদিকে ইউরোপের আস্থাহীনতা, অন্যদিকে আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার সমর্থন দুই মেরুর এই অবস্থান ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে ২০২৭ সালের ফিফা সভাপতি নির্বাচন সামনে রেখে এই সংকটের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে।
খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক সংগঠন ফিফপ্রোও ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে। সংগঠনটি ফিফা কাউন্সিলে খেলোয়াড়দের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে।
সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা। উয়েফা যদি সত্যিই বয়কটের পথে যায়, তাহলে বিশ্বকাপ কিংবা বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টগুলো বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। ইউরোপের শক্তিশালী দলগুলো ছাড়া কোনো ফিফা প্রতিযোগিতার গ্রহণযোগ্যতা ও প্রতিযোগিতামূলক মান প্রশ্নের মুখে পড়বে। ফুটবল অর্থনীতির ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ, দর্শকসংখ্যা এবং বৈশ্বিক বিপণন সব ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। বিশ্বকাপকে ঘিরে বহু বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। ফলে প্রশাসনিক অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব মাঠের বাইরেও ব্যাপক হবে।
পূর্বকোণ/কিরণ/পারভেজ















