বাংলাদেশের বহুল আলোচিত ও রহস্যময় গ্রাফিতি চরিত্র ‘সুবোধ’ এবার আবির্ভূত হয়েছে ভারতের সিকিমে। দেশটির কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডোরের কাছে একটি সেতুর পিলারে সুবোধের দেখা মেলার পর তদন্ত শুরু করেছে ভারতীয় পুলিশ।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ফেডারেল’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্যাংটক-রংপো সড়কের মাজিটার নালা ব্রিজের পিলারে ২০ ফুট বাই ১২ ফুট আকারের এই ম্যুরালটি স্প্রে পেইন্ট ও স্টেনসিলের সাহায্যে আঁকা হয়েছে।
এ ঘটনার পর বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে ভারতের মাটিতেও সুবোধ এখন আলোচনার কেন্দ্রে। প্রশ্ন উঠেছে, সুবোধের স্রষ্টা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানবিরোধী সেই নাম না জানা স্ট্রিট আর্টিস্ট কি তাহলে ভারতে প্রবেশ করেছেন?
নতুন এই গ্রাফিতিতে সুবোধকে আগের মতো ভীত বা পলায়নরত অবস্থায় দেখা যায়নি। সেখানে দেখা যায়, খালি গায়ে সুবোধ কাঁটাতারের সঙ্গে বাঁধা একটি হ্যামকে শুয়ে আছে।
তার এক হাতে একটি তার কাটার যন্ত্র (ওয়্যার কাটার) এবং নিচে একটি খালি বালতি রাখা। যথারীতি পাশেই রয়েছে শিল্পীর সেই পরিচিত সিগনেচার টেক্সট— ‘হবেকি?’।
দ্য ফেডারেল বলছে, ম্যুরালের কাঁটাতারের মানে হতে পারে আন্তর্জাতিক সীমান্ত, আর তার কাটার যন্ত্রটি দিয়ে বাধা ভাঙার ইঙ্গিত দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
হ্যামকটি দীর্ঘ পলায়নের পর বিশ্রাম বা আশ্রয়ের প্রতীক হতে পারে। অন্যদিকে, তিস্তা অববাহিকায় রাখা খালি বালতিটি সম্ভবত ভারত-বাংলাদেশের অমীমাংসিত তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তির দিকে ইঙ্গিত করছে।
তবে, শিল্পী ‘হবেকি’র পরিচয় যেহেতু অজ্ঞাত, এসব ব্যাখ্যার সঠিকতা যাচাই করা আপাতত সম্ভব নয়।
তদন্তে যা পেয়েছে পুলিশ
এ ঘটনায় তদন্তে নেমেছে সিকিম পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে দ্য ফেডারেল লিখেছে, সিকিমের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এক বাংলাদেশি তরুণের দিকে তাদের সন্দেহ। ছুটি কাটাতে ওই শিক্ষার্থী এখন বাংলাদেশে অবস্থান করছেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, “আমরা এরইমধ্যে ফোনে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তবে এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়নি। এর মধ্যেই কে বা কারা দেয়ালচিত্রটি বিকৃত করে দিয়েছে।”
পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে ম্যুরালটি থেকে সরাসরি কোনো নিরাপত্তা হুমকি দেখা যাচ্ছে না। তবে এটি ‘হবেকি’ নিজে, নাকি তার কোনো অনুসারী এঁকেছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে তদন্ত চলছে।
কৌশলগত উদ্বেগ ও সমসাময়িক প্রেক্ষাপট
গ্যাংটক-রংপো সড়কটি মূলত সিকিমকে ভারতের অন্যান্য অংশের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এটি সরাসরি শিলিগুড়ি করিডোরের সঙ্গে যুক্ত, যা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও চীনের তিব্বত পরিবেষ্টিত এই করিডোরটি ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও পরিবহন পথ।
শিলিগুড়িভিত্তিক প্রবীণ সাংবাদিক প্রবীর প্রামাণিক দ্য ফেডারেলকে বলেন, “প্রতীকী হলেও এই অঞ্চলে যে কোনো অস্বাভাবিক তৎপরতা স্বাভাবিকভাবেই কর্তৃপক্ষের মনোযোগ আকর্ষণ করে। এক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটেছে।”
চীনের সহায়তায় বাংলাদেশের তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে সম্প্রতি ভূরাজনৈতিক আলোচনা জোরদার হয়েছে। শিলিগুড়ি করিডোরের কাছাকাছি হওয়ায় নয়াদিল্লিও এসব বিষয়ে কড়া নজর রাখছে।
গত ২৮ জুন বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর পরপরই এই দেয়ালচিত্রের আবির্ভাব বাড়তি জল্পনার জন্ম দিয়েছে।
সুবোধ ও হবেকি: এক নীরব প্রতিবাদ
বাংলাদেশে ‘সুবোধ’ প্রথম আত্মপ্রকাশ করে ২০১৭ সালের দিকে। ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, সময় এখন পক্ষে না’— এমন সব বার্তার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে রাজনৈতিক নিপীড়ন, গুম ও সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে চরিত্রটি। দীর্ঘ এক দশক ধরে অজ্ঞাত থাকা এই শিল্পী ‘হবেকি’ ছদ্মনামে পরিচিত।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানেও শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অন্যতম ভিজ্যুয়াল প্রতীক হয়ে উঠেছিল ‘সুবোধ’।
সে সময় শিল্পীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকেই স্টেনসিল টেমপ্লেট ডাউনলোড করে ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে এই গ্রাফিতি ছড়িয়ে দেন। তবে এবার দেশের সীমানা পেরিয়ে ভারতের স্পর্শকাতর অঞ্চলে সুবোধের এই উপস্থিতি নতুন করে রহস্যের জন্ম দিয়েছে। সূত্র: বিডিনিউজ।
পূর্বকোণ/পিআর















