চট্টগ্রাম শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬

মুস্তফা জানে রহমত পে লাখো সালাম: স্মৃতি, ভক্তি ও এক অমর নাতে রাসুল

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন

২৮ আগস্ট, ২০২৬ | ১২:০৮ অপরাহ্ণ

প্রতি বছর ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) এলেই চট্টগ্রামের আকাশ-বাতাস যেন এক পরিচিত সুরে ভরে ওঠে। অলিগলি, মহল্লা, মসজিদ-মাদ্রাসা কিংবা বিভিন্ন ধর্মীয় সমাবেশের মাইকে ভেসে আসে-  ‘মুস্তফা জানে রহমত পে লাখো সালাম।’ বহু প্রজন্মের মানুষের কাছে এই সুর শুধু একটি নাতে রাসুল নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শৈশবের স্মৃতি, পাড়া-মহল্লার আবহ, ধর্মীয় উৎসব এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।

আমাদের অনেকেই ছোটবেলা থেকে এই নাত শুনে বড় হয়েছি। হয়তো তখন এর কঠিন উর্দু, ফারসি ও আরবি শব্দগুলোর অর্থ বুঝতাম না। কিন্তু সুরের মধ্যে যে ভালোবাসা, যে আবেগ এবং যে শ্রদ্ধা ছিল, তা বুঝতে ভাষাজ্ঞানের প্রয়োজন হতো না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন এর শব্দগুলোর অর্থ জানার সুযোগ হয়, তখন বোঝা যায়—শৈশবে কানে শোনা সেই নাতের প্রতিটি পঙ্ক্তির পেছনে রয়েছে গভীর কাব্যিকতা ও ধর্মীয় ভাবনা।

এই বিখ্যাত নাতে রাসুলের রচয়িতা ইমাম আহমদ রেজা খান বেরেলভী (১৮৫৬-১৯২১), যিনি ‘আ‘লা হযরত’ নামেও পরিচিত। ব্রিটিশ ভারতের বেরেলিতে জন্মগ্রহণকারী আহমদ রেজা খান ছিলেন একজন বিশিষ্ট সুন্নি ইসলামি আলেম, হানাফি ফকিহ, ধর্মতাত্ত্বিক এবং উর্দু-ফারসি কবি। ইসলামি আইন, আকিদা, ধর্মতত্ত্বসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি অসংখ্য রচনা রেখে গেছেন। তাঁর ভক্তিমূলক কবিতার সংকলন হাদায়েকে বখশিশ দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম ধর্মীয় সাহিত্য ও নাতের ধারায় একটি পরিচিত নাম।
তাঁর রচিত ‘মুস্তফা জানে রহমত পে লাখো সালাম’ মূলত একটি দীর্ঘ সালাম। এখানে মহানবী (সা.)-এর প্রতি দরুদ ও সালাম নিবেদনের পাশাপাশি তাঁর রহমত, নবুওয়াত, হেদায়েত, চরিত্র, মর্যাদা, মেরাজ, শাফাআত এবং মানবজাতির প্রতি তাঁর অবদানকে অত্যন্ত অলংকারময় ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।

নাতটির প্রথম পঙ্ক্তি— ‘মুস্তফা জানে রহমত পে লাখো সালাম’। সহজ বাংলায় এর ভাবার্থ—রহমতের প্রতীক মুস্তফা (সা.)-এর প্রতি লক্ষ লক্ষ সালাম।

‘মুস্তফা’ অর্থ নির্বাচিত। এটি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি সম্মানসূচক নাম। আর ‘জানে রহমত’ কথাটি কাব্যিকভাবে তাঁর রহমত ও করুণার মহিমাকে প্রকাশ করে।

পরবর্তী পঙ্ক্তি— ‘শামা-এ-বাজমে হেদায়াত পে লাখো সালাম।’ অর্থাৎ, হেদায়েতের সমাবেশকে আলোকিত করা প্রদীপের প্রতি লক্ষ লক্ষ সালাম।

এখানে মহানবী (সা.)-কে প্রদীপের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। যেমন একটি প্রদীপ অন্ধকারে পথ দেখায়, তেমনি তাঁর শিক্ষা মানুষকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পথনির্দেশ দিয়েছে—এটাই কবির মূল ভাবনা। এরপর কবি বলেন— ‘মেহরে চরখে নবুওয়াত পে রওশন দরুদ।’ অর্থাৎ, নবুওয়াতের আকাশের সূর্যের প্রতি উজ্জ্বল দরুদ। সূর্য যেমন আলো ছড়িয়ে পৃথিবীকে আলোকিত করে, কবি তেমনি মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াতকে মানবজাতির জন্য সত্য ও হেদায়েতের আলো হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

আরেকটি পঙ্ক্তি— ‘গুলে বাগে রিসালাত পে লাখো সালাম।’ অর্থাৎ, রিসালাতের বাগানের ফুলের প্রতি লক্ষ লক্ষ সালাম। ফুল এখানে সৌন্দর্য, পবিত্রতা ও সুবাসের প্রতীক। কবি রিসালাতকে একটি বাগান এবং মহানবী (সা.)-কে সেই বাগানের সৌন্দর্যময় ফুল হিসেবে কল্পনা করেছেন। পরবর্তী অংশে রয়েছে— ‘শেহরিয়ারে ইরাম, তাজদারে হারাম।’ এখানে ‘বাদশাহ’ বা ‘মুকুটধারী’ শব্দকে রাজনৈতিক ক্ষমতার অর্থে না দেখে সম্মান ও মর্যাদার কাব্যিক প্রতীক হিসেবে বুঝতে হয়। ‘তাজদারে হারাম’ বলতে পবিত্র হারামের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর গভীর সম্পর্ক ও তাঁর সম্মানিত অবস্থানকে বোঝানো হয়েছে। এরপর আসে— ‘নও-বাহারে শাফাআত পে লাখো সালাম।’ বাংলায় যার ভাবার্থ—শাফাআতের নববসন্তের প্রতি লক্ষ লক্ষ সালাম। বসন্ত মানেই নতুন আশা, প্রশান্তি ও প্রাণের সঞ্চার। কবি মহানবী (সা.)-এর শাফাআতের আশাকে সেই নববসন্তের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

নাতটির আরেকটি অত্যন্ত পরিচিত অংশ— ‘শবে ইসরা কে দুলহা পে দায়েম দরুদ’। এখানে ইসরা ও মেরাজের পবিত্র রাতের কথা স্মরণ করা হয়েছে। ‘দুলহা’ শব্দটি উর্দু-ফারসি কাব্যিক ঐতিহ্যে অত্যন্ত সম্মানিত ও কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা প্রিয় ব্যক্তিকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। এর মাধ্যমে মেরাজের রাতে মহানবী (সা.)-এর বিশেষ মর্যাদাকে প্রকাশ করা হয়েছে। এর পরের পঙ্ক্তি— ‘নওশা-এ-বাজমে জান্নাত পে লাখো সালাম’। অর্থাৎ, জান্নাতের মহিমান্বিত সমাবেশের সম্মানিত ব্যক্তিত্বের প্রতি লক্ষ লক্ষ সালাম। এরপর কবি আরশ ও পৃথিবীর চিত্রকল্প ব্যবহার করেন— ‘আরশ কি জেব-ও-জিনাত পে আরশি দরুদ/ফরশ কি তীব-ও-নুজহাত পে লাখো সালাম।’ এই পঙ্ক্তিগুলোর ভাবার্থ হলো—আসমানি মর্যাদা থেকে পৃথিবীর সৌন্দর্য পর্যন্ত, সর্বত্র মহানবী (সা.)-এর সম্মান ও তাঁর শিক্ষার কল্যাণময় প্রভাবকে স্মরণ করে দরুদ ও সালাম নিবেদন।

এই নাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর ভাষা। এতে আরবি, ফারসি ও ধ্রুপদি উর্দুর অসংখ্য শব্দ রয়েছে। আজকের সাধারণ উর্দুভাষীর কাছেও অনেক শব্দ সহজবোধ্য নয়। কিন্তু ভাষা যতই অলংকারময় হোক, এর অন্তর্নিহিত বক্তব্য অত্যন্ত সহজ—মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং তাঁর জন্য দরুদ ও সালাম।

নাতজুড়ে সূর্য, ফুল, বাগান, প্রদীপ, বসন্ত, মুকুট, আলো ও সুবাসের মতো অসংখ্য চিত্রকল্প ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলো আক্ষরিক বর্ণনা নয়; বরং কাব্যিক উপমা। প্রদীপ দিয়ে হেদায়েত, সূর্য দিয়ে নবুওয়াতের আলো, ফুল দিয়ে সৌন্দর্য ও পবিত্রতা এবং বসন্ত দিয়ে আশা ও শাফাআতের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা হয়েছে। সম্ভবত এই কাব্যিক শক্তিই নাতটিকে শত বছরেরও বেশি সময় ধরে জীবন্ত রেখেছে।

বাংলাদেশে, বিশেষ করে চট্টগ্রামের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে, ‘মুস্তফা জানে রহমত পে লাখো সালাম’ একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ঈদে মিলাদুন্নবীর (সা.) সময় এই নাতের সুর শোনা মানেই অনেকের কাছে শৈশবের স্মৃতিতে ফিরে যাওয়া। কারও মনে পড়ে পাড়ার মসজিদ, কারও মনে পড়ে রঙিন পতাকায় সাজানো রাস্তা, কারও মনে পড়ে মিলাদ মাহফিল, আবার কারও মনে পড়ে বাবা-মা কিংবা দাদা-নানার সঙ্গে কাটানো ধর্মীয় আবহে ভরা দিনগুলো। এভাবেই একটি নাত কখনও কখনও শুধু ধর্মীয় কবিতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; সেটি একটি জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে।

সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে। মাইক থেকে ক্যাসেট, ক্যাসেট থেকে সিডি, সিডি থেকে ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—নাত শোনার মাধ্যম পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু সেই পরিচিত উচ্চারণ, ‘মুস্তফা জানে রহমত পে লাখো সালাম’, এখনো বহু মানুষের মনে একই আবেগ সৃষ্টি করে।

শৈশবে আমরা হয়তো শুধু এর সুর শুনেছি। আজ এর অর্থ জানতে গিয়ে বুঝতে পারি, এই নাতের প্রতিটি পঙ্ক্তি আসলে মহানবী (সা.)-এর প্রতি একজন কবির গভীর ভালোবাসার ভাষা। আর এখানেই এই নাতের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য—যে সুর একদিন শুধু আমাদের কানে পৌঁছেছিল, সময়ের সঙ্গে তার অর্থ আমাদের হৃদয়ে পৌঁছায়।

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্টজন রেজিওনাল হসপিটাল, নিউব্রান্সউইক; এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।

পূর্বকোণ/রেহেনুমা

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট