চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬

সর্বশেষ:

মন্তব্য প্রতিবেদন

‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিতের পর মধ্যপ্রাচ্য নতুন অনিশ্চয়তার ভূরাজনীতি

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

১০ মে, ২০২৬ | ৮:০৮ পূর্বাহ্ণ

হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ আকস্মিকভাবে স্থগিত হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি ভবিষ্যতে কেবল একটি সামরিক বিরতি হিসেবে নয় বরং একটি কৌশলগত স্বীকারোক্তি হিসেবেই বিবেচিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওয়াশিংটনের বদ্ধমূল বিশ্বাস ছিল ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মিলিয়ে ইরানকে নতজানু করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে সেটা হয়নি। এখন এমন এক মধ্যপ্রাচ্যের জন্ম হচ্ছে, যেখানে কেউ চূড়ান্ত বিজয়ী নয়! বরং সবাই আরও বেশি অবিশ্বাসী, সশস্ত্র ও সংঘাতমুখী হয়ে উঠছে।

 

‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’কে শুরুতে উপস্থাপন করা হয়েছিল হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখার একটি মানবিক উদ্যোগ হিসেবে। কিন্তু সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সৌদি আরব এই অভিযানের জন্য নিজেদের ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকে পরিকল্পনা স্থগিত করতে হয়। ঘটনাটি শুধু সামরিক কৌশলের প্রশ্ন নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় মিত্রদের মধ্যকার গভীর পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত।

 

দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির একটি অলিখিত সূত্র ছিল আরব রাজতন্ত্রগুলো শেষ পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষেই থাকবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সেই ধারণাকে দুর্বল করে দিয়েছে।

 

বিশ্লেষক ত্রিতা পারসি সাম্প্রতিক আলোচনাগুলোতে বারবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের স্থিতিস্থাপকতা এবং চাপ প্রয়োগের সীমাবদ্ধতাকে অবমূল্যায়ন করেছে। তাঁর মতে, লাগাতার নিষেধাজ্ঞা, হত্যাকা- ও সামরিক হামলা ইরানের কট্টরপন্থীদের দুর্বল না করে বরং আরও শক্তিশালী করেছে। এত চাপের পরও তেহরান ভেঙে পড়েনি, আত্মসমর্পণও করেনি। এটাই বর্তমান সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

 

ওয়াশিংটনের ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ নীতির সঙ্গে ইসরায়েলের বিশ্বাস ছিল, আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পর ইরান কার্যত একঘরে হয়ে পড়েছে। কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতা বলছে অন্য কথা। ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এখনও কৌশলগতভাবে টিকে আছে। ইসরায়েল সামরিক সাফল্য দেখালেও আঞ্চলিক নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। আর উপসাগরীয় দেশগুলোও এখন আর অন্ধভাবে ওয়াশিংটনের কৌশল অনুসরণ করছে না; তারা নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভারসাম্যের রাজনীতি করছে।

 

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে একটি জিনিস ভালভাবেই পরিলক্ষিত হচ্ছে, সেটা হল- মধ্যপ্রাচ্যে এখন আর কেবল ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব চলছে না; বরং উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও নতুন কৌশলগত বিভাজন তৈরি হচ্ছে। সৌদি আরবের সতর্ক অবস্থান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের তুলনামূলক আক্রমণাত্মক অবস্থান স্পষ্ট করেছে যে, পুরোনো আরব ঐক্যের কাঠামোও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য এখন এমন এক বহুমাত্রিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে কেউ পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছে না।

 

‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত হওয়ার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল কূটনৈতিক। সৌদি আরবের অবস্থান স্পষ্ট করেছে, তারা ইরানের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতকে বেশি ভয় পাচ্ছে। কারণ যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়লে প্রথম ধাক্কা তাদের অর্থনীতি, জ্বালানি অবকাঠামো ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরই পড়বে।
এদিকে যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা মিত্ররাও এখন নতুন করে হরমুজে বহুজাতিক নৌ-মিশনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ ‘এইচএমএস ড্রাগন’ মোতায়েনের খবর প্রমাণ করছে যে, পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত হলেও সংকট শেষ হয়নি। উল্টো নতুন আন্তর্জাতিক সামরিকীকরণের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বাস্তবতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা।

 

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো এখন আর কেবল যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখছে না। তারা একই সঙ্গে ওয়াশিংটন, বেইজিং এবং তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের পথে হাঁটছে। বিশেষ করে চীনের কূটনৈতিক সক্রিয়তা এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন সামরিক শক্তি প্রদর্শনে ব্যস্ত, তখন চীন নীরব কূটনীতির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, সাংবাদিক জেরেমি স্কাহিল ও ‘ড্রপসাইট নিউজ’-এর বিশ্লেষণগুলো আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে। সেটা হল- অবিরাম সামরিক উত্তেজনা অস্ত্র ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক কট্টরপন্থীদের জন্য লাভজনক হলেও বড় মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।

গাজা, লেবানন, ইরাক কিংবা হরমুজ সব জায়গাতেই যুদ্ধের অভিঘাত পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। বাড়ছে বাস্তুচ্যুতি, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা। এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে।

 

বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে হাজারের বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ কার্যত আটকে পড়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। ফলে সেখানে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মানেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি আরও বিপজ্জনক, কারণ তেলের দাম বৃদ্ধি সরাসরি আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের বড় অংশও মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর; ফলে এই অঞ্চলের অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, তথাকথিত যুদ্ধবিরতির পরও বাস্তবে উত্তেজনা থামেনি। বিভিন্ন স্থানে ড্রোন হামলা, নৌসংঘর্ষ ও সীমিত সামরিক পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ চলছেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই এখনও পরস্পরের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিচ্ছে। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে এখন শান্তি ও যুদ্ধের সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এটি এক ধরনের ‘নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা’, যেখানে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়ানো হলেও সংঘাতের আগুন নিভছে না।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, এখন আর কেউ পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছে না।

 

ইসরায়েল সামরিক দক্ষতা দেখিয়েছে কিন্তু রাজনৈতিক সমাধান আনতে পারেনি। ইরান বড় ধরনের ক্ষতির মুখেও পাল্টা প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র শক্তি প্রদর্শন করেছে কিন্তু জোটগত ঐক্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। আর আরব রাষ্ট্রগুলো প্রকাশ্যে যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিলেও পর্দার আড়ালে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই বেশি ব্যস্ত।
সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েল এখন ক্রমবর্ধমান ‘স্থায়ী নিরাপত্তাহীনতার’ বাস্তবতার মুখোমুখি। অন্যদিকে, ইরানকে দুর্বল করার নামে যদি আবারও ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর রাজনীতি শুরু হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্য আরেকটি ইরাক বা লিবিয়ার দিকে ধাবিত হতে পারে।

 

এই বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্য এখন এমন এক ভূরাজনৈতিক দাবার বোর্ডে পরিণত হয়েছে, যেখানে মিত্রদের মধ্যেও অবিশ্বাস বাড়ছে, প্রক্সি যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, আর কূটনীতির পাশাপাশি চলছে সাইবার হামলা ও গোপন অভিযানের রাজনীতি।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ এখন কেবল ভূরাজনীতির অংশ নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি ‘স্থায়ী যুদ্ধ অর্থনীতি’-তে রূপ নিচ্ছে, যেখানে সংঘাত নিজেই একটি ব্যবসায়িক ও কৌশলগত কাঠামো হয়ে উঠছে। অস্ত্রশিল্প, প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং নিরাপত্তা-নির্ভর অর্থনীতি পুরো অঞ্চলকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার মধ্যে আটকে ফেলছে।

 

তাই ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত হওয়া কেবল একটি সামরিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যের যুগ শেষ হওয়ারও প্রতীক। মধ্যপ্রাচ্য এখন ধীরে ধীরে বহুমেরুকেন্দ্রিক বাস্তবতায় প্রবেশ করছে, যেখানে আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। কিন্তু এর মধ্যেই আরেকটি বিপদ লুকিয়ে আছে।
যখন কৌশলগত স্থিতি দুর্বল হয় তখন অনেক রাষ্ট্রই অভ্যন্তরীণ বৈধতা টিকিয়ে রাখতে জাতীয়তাবাদ, সামরিকতন্ত্র ও স্থায়ী সংকটের রাজনীতির আশ্রয় নেয়। এতে সংঘাতের চক্র আরও দীর্ঘ হয়, সমাধান আরও দূরে সরে যায়।

 

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এখনও কূটনীতির সুযোগ আছে। ইতিমধ্যে অন্তর্বর্তী একটি সমঝোতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন আলোচনা শুরু হওয়ার ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করা, কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং হরমুজে স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে। কিন্তু বিশ্বাসের সংকট এতটাই গভীর যে, কোনো সমঝোতাই এখনও নিশ্চিত নয়।
ইরান আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রাখে না। ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখে। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো একদিকে ইরানের প্রভাব, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত নীতিকে ভয় পায়।

 

ফলে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত হওয়াকে শান্তির সূচনা ভাবার সুযোগ নেই। বরং এটি হয়তো আরও অনিশ্চিত এক বিরতির নাম।
একসময় মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে শুধু আরব-ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। এখানে এখন সামরিক শক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈশ্বিক বাণিজ্য, চীনের উত্থান, আরব বিশ্বের পুনর্বিন্যাস এবং স্থায়ী যুদ্ধ অর্থনীতিÑসবকিছু একসঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ফলে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত হওয়া হয়তো একটি সামরিক সিদ্ধান্তের চেয়ে বড় কিছু! এটি সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যে পুরোনো বিশ্বব্যবস্থার ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ার প্রতীক।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট