চট্টগ্রাম শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬

সর্বশেষ:

লয়েডস লিস্ট ২০২৬

কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে রেকর্ড গড়েও আগের অবস্থানেই চট্টগ্রাম বন্দর

২০২৬ সালের তালিকায় ৬৮তম অবস্থান, ২০২২ সালে ছিল ৬৪তম

সারোয়ার আহমদ

২৯ আগস্ট, ২০২৬ | ৮:৫৯ অপরাহ্ণ

বিশ্বের ১০০ ব্যস্ততম কনটেইনার বন্দরের তালিকায় এবারও চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থানের কোন পরিবর্তন হয়নি। লয়েডস লিস্টের সর্বশেষ ২০২৬ সালের তালিকায় বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরটির অবস্থান ৬৮তম। অথচ ২০২২ সালের তালিকায় এর অবস্থান ছিল ৬৪তম।
মাঝের বছরগুলোতেও চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থানে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তালিকায় বন্দরটির অবস্থান ছিল ৬৭তম। এরপর ২০২৫ সালে আরও এক ধাপ পিছিয়ে ৬৮তম হয় চট্টগ্রাম বন্দর। সর্বশেষ ২০২৬ সালের তালিকাতেও একই অবস্থানে রয়েছে বন্দরটি।
অর্থাৎ, পাঁচ বছরের ব্যবধানে বিশ্বের ব্যস্ততম কনটেইনার বন্দরগুলোর তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ৬৪তম থেকে ৬৮তম হয়েছে। এ সময়ে বন্দরটির কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে প্রবৃদ্ধি ও নতুন রেকর্ড তৈরি হলেও তা বৈশ্বিক র‌্যাঙ্কিংয়ে অবস্থানগত উন্নতিতে প্রতিফলিত হয়নি।
চট্টগ্রাম বন্দরের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম বাড়লেও বিশ্বের অন্যান্য প্রধান কনটেইনার বন্দরগুলোর তুলনায় অবস্থানগত অগ্রগতি ঘটেনি।

 

সর্বশেষ ২০২৬ সালে ৬৮তম অবস্থান
লয়েডস লিস্টের সর্বশেষ ২০২৬ সালের ‘ওয়ান হানড্রেড কনটেইনার পোর্ট ২০২৬’ তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ৬৮তম। এর আগের ২০২৫ সালের তালিকাতেও একই অবস্থানে ছিল চট্টগ্রাম বন্দর। ফলে সর্বশেষ দুই বছরের তালিকায় অবস্থান স্থিতিশীল থাকলেও তা ২০২২ সালের অবস্থানের তুলনায় চার ধাপ নিচে রয়েছে। অর্থাৎ ২০২২ সালের সেই ৬৪ তম অবস্থানে ফিরতে পারেনি।
চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। কারণ, বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত ১০০টি কনটেইনার বন্দরের তালিকায় অবস্থান ধরে রাখা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু কয়েক বছর ধরে নিচের দিকে নেমে আসার পর আবারও উপরের দিকে ওঠার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো হয়নি।
২০২৬ সালের তালিকায় ৬৮তম অবস্থান ধরে রাখার অর্থ হলো, সাম্প্রতিক সময়ে আরও নিচে নামেনি চট্টগ্রাম বন্দর। তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, আগের অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে পারেনি।

 

২০২৫ সালে আরও এক ধাপ পিছিয়ে ৬৮তম
২০২৫ সালের লয়েডস লিস্টের তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান হয় ৬৮তম। এর আগের দুই বছর বন্দরটি ৬৭তম অবস্থানে ছিল। ফলে ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর আরও এক ধাপ পিছিয়ে যায়। এই অবস্থান পরিবর্তনের ফলে পাঁচ বছরের ধারাবাহিক চিত্রে চট্টগ্রাম বন্দরের নিম্নমুখী প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়।
যদিও এক ধাপ বা দুই ধাপের পরিবর্তনকে বিচ্ছিন্নভাবে বড় ঘটনা মনে নাও হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ সময়ের তথ্য একসঙ্গে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২২ সালের ৬৪তম অবস্থান থেকে চট্টগ্রাম বন্দর ধীরে ধীরে ৬৮তম অবস্থানে নেমে এসেছে।
২০২৪ সালের তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দর ছিল ৬৭তম অবস্থানে। তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালের তালিকাতেও একই অবস্থানে ছিল বন্দরটি। ফলে এ দুই বছরে অবস্থান স্থিতিশীল থাকলেও ২০২২ সালের ৬৪তম অবস্থানে ফিরে যেতে পারেনি চট্টগ্রাম বন্দর। অর্থাৎ, ২০২৩ সালে তিন ধাপ পিছিয়ে যাওয়ার পর ২০২৪ সালে আর নিচে নামেনি বন্দরটি, কিন্তু হারানো অবস্থানও পুনরুদ্ধার করতে পারেনি।

 

পাঁচ বছরের চিত্রে চার ধাপের অবনমন

২০২৬ সালের অবস্থান থেকে পেছনের দিকে তাকালে চট্টগ্রাম বন্দরের র‌্যাঙ্কিংয়ের গতিপথ বেশ পরিষ্কার। সর্বশেষ ২০২৬ সালে ৬৮তম অবস্থান। ২০২৫ সালেও একই অবস্থান। তার আগে ২০২৪ ও ২০২৩ সালে ছিল ৬৭তম। আর ২০২২ সালে ছিল ৬৪তম। অর্থাৎ, পাঁচ বছরের এই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম বন্দর প্রথমে তিন ধাপ এবং পরে আরও এক ধাপ পিছিয়েছে। মোট হিসাবে অবস্থানের অবনমন চার ধাপ।
তবে এ সময়ের একটি ইতিবাচক দিক হলো, সর্বশেষ দুই বছরে বন্দরটির অবস্থান ৬৮তম স্থানে স্থিতিশীল রয়েছে। অর্থাৎ, ২০২৫ সালে এক ধাপ পিছিয়ে যাওয়ার পর ২০২৬ সালে আর অবস্থান খারাপ হয়নি।
কিন্তু অবস্থান স্থিতিশীল থাকা এবং অবস্থান উন্নত হওয়া এক বিষয় নয়। ২০২২ সালের তুলনায় চার ধাপ পিছিয়ে থাকা থেকেই বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় চট্টগ্রাম বন্দরের অগ্রগতির গতি যথেষ্ট নয়।

 

কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে রেকর্ড, র‌্যাঙ্কিংয়ে নয়
চট্টগ্রাম বন্দরের র‌্যাঙ্কিংয়ের এই চিত্রের সঙ্গে এর সাম্প্রতিক কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের তথ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে। বছরটিতে বন্দরে ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৩০৯ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। ২০২৪ সালে হ্যান্ডলিং হয়েছিল ৩২ লাখ ৭৫ হাজার ৬২৯ টিইইউ। অর্থাৎ, ২০২৫ সালে কনটেইনার হ্যান্ডলিং বেড়েছে প্রায় ৪ দশমিক ০৭ শতাংশ। প্রথমবারের মতো ৩৪ লাখ টিইইউর সীমাও অতিক্রম করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। এছাড়া কার্গো হ্যান্ডলিং ও জাহাজ আগমনের সংখ্যাতেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
কিন্তু কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে এই প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও লয়েডস লিস্টের র‌্যাঙ্কিংয়ে চট্টগ্রাম বন্দর উপরের দিকে ওঠেনি। বরং ২০২৬ সালের তালিকায়ও অবস্থান ৬৮তম। এখানেই চট্টগ্রাম বন্দরের সাম্প্রতিক অবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য। বন্দরের কার্যক্রম বাড়ছে, কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে নতুন রেকর্ড হচ্ছে, কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য ব্যস্ত বন্দরের তুলনায় অবস্থানগত উন্নতি ঘটছে না।

 

২০২৫ সালের প্রবৃদ্ধির পেছনের বার্তা
২০২৫ সালের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের তথ্য অবশ্যই চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য একটি ইতিবাচক অর্জন। ২০২৩ সালে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ ছিল ৩০ লাখ ৫০ হাজার ৯৭০ টিইইউ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৩২ লাখ ৭৫ হাজার ৬২৯ টিইইউতে পৌঁছে। ২০২৫ সালে আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৩০৯ টিইইউতে। অর্থাৎ, সাম্প্রতিক দুই বছরে বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে শক্তিশালী পুনরুদ্ধার ও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
কিন্তু বৈশ্বিক র‌্যাঙ্কিংয়ের ক্ষেত্রে শুধু একটি বন্দরের নিজস্ব প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ নয়। একই সময়ে বিশ্বের অন্য বন্দরগুলোর কনটেইনার হ্যান্ডলিং কতটা বাড়ছে, সেটিও অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চট্টগ্রাম বন্দরের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক পাঁচ বছরের র‌্যাঙ্কিংয়ের চিত্র বলছে, এর প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও অন্যান্য প্রতিযোগী বন্দরের তুলনায় অবস্থানগত অগ্রগতি হয়নি।

 

শীর্ষ ১৫ বন্দরের সঙ্গে বড় ব্যবধান
লয়েডস লিস্টের তালিকার প্রথম ১৫টি ব্যস্ততম কনটেইনার বন্দর পর্যালোচনা করলে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থানগত ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়। বিশ্বের শীর্ষ সারিতে এশিয়ার বন্দরগুলোর শক্তিশালী আধিপত্য রয়েছে। সাংহাই, সিঙ্গাপুর, নিংবো-ঝৌশান, শেনজেন, কিংদাও, গুয়াংজু, বুসান, তিয়ানজিন ও জিয়ামেনের মতো বন্দরগুলো বিশ্বের কনটেইনার পরিবহনের প্রধান কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে। চীনের একাধিক বন্দর প্রথম ১৫টির মধ্যে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোর উপস্থিতিও এই অঞ্চলের প্রতিযোগিতার শক্তি তুলে ধরে।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোও শীর্ষ সারিতে রয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর রয়েছে ৬৮তম অবস্থানে। অর্থাৎ, বিশ্বের প্রথম ১৫টি বন্দরের সঙ্গে চট্টগ্রামের অবস্থানগত ব্যবধান এখনো অনেক।

 

প্রথম ১৫-তে অবস্থানের লড়াই, চট্টগ্রামের চ্যালেঞ্জ আলাদা
বিশ্বের শীর্ষ ১৫টি বন্দরের তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে শুধু কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কে শক্ত অবস্থানও প্রতিফলিত হয়। চট্টগ্রাম বন্দর অবশ্য সেই স্তরের প্রতিযোগিতায় নেই। বর্তমানে এর বাস্তব চ্যালেঞ্জ হলো বিশ্বের সেরা ১০০ বন্দরের তালিকায় নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা এবং ধাপে ধাপে উপরের দিকে ওঠা।
২০২৬ সালের ৬৮তম অবস্থান থেকে প্রথম ১৫-এ পৌঁছানোর ব্যবধান অনেক বড়। তাই চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য তাৎক্ষণিক মূল্যায়নের জায়গা হলো—বর্তমান অবস্থান থেকে কীভাবে আবারও ৬৪তম বা তার চেয়ে ভালো অবস্থানে ফেরা যায়।
পাঁচ বছরের তথ্য বলছে, চট্টগ্রাম বন্দর এখনো বিশ্বের ১০০ ব্যস্ততম বন্দরের মধ্যে রয়েছে এবং নিজের অবস্থান মোটামুটি স্থিতিশীল রাখতে পেরেছে। তবে একই তথ্য বলছে, তালিকার উপরের দিকে ওঠার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

 

প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আপেক্ষিক অগ্রগতি
চট্টগ্রাম বন্দরের ২০২৫ সালের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের রেকর্ড নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। কিন্তু আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ের বিচারে শুধু নিজের আগের বছরের রেকর্ড ভাঙলেই যথেষ্ট নয়। বিশ্বের অন্য বন্দরগুলোর তুলনায় কত দ্রুত প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, সেই আপেক্ষিক অবস্থানই র‌্যাঙ্কিংয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম বন্দরের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের তথ্য বলছে, বন্দরের কার্যক্রম বৃদ্ধি পেলেও বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে তার প্রতিফলন ঘটেনি। এ কারণেই কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের রেকর্ড এই খবরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় হলো—বিশ্বের ব্যস্ততম ১০০ কনটেইনার বন্দরের তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান গত পাঁচ বছরে কোন পথে এগিয়েছে। আর সেই চিত্রটি বলছে, অবস্থান ৬৪তম থেকে ৬৮তম হয়েছে।

লয়েডস লিস্টের সর্বশেষ ২০২৬ সালের তালিকায় বিশ্বের ৬৮তম ব্যস্ততম কনটেইনার বন্দর চট্টগ্রাম। ২০২৫ সালেও একই অবস্থানে ছিল বন্দরটি। ২০২৪ ও ২০২৩ সালে ছিল ৬৭তম। আর ২০২২ সালে ছিল ৬৪তম। অর্থাৎ, পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম বন্দর চার ধাপ পিছিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে এবং ২০২৫ সালে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। কার্গো ও জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রেও প্রবৃদ্ধি রয়েছে। তবু বৈশ্বিক র‌্যাঙ্কিংয়ের চিত্র ভিন্ন কথা বলছে।
সর্বশেষ দুই বছরে ৬৮তম অবস্থান ধরে রাখাকে স্থিতিশীলতা হিসেবে দেখা গেলেও ২০২২ সালের ৬৪তম অবস্থান থেকে চার ধাপ নিচে নেমে আসা চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।

শেয়ার করুন