রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন গ্রেপ্তার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস।
রবিবার (২৩ আগস্ট) রাতে রংপুরের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
জবানবন্দি গ্রহণ শেষে রাত সাড়ে ১১টার দিকে আদালত দুই আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে ওই দিন বিকেল পাঁচটার দিকে তাদের আদালতে হাজির করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, গ্রেপ্তার দুই যুবক আদালতে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা নিজেদের দায় স্বীকার করায় তাদের আর রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। পরে দুই আসামিকে প্রিজন ভ্যানে করে কারাগারে পাঠানো হয়।
যেভাবে হত্যাকাণ্ড
রবিবার দুপুরে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষক পরিবারের চারজনের হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য, “বৃহস্পতিবার রাতে পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিল। শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে তাদের সেখানে অবস্থানের কারণ জানতে চান। এ সময় তার গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে আসামিরা।
“গণপতির চিৎকার শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠলে তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। মায়ের চিৎকার শুনে এগিয়ে গেলে মেয়ে আগামী চক্রবর্তীকেও গামছা ও রশি দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।”
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রংপুর কোতয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি বলছেন, “মেয়েটিকে হত্যার সময় কয়েক মিনিট ধরে চেষ্টা করতে হয়েছে বলে আসামিরা জবানবন্দিতে জানিয়েছে। পরে ঘুমন্ত অবস্থায় ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুস চক্রবর্তীকেও কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।”
এদিকে হত্যাকাণ্ডের শিকার রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী (১২)-এর শেষকৃত্য গত রোববার রাতে রংপুর নগরের দখিগঞ্জ মহাশ্মশানে সম্পন্ন হয়েছে।
রাত আটটার দিকে আনুষ্ঠানিকতা শেষে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে চারজনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রাত নয়টার দিকে মরদেহগুলো দখিগঞ্জ মহাশ্মশানে নেওয়া হয়। শ্মশানে চারজনের মরদেহ স্নান করিয়ে নতুন পোশাক পরানো হয়। এরপর পরপর চারটি চিতায় তাদের মরদেহ তোলা হয়। স্বজনেরা মুখাগ্নি করেন। রাত ১১টার দিকে দাহকার্য শেষ হয়।
শনিবার রাত সাড়ে তিনটার দিকে রংপুর নগরের কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী (অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং তাদের দুই সন্তান আগামী চক্রবর্তী ও আয়ুশ চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় পরিবারের চার সদস্য বসবাস করতেন। প্রথম ও তৃতীয় তলার নির্মাণকাজ চলছিল।
পুলিশ ওই বাড়িতে ঢুকে প্রথমে একটি শোবার ঘরের খাটের ফাঁকে আয়ুশের মরদেহ দেখতে পায়। তার গলায় কাপড় পেঁচানো ছিল। এরপর তৃতীয় তলায় ওঠার সিঁড়িতে প্রীতিলতা ও তার মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া যায়। তাদের দুজনের গলায় দড়ি পেঁচানো ছিল। তৃতীয় তলার ছাদে পাওয়া যায় গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ। তার গলায় গামছা পেঁচানো ছিল।
পূর্বকোণ/নুসরাত

















