চট্টগ্রাম শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

সর্বশেষ:

পাহাড়েও উচ্চ রক্তচাপের থাবা

পাহাড়েও উচ্চ রক্তচাপের থাবা

ইমাম হোসাইন রাজু

১৭ মে, ২০২৬ | ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ

কঠোর পরিশ্রমী জীবনযাপনের কারণে পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হন কম। তবে সা¤প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের দুর্গম পাহাড়ি জনপদেও নীরব ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন। বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ বর্তমানে এই স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন। এর মধ্যে নারীদের তুলনায় পুরুষ এবং কম আয়ের মানুষের চেয়ে উচ্চ আয়ের মানুষরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন।

 

‘প্রিভ্যালেন্স এন্ড ডিটারমিনেন্টস অব হাইপারটেনশন এমাং অ্যাডাল্টস: আ ক্রস-সেকশনাল সার্ভে অব ওয়ান ট্রাইবাল এরিয়া ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় এই চিত্র উঠে এসেছে। জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের প্রাক্তন পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ আল শাফি মজুমদার এবং রাঙামাটি মেডিকেল কলেজে কর্মরত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. রাজীব ঘোষ-এর নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘ওয়ার্ল্ড জার্নাল অব অ্যাডভান্সড রিসার্চ অ্যান্ড রিভিউস’-এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, রোয়াংছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকায় বসবাসকারী ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী ৬৩৭ জন নারী-পুরুষের ওপর এই সমীক্ষা চালানো হয়। যার মধ্যে ৫২ শতাংশ পুরুষ এবং প্রায় ৭৮ শতাংশ ছিলেন মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, ত্রিপুরা ও চাকমাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য। বাকি ২২ শতাংশ ছিলেন বাঙালি জনসংখ্যা।

 

সমীক্ষায় দেখা যায়, সামগ্রিকভাবে পাহাড়ের ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ উচ্চ রক্তচাপের শিকার। তবে জেন্ডারভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নারীদের তুলনায় পুরুষরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত। যেখানে নারীদের আক্রান্তের হার ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ, সেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৩ দশমিক ১ শতাংশ। এছাড়া জাতিগত পার্থক্যের ক্ষেত্রে স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর (২৮.১%) তুলনায় বাঙালি জনসংখ্যার মধ্যে আক্রান্তের হার কিছুটা বেশি (৩৩.৬%)।

 

গবেষণার ডেটা বিশ্লেষণে আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। পাহাড়ে আর্থিক সচ্ছলতা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সাথে সাথে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, যাদের মাসিক আয় ৫০ হাজার টাকার উপরে, তাদের মধ্যে আক্রান্তের হার সর্বোচ্চ-৬৬.৭ শতাংশ। গবেষকদের মতে, প্রবীণ বয়স ও পুরুষ জেন্ডারের পাশাপাশি উচ্চ আয়, কাজের ধরন, শরীরের অতিরিক্ত ওজন (উচ্চ বিএমআই) এবং কোমরের পরিধি বৃদ্ধির সাথে উচ্চ রক্তচাপের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

 

বয়সের গ্রাফ বিশ্লেষণে দেখা যায়, কেবল প্রবীণরাই নন, পাহাড়ের তরুণ ও মধ্য বয়সীরাও এই ঝুঁকিতে পড়েছেন। ৩০ বছরের কম বয়সীদের ২২ শতাংশ, ৩০ থেকে ৪৪ বছর বয়সীদের ৩১.৭ শতাংশ এবং ৪৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সীদের ৩৫.৭ শতাংশই উচ্চ রক্তচাপের শিকার। তবে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে এই হার সবচেয়ে বেশি (৪১.৩%)।

 

গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় জনসংখ্যার ৮৬.৯ শতাংশ মানুষ উচ্চ রক্তচাপ এবং ৯১.২ শতাংশ মানুষ ধূমপানের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন। তবে এই সচেতনতা থাকা সত্তে¡ও আক্রান্তের উচ্চ হার জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাবিয়ে তুলছে।

 

গবেষণার সার্বিক পরিস্থিতি ও করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে এই গবেষণা দলের অন্যতম সদস্য রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রাজীব ঘোষ বলেন, পাহাড়ি এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস সমতলের চেয়ে ভিন্ন হলেও সেখানে উচ্চ রক্তচাপের এই প্রাদুর্ভাব বেশ উদ্বেগজনক। বিশেষ করে পুরুষদের মধ্যে আক্রান্তের হার বেশি হওয়ার পেছনে তাদের কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপ, জীবনযাপন এবং তামাকজাত দ্রব্য সেবনের মতো বিষয়গুলো ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।

 

তিনি আরও বলেন, উপজাতীয় অঞ্চলের বিশাল একটি অংশ সচেতন হওয়া সত্ত্বেও আক্রান্তের হার ঊর্ধ্বমুখী। এর অর্থ হলো, সচেতনতা থাকলেও দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তারা নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা বা আধুনিক চিকিৎসার আওতায় আসছেন না। পাহাড়ের এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এখন থেকেই নিয়মিত স্ক্রিনিং ও বিশেষায়িত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা প্রয়োজন।

 

এদিকে, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উচ্চ রক্তচাপের বিস্তার ঠেকাতে দ্রæত সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণের জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়মিত ফ্রি স্ক্রিনিং ক্যাম্পেইন পরিচালনা এবং প্রান্তিক মানুষকে স্বাস্থ্যকর জীবনধারা ও সুষম খাদ্যাভ্যাসে উদ্বুদ্ধ করতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।


বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক

 

বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস আজ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য-‘একসাথে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করি: নীরব ঘাতককে জয় করি’।

 

ওয়ার্ল্ড হাইপারটেনশন লিগের সদস্য হিসেবে হাইপারটেনশন কমিটি অব ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ ২০০৬ সাল থেকে ১৭ মে দিবসটি পালন করে আসছে।

 

ডব্লিউএইচও’র ২০২৫-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষ হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় মৃত্যুবরণ করেছে, যার ৫২ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ। বিশ্বে প্রতি বছর ১ কোটিরও বেশি মানুষ উচ্চ রক্তচাপের কারণে মারা যায়, যা সকল সংক্রামক রোগে মোট মৃত্যুর চেয়েও বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে-২০২৫’ অনুযায়ী বাংলাদেশে শীর্ষ ১০টি রোগের তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ।

 

দিবস উপলক্ষ্যে সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেও নানা আয়োজন করা হয়েছে। আজ সকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে হৃদরোগ বিভাগের উদ্যোগে সেমিনার ও র‌্যালি বের করা হবে। এছাড়া বিকেলে চট্টগ্রাম হার্ট ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ হাইপারটেনশন এন্ড হার্ট ফেইলিউর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে সার্কিট হাউজে বৈজ্ঞানিক সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে র‌্যালি ও আলোচনা সভাসহ নানা আয়োজন করা হয়।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট