চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়াম, এই একটি মাঠেই বছরজুড়ে ফুটবল, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিকস, কনসার্ট, মেলা, সরকারি-বেসরকারি অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজন। প্রশ্ন ওঠে একটি মাঠের ওপর এত চাপ রেখে কি একটি শহরের ফুটবল এগোতে পারে? শুধু ফুটবলই নয়, কোন ক্রীড়া ইভেন্টই কী সাফল্যের ধারায় পথ চলতে পারে! ক্রীড়াপ্রেমী যে কেউই বলবেন, অসম্ভব। বর্তমান ক্রীড়া বান্ধব সরকার তাহলে কেন চট্টগ্রামের খেলাধুলায় গতি ফেরাতে অবকাঠামো উন্নয়নে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নিচ্ছে না?
শুধু অবকাঠামোই নয়, চট্টগ্রামের ফুটবলে কেন তারকা হারিয়ে গেলো, ঠিক কী কারণে দর্শক শূন্য হয়ে পড়লো জেলা স্টেডিয়ামের গ্যালারি, সুনির্দিষ্ট কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করলে অতীতে সেই জৌলুস ফিরে আসবে চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গনে, বিশেষ করে ফুটবলে? সমাধানের পথ বাতলে দিয়েছেন চট্টগ্রামের কয়েকজন বর্ষীয়ান ক্রীড়া সংগঠক। তাঁরা হলেন, বাফুফে কাউন্সিলর ও সাবেক ফুটবলার এস এম শহীদুল ইসলাম, চট্টগ্রাম ফুটবল কোচেস এসোসিয়েশনের আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম লেদু, সিজেকেএস ক্লাব সমিতির অতিরিক্ত সাধারণ সম্পাদক আ ন ম ওয়াহিদ দুলাল, সিজেকেএস কাউন্সিলর ও ক্রীড়া সংগঠক সাইফুল আলম খান ও সিডিএফএ যুগ্ম সম্পাদক ইয়াছির আরাফাত চৌধুরী।
ঘরোয়া ক্রীড়াঙ্গনে সিজেকেএস ‘ক্যালেন্ডার’ প্রায় থমকে আছে গেলো দুটি বছর। এরমধ্যে সর্বশেষ ফুটবল লিগ মাঠে গড়িয়েছিল ২০২৩ সালে। একে তো দর্শক শূন্যতা, তার উপর লিগ না থাকার প্রভাব পড়ছে পুরো ক্রীড়াঙ্গনেই। বোদ্ধামহল বলছেন, বাফুফের এক খেলোয়াড় এ লিগ নীতিই ধ্বংস করছে দেশের ফুটবলে দর্শক উন্মাদনা। কারণ ঘরোয়া আসরে তারকা ফুটবলার না থাকলে দর্শক আসবে না আর দর্শক না থাকলে স্পন্সরও আসবে না। বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকে পরিচর্যা না করলে পাইপলাইনে খেলোয়াড়ও উঠে আসবে না, সাথে লিগ যদি অনিয়মিত হয়ে পড়ে, ফুটবলারদের রুটি-রুজিতেও পড়বে টান। সুবাদে-সমস্যার পাহাড় ডিঙ্গাতে পারবে না ‘সম্ভাবনা’। এই মুহূর্তে ঠিক এটাই ঘটছে চট্টগ্রামের ফুটবলে।
স্বাধীনতার পর মাঠে থেকেই দেখেছেন চট্টগ্রামের ফুটবলের সুদিন, পরে কোচ হয়ে অবদান রেখেছেন ফুটবলার তৈরির। প্রিয় ফুটবলাঙ্গনে ৫৩টি বছর কাটিয়ে দিয়েছেন নজরুল ইসলাম লেদু। বাংলাদেশের খ্যাতনামা কোচদের একজন লেদু বলেন, খেলোয়াড়দের জন্য আর্থিক নিরাপত্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে ক্রিকেটের সাথে তুলনা করলে ফুটবলারদের অবস্থা সুখকর নয়। আমাদের সময় ফুটবলাররা ভালো খেললে স্কুল কলেজে এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তির বিবেচনায় ‘বিশেষ’ সুবিধা পেতেন। অনেক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান বা সরকারি পর্যায়েও মিলতো চাকুরি।
এই সংস্কৃতি এখন প্রায় নেই। উদাহরণ হিসাবে তিনি টেনে আনেন ঢাকা লিগে বসুন্ধরা এফসি’র প্রসঙ্গ। দলটি ক্লাব ফুটবলে নাম লেখানোর পর ফুটবলারদের চাহিদা বেড়ে যায়, সাথে পারিশ্রমিকের অঙ্কও। নজরুল ইসলাম লেদু যোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘ক্রীড়া হলে পেশা-পরিবার পাবে ভরসা’। তাঁর এই স্লোগানকে বাস্তবে রূপায়িত করতে হলে একাডেমি পর্যায়ে ছেলে- মেয়েদের লেখাপড়ার নিশ্চয়তার পাশাপাশি উন্নত ডায়েটিং ও চাকরির নিশ্চয়তা দেয়া গেলে বাংলাদেশে ফুটবলের সামগ্রিক দৃশ্যপটই পাল্টে যাবে। সরকার কাজ শুরু করেছে, সাথে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল ইসলামের আন্তরিকতা যোগ হলে, আগামী কয়েক বছরে সুফল পাবে চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশের ফুটবল।
আ ন ম ওয়াহিদ দুলাল গুরুত্বারোপ করলেন, খেলার মাঠের সংকট নিরসনের উপর। তিনি বলেন, মাঠই যদি না থাকে খেলবো কোথায়। এরসাথে উঠতি ফুটবলারকে যদি সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা দিতে না পারি, কোন ক্রীড়াবিদই তার সেরাটুকু দিতে পারবে না। আগে চট্টগ্রামে কাস্টমস, পোর্ট, জুট মিলস, স্টিল মিলসের মতো দলগুলো প্রথম বিভাগে খেলত এবং সেখানে খেলোয়াড়দের চাকরির ব্যবস্থা হতো। কিন্তু এখন এসব প্রতিষ্ঠানে স্পোর্টস টিম বা অফিস টিম প্রায় নেই বললেই চলে। বর্তমানে আনসার, নৌবাহিনী, সেনাবাহিনী বা বিমান বাহিনীতে মাস্টার রোলে কিছু সুযোগ দেওয়া হলেও কর্পোরেট ও সরকারি খাতগুলোতেও স্থায়ী চাকরির সুযোগ ফেরানো দরকার।
বতর্মানে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ক্রীড়াবিদদের রুটি-রুজির প্রতি নজর দিয়ে নিয়মিত টুর্নামেন্ট আয়োজন করছেন, অনেককে আবার চাকরির ব্যবস্থাও করে দিচ্ছেন। তাঁর এই আন্তরিকতা অন্য প্রতিষ্ঠানের বেলায়ও যদি দেখা যেতো, ক্রীড়াবিদরা আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে মাঠে সেরাটুকু দিতে পারতেন। ফুটবল নিয়ে নিয়মিত কাজ করছে সিডিএফএ। ২৪-এর পট পরিবর্তনের পর গেলো ২টি বছর ঘরোয়া ফুটবলে থমকে গেলেও মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, বিএনপির ক্রীড়া বিভাগ, সিজেকেএস কাউন্সিলর আবুল হাসেম বক্কর, সিজেকেএস ক্লাব সমিতি ও সিডিএফএ সাম্প্রতিক সময়ে অনূর্ধ্ব-১৩ (বাছাইপর্ব শেষে এখন শুরুর অপেক্ষায়) আয়োজন করে চেষ্টা করছেন ক্রীড়াঙ্গনকে চাঙ্গা রাখার। তবে বোদ্ধামহল বলছেন, জেলা ক্রীড়া সংস্থায় নির্বাচন যেমন জরুরি, তেমনই নির্বাচিত নেতৃত্ব আসলে ক্যালেন্ডার ইভেন্টগুলো প্রাণ ফিরে পাবে।
বিষয়টির উপর গুরুত্বারোপ করে সাইফুল আলম খান বলেন, শুধু সংগঠক বা আয়োজকদের দিকে আঙ্গুল তুলেই সমাধান আসবে না। আজকের কিশোর তরুণরা ক্রীড়া বিমুখ। যতটা সময় তাদের অনেকে প্রযুক্তি পণ্যে সময় কাটান তার কিছুটা মাঠে দিলে শরীর-মন বিকাশে যেমন সহায়ক হবে, তেমনই লেখাপড়ায়ও সেটা ভূমিকা রাখবে। মাঠ সংকট প্রসঙ্গে তিনি যোগ করেন, নগরায়নের এই সময়ে মাঠ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এরমাঝে যে সব স্কুল ও কলেজের নিজস্ব মাঠ আছে, তার অধিকাংশই উন্মুক্ত নয়। এই মাঠের ব্যাপারে তিনি কর্পোরেট হাউজগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বসুন্ধরা কিংস অ্যারিনা বাংলাদেশের আধুনিক ভেন্যুর ভাবনাই পাল্টে দিয়েছে। চট্টগ্রামেও এমন অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যারা উদ্যোগ নিলে আধুনিক ভেন্যু পেতে পারে চট্টগ্রামও।
ফুটবলে মেয়েরা সাফল্য পাচ্ছে বলেই কর্পোরেট হাউজসহ সবার নজরই তাদের দিকে। প্রবাসী ফুটবলারদের ভিড়ে ছেলেদের জাতীয় দলেরও ‘গ্ল্যামার’ অনেকাংশে বেড়েছে। তারা যদি ভালো ফল উপহার দিতে পারে, নিশ্চিতভাবেই স্পন্সররাও ফুটবলমুখী হবে। অন্যদিকে, গেলো দুটি বছর ফুটবল লিগ না হওয়ায় চট্টগ্রামের পুরো ফুটবল আবহেই বড় ধাক্কা লেগেছে। যে কারণে নিয়মিত ফুটবলারদের অনেকেই হয় পেশা পরিবর্তন করেছেন কিংবা পাড়ি দিয়েছেন প্রবাসে।
ইয়াছির আরাফাত চৌধুরী বলেন, ফুটবলের সত্যিকারের উন্নয়নে ১৩, ১৫ ও ১৭ বছর বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট নিয়মিত আয়োজনের পাশাপাশি বয়স জালিয়াতি ও স্বজনপ্রীতি বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে বয়সের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খেলোয়াড় বাছাই নিশ্চিত করা জরুরি। খেলোয়াড়দের ঝরে পড়ার পেছনে মাদকাসক্তি ও পারিবারিক পরিবেশকেও দায়ী করেন তিনি। যোগ করেন, চট্টগ্রামের বিকেএসপিকে ঢাকার সাভারের বিকেএসপির আদলে কার্যকর করা গেলে খেলোয়াড় তৈরির পাইপলাইন শক্তিশালী হবে। চট্টগ্রামে রয়েছে ৪২টি ফুটবল একাডেমি। প্রতিটিই বাফুফে নিবন্ধিত। অথচ অধিকাংশ একাডেমিরই নিজস্ব মাঠ, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা বা সাংগঠনিক কাঠামো নেই। তাই গ্রাসরুট ফুটবল উন্নয়নে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
সবশেষে চট্টগ্রামের ফুটবলের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সিডিএফএ সভাপতি এস এম শহীদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে তৃণমূল থেকে কাজ করলে বাংলাদেশের ফুটবলও এগোতে পারে। ভারতের ‘ভিশন ২০৪৭’ কর্মসূচির উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়, ৪ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। বাফুফেও এই কাজটি করতে পারে, একাডেমিগুলোকে যথাযথ তদারকির মধ্যে এনে। জেলা পর্যায়ে আমাদেরও একটি ভিশন থাকা দরকার। বেশি না হোক অন্তত ২০৩০ পর্যন্ত। ঘরোয়া পর্যায়ে ডিএফএ’র জেলা পর্যায়েই এটা সম্ভব।
স্কুল ফুটবল টুর্নামেন্টকে ইতিবাচক উল্লেখ করে তিনি বলেন, বয়সভিত্তিক খেলায় কঠোর নিয়ম না থাকায় বেশি বয়সের খেলোয়াড় মাঠে নামানোর সুযোগ তৈরি হয়। এতে প্রকৃত প্রতিভারা পিছিয়ে পড়ে। বয়স যাচাইয়ে ছবি সংবলিত ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি।সিডিএফএ সভাপতি বলেন, দীর্ঘদিন লিগ না হওয়ায় খেলোয়াড়েরা নিয়মিত প্রতিযোগিতার বাইরে। অনেকে বিচ্ছিন্ন কিছু ম্যাচ খেলে জীবিকা চালাচ্ছেন। ঘরোয় লিগ যত দ্রুত সম্ভব চালু করতে হবে। চট্টগ্রামের ১৬ উপজেলায় মাঠকেন্দ্রিক ছোট ছোট ক্রীড়া হাব গড়ে তোলা যেতে পারে। উপজেলা প্রশাসন, ক্রীড়া সংস্থা, সিডিএফএ ও সিজেকেএস সমন্বিতভাবে কাজ করলে তৃণমূল থেকে প্রতিভা উঠে আসার সুযোগ বাড়বে।
পূর্বকোণ/নুসরাত

















