চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সর্বশেষ:

ব্রিকসের নয়াদিল্লি ঘোষণা: বহুমেরু বিশ্বে নতুন বার্তা

ব্রিকসের নয়াদিল্লি ঘোষণা: বহুমেরু বিশ্বে নতুন বার্তা

আবসার মাহফুজ

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১:১৭ অপরাহ্ণ

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের ১৮তম সম্মেলনে ব্লকটির নেতারা সর্বসম্মতিক্রমে নয়াদিল্লি­ ঘোষণা-২০২৬ গ্রহণ করেছেন। এতে কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে একতরফা শুল্কনীতির সমালোচনা করে বৈশ্বিক বাণিজ্যে ন্যায্যতা ও সমতার কথা বলা হয়েছে। শনিবার এ ঘোষণায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদসহ বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত হালনাগাদের আহ্বান জানানো হয়েছে।

 

বিশ্বরাজনীতির প্রচলিত হিসাব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন সেই পরিবর্তনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বলতে হবে। সম্মেলনে গৃহীত ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা-২০২৬’ বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি অসন্তোষ, উন্নয়নশীল বিশ্বের অধিকতর প্রতিনিধিত্বের দাবি এবং এককেন্দ্রিক ক্ষমতার বিপরীতে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার আকাক্সক্ষা স্পষ্ট করেছে। একতরফা সামরিক পদক্ষেপ, নির্বিচার শুল্ক ও বাণিজ্যবাধা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বেসামরিক জনগণের ওপর হামলার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদসহ বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ এবং স্থানীয় মুদ্রায় আন্তঃসীমান্ত লেনদেন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এ ঘোষণায়। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের মতো কঠিন ভূরাজনৈতিক প্রশ্নেও ভিন্নস্বার্থের দেশগুলোকে একই ঘোষণায় সম্মত করা হয়েছে। ফলে নয়াদিল্লি ঘোষণা শুধু ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের বিষয় নয়; এটি বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান বৃহত্তর বিতর্কের অংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তার কেন্দ্রে ছিল পশ্চিমাশক্তির রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যকাঠামো, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সেই সময়ের ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রতিফলন। কিন্তু সাতদশকে পৃথিবী অনেক বদলে গেছে। চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, ভারত দ্রুত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানিসম্পদ বিশ্ব-অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ, আফ্রিকার জনসংখ্যা ও বাজারের গুরুত্ব বাড়ছে এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলোও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। অথচ আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো পুরোনো ক্ষমতার বিন্যাস বহন করছে। এখানেই ব্রিকসের রাজনৈতিক তাৎপর্য। ব্রিকসকে কেবল ‘পশ্চিমবিরোধী জোট’ বলা যেমন অতিসরলীকরণ, তেমনি একে নিছক অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম ভাবাও ভুল। এর অন্তর্নিহিত প্রশ্ন হলোÑবিশ্ব অর্থনীতিতে যাদের গুরুত্ব বাড়ছে, বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও কি তাদের সেই অনুযায়ী প্রতিনিধিত্ব বাড়বে না?

 

ব্রিকসের নয়াদিল্লি ঘোষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো একতরফা শুল্ক ও বাণিজ্যবাধার বিরোধিতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্রমেই ভ‚রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বড় অর্থনীতিগুলো শুল্ক আরোপ, প্রযুক্তি রপ্তানিতে বিধিনিষেধ, আর্থিক নিষেধাজ্ঞা এবং সরবরাহব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রতিদ্ব›দ্বী রাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। কিন্তু এর অভিঘাত শুধু বড়শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কাঁচামালের দাম বাড়ে, উৎপাদন-ব্যয় বাড়ে, পণ্যপরিবহনের খরচ বাড়ে, রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয় এবং শেষপর্যন্ত মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনেও পৌঁছে যায়। উন্নয়নশীল দেশগুলো এ ধরনের বাণিজ্যযুদ্ধের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পক্ষ। ফলে ব্রিকসের বাণিজ্যবাধাবিরোধী অবস্থানকে শুধু সদস্যরাষ্ট্রগুলোর স্বার্থরক্ষা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্যে উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক উদ্বেগ প্রতিফলিত হয়েছে- শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর দ্বন্দ্বের অর্থনৈতিক মূল্য যেন দুর্বল দেশগুলোকে বারবার দিতে না হয়। একই প্রশ্ন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কোনো রাষ্ট্রের ওপর নিষেধাজ্ঞার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকলেও তার প্রভাব প্রায়ই সাধারণ মানুষের জীবন পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ব্যাংকিং ব্যবস্থা সংকুচিত হয়, আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যাহত হয়, জ্বালানি ও খাদ্যের সরবরাহে চাপ পড়ে এবং বিনিয়োগ কমে যায়। ব্রিকস একতরফা নিষেধাজ্ঞার ক্ষতিকর প্রভাবের বিরুদ্ধে যে অবস্থান নিয়েছে, তার পেছনে এই বাস্তবতা রয়েছে। কিন্তু এখানেই জোটটির সামনে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করা সহজ; বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা তৈরি করা কঠিন। ডলারের আধিপত্য কমানোর কথা বহুদিন ধরেই বলা হচ্ছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ঋণ ও বিনিয়োগে ডলারের অবস্থান এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী। তাই স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর ঘোষণা বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্থিতিশীল মুদ্রা, শক্তিশালী ব্যাংকিং সংযোগ, নিরাপদ আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট ব্যবস্থা, গভীর আর্থিক বাজার এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা। রাজনৈতিক ঘোষণায় আর্থিক ব্যবস্থা বদলায় না; তার জন্য প্রতিষ্ঠান ও সক্ষমতা প্রয়োজন। এই জায়গায় নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ব্রিকসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব অর্জন। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রচলিত পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিকল্প অর্থায়নের পথ তৈরি করা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। অবকাঠামো, পরিবহন, জ্বালানি, পানি, নগরায়ণ ও টেকসই উন্নয়নে অর্থায়নের মাধ্যমে এই ব্যাংক বা সংস্থা প্রমাণ করতে পারে যে বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, উন্নয়নের বাস্তব হাতিয়ারও হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশ ইতিমধ্যে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সদস্য। ফলে ব্রিকসের উত্থান বাংলাদেশের কাছে নিছক ভূরাজনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়; এটি অবকাঠামো অর্থায়ন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও নতুন বাজারের সম্ভাবনার সঙ্গেও যুক্ত। তবে একটি বিকল্প প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর হতে হলে তার অর্থায়ন দ্রুত, স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। শুধু নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেই পুরোনো ব্যবস্থার বিকল্প তৈরি হয় না; কার্যকারিতাই বিকল্পের আসল শক্তি। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের দাবিও এই বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ। বর্তমান স্থায়ী সদস্য কাঠামো মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতার প্রতিফলন। কিন্তু আজকের বিশ্বের অর্থনীতি, জনসংখ্যা ও রাজনৈতিক শক্তির বিন্যাস তখনকার মতো নেই। ভারত ও ব্রাজিলের মতো বৃহৎ উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্থায়ী প্রতিনিধিত্বের দাবি তাই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু ঘোষণায় দাবি তোলা আর বাস্তবে সংস্কার ঘটানো এক বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ঐকমত্য এবং বর্তমান স্থায়ী সদস্যদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। তবু ব্রিকসের এই দাবি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যদি বাস্তব পৃথিবীর পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংস্কার করতে না পারে, তাহলে তার বৈধতা ও প্রতিনিধিত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই বাড়বে।

 

পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত ব্রিকসের ঐক্যের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। সম্প্রসারণের পর জোটটির ভেতরে এমন অনেক দেশ রয়েছে যাদের নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইরান ও উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের পার্থক্য, রাশিয়া ও পশ্চিমের সংঘাত এবং চীন-ভারত প্রতিযোগিতাÑ সব মিলিয়ে অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা সহজ নয়। তবু নয়াদিল্লিতে যৌথ ঘোষণা গ্রহণ করা হয়েছে। ঘোষণায় সংযম, সংলাপ, কূটনীতি, সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গাজায় যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবেশ, ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির বিরোধিতা এবং দুই-রাষ্ট্র সমাধানের প্রতি সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। তবে এখানেই ব্রিকসের বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা। শুধু যুদ্ধের নিন্দা করলেই হবে না; সংঘাত নিরসনে বাস্তব কূটনৈতিক ভূমিকা রাখার সক্ষমতাও দেখাতে হবে। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নৈতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার কার্যকারিতা নির্ভর করে বাস্তব উদ্যোগের ওপর। একইসঙ্গে ব্রিকসের জন্য আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন হলো- আন্তর্জাতিক আইনের নীতি কি সব রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হবে? সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মানের কথা বলা হলে শক্তিশালী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য হতে হবে, দুর্বলরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও। অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করা হলে তা রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী বদলানো যাবে না। অন্যথায় এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার জায়গায় বহুকেন্দ্রিক ক্ষমতার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলেও সাধারণ মানুষের জন্য মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসবে না। এক আধিপত্যের পরিবর্তে বহু আধিপত্য কোনো ন্যায়ভিত্তিক বিশ্ব তৈরি করে না। ব্রিকসের আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এর অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য। একই জোটে এমন রাষ্ট্র রয়েছে যাদের অর্থনৈতিক মডেল, রাজনৈতিক ব্যবস্থা, নিরাপত্তা অগ্রাধিকার এবং ভ‚রাজনৈতিক স্বার্থ ভিন্ন। চীন ও ভারতের মধ্যে প্রতিযোগিতা আছে, রাশিয়া ও পশ্চিমের সম্পর্ক গভীর সংকটে, ইরান ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর নিরাপত্তা-দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। ফলে ব্রিকসকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো গভীর রাজনৈতিক জোটে পরিণত করা বাস্তবসম্মত নয়। বরং এর শক্তি হতে পারে বহুমাত্রিক সহযোগিতায়- বাণিজ্য, অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা ও অর্থায়নে ধাপে ধাপে অগ্রগতি। সদস্যরা সব বিষয়ে একমত না হলেও নির্দিষ্ট বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। এই নমনীয়তাই ব্রিকসের ভবিষ্যৎ শক্তি হতে পারে। ব্রিকসের ভবিষ্যৎ তাই নির্ধারণ করবে তার ‘কার বিরুদ্ধে’ অবস্থান নয়, বরং ‘কী বিকল্প’ তৈরি করতে পারে সেই সক্ষমতা। পশ্চিমের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিয়ে নতুন বিশ্বব্যবস্থা তৈরি হয় না। নতুন ব্যবস্থা তৈরি হয় কার্যকর প্রতিষ্ঠান, অর্থায়ন, প্রযুক্তি সহযোগিতা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, নিরাপদ পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং সংকট মোকাবিলায় বাস্তব সহযোগিতার মাধ্যমে। স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের কথা বলা হয়েছে। এখন সেটিকে ব্যবহারযোগ্য করতে হবে। উন্নয়ন ব্যাংক আছে। এখন তার অর্থায়নের পরিসর বাড়াতে হবে। জাতিসংঘ সংস্কারের দাবি আছে। এখন তার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগঠিত করতে হবে। যুদ্ধবিরতির আহ্বান আছে। এখন সংঘাত নিরসনে ক‚টনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। ঘোষণার পর বাস্তব পদক্ষেপই হবে ব্রিকসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

 

বাংলাদেশের জন্যও এই পরিবর্তনের তাৎপর্য গভীর। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সদস্য। ফলে ব্রিকসের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু পররাষ্ট্রনীতির একটি অধ্যায় হিসেবে দেখলে চলবে না; অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও পরিকল্পনার সঙ্গে এর সমন্বয় করতে হবে। অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পানি, নগর-উন্নয়ন, জলবায়ু সহনশীলতা, ডিজিটাল অবকাঠামো ও শিল্পায়নে কীভাবে আরও অর্থায়ন আনা যায়, তার প্রকল্পভিত্তিক কৌশল প্রয়োজন। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু সদস্যপদ বা অংশীদারিত্বের রাজনৈতিক মর্যাদা অর্জন নয়; বরং সম্পর্ক থেকে পরিমাপযোগ্য অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করা। তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ ক‚টনীতি। চীন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদার, ভারত প্রতিবেশী ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, মধ্যপ্রাচ্য জ্বালানি ও শ্রমবাজারের জন্য অপরিহার্য এবং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ বাজার। অতএব কোনো একটি শক্তিকেন্দ্রকে বেছে নিয়ে অন্যদের দূরে সরিয়ে দেওয়া বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাংলাদেশের জন্য সঠিক কৌশল হলোÑ সবার সঙ্গে সম্পর্ক, কিন্তু কারও ওপর অযৌক্তিক নির্ভরতা নয়; সবার সঙ্গে সহযোগিতা, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে আপস নয়। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ নীতিকে এখন বাস্তব অর্থনৈতিক কৌশলে রূপ দিতে হবে। কত বিনিয়োগ এল, কত বাজার খুলল, কত প্রযুক্তি পাওয়া গেল, কত কর্মসংস্থান তৈরি হলো- এসবই হবে কূটনৈতিক সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি।

 

বিশ্ব যে বহুমেরু ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে, তার লক্ষণ এখন স্পষ্ট। কিন্তু বহুমেরু বিশ্ব মানেই ন্যায়ভিত্তিক বিশ্ব নয়। এক পরাশক্তির আধিপত্যের জায়গায় যদি কয়েকটি শক্তিকেন্দ্র নিজেদের প্রভাববলয় প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য মৌলিক কোনো পরিবর্তন নাও আসতে পারে। সত্যিকারের পরিবর্তন তখনই হবে, যখন নতুন বিশ্বব্যবস্থা বড় ও ছোট রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে সমান গুরুত্ব দেবে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব বাড়াবে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারিত করবে এবং যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে সংলাপ ও সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেবে। ব্রিকস সেই সম্ভাবনার একটি বড় পরীক্ষাগার। কিন্তু তার সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষণার ভাষার চেয়ে বাস্তব কর্মসূচির ওপর। ব্রিকসের নয়াদিল্লি-বার্তা তাই শেষপর্যন্ত একটাই- বিশ্ব আর আগের জায়গায় নেই। ক্ষমতার কেন্দ্র ছড়িয়ে পড়ছে, অর্থনীতির কেন্দ্র বদলাচ্ছে এবং পুরোনো আন্তর্জাতিক কাঠামো ক্রমেই নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে। ব্রিকস সেই পরিবর্তনের একটি সংগঠিত প্রকাশ। কিন্তু ইতিহাসে জায়গা করে নিতে হলে তাকে শুধু পশ্চিমা আধিপত্যের সমালোচক হলে চলবে না; কার্যকর বিকল্প নির্মাণের সক্ষমতাও দেখাতে হবে। বাংলাদেশের জন্যও শিক্ষা পরিষ্কার। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় কোনো শক্তির অনুসারী হয়ে নয়, নিজের স্বার্থের শক্তিশালী প্রতিনিধি হয়ে দাঁড়াতে হবে। ব্রিকসকে দেখতে হবে সুযোগ হিসেবে, শিবির হিসেবে নয়; অংশীদার হিসেবে, নির্ভরতার কেন্দ্র হিসেবে নয়। কারণ ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ক‚টনৈতিক শক্তি কোনো পরাশক্তির ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা নয়- বরং এমন একটি অবস্থান তৈরি করা, যেখানে সব শক্তিকেন্দ্রই তাকে প্রয়োজনীয় অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে বাধ্য হয়। বিশ্বব্যবস্থা যখন পুনর্গঠিত হয়, তখন দর্শকের আসনে বসে থাকার সুযোগ থাকে না। যে রাষ্ট্র নিজের অবস্থান নিজে নির্ধারণ করতে পারে না, শেষপর্যন্ত অন্যের নির্ধারিত অবস্থানই তাকে মেনে নিতে হয়। ব্রিকসের নয়াদিল্লি ঘোষণা তাই বাংলাদেশের জন্যও একটি সতর্ক-বার্তা। বিশ্ব বদলাচ্ছে, শক্তির পুরোনো হিসাব বদলাচ্ছে, অর্থনীতি ও কূটনীতির নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। এখন বাংলাদেশের কাজ কোনো শিবিরের পতাকা বহন করা নয়; নিজের জাতীয় স্বার্থের পতাকা উঁচু রাখা। কারণ বহুমেরু বিশ্বের সবচেয়ে বড় সুযোগ তাদের জন্যই, যারা কারও ছায়ায় হারিয়ে না গিয়ে নিজেদের প্রয়োজনীয় করে তুলতে পারে, বিশ্বসভায় নিজেদের জন্য গুরুত্ববহ অবস্থান নিশ্চিত করতে পারে।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট