চট্টগ্রাম শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬

অভিমত

জ্বালানি থেকে খাদ্য : বাংলাদেশের সামনে নতুন ঝুঁকি

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

২৯ আগস্ট, ২০২৬ | ৭:১৭ পূর্বাহ্ণ

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহটি কি আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার সময় হতে যাচ্ছে? জ্বালানি, প্রাকৃতিক গ্যাস, সার ও খাদ্য- এই চারটি পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতা সেই প্রশ্নই সামনে নিয়ে এসেছে। তবে বিষয়টিকে এভাবে বলা ঠিক হবে না যে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলিয়াম, গ্যাস, সার ও খাদ্যের সরাসরি ঘাটতি দেখা দেবে। বরং আশঙ্কাটি অন্য জায়গায়- মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর অতিরিক্ত চাপ যদি আবার তীব্র হয়, তাহলে তার অভিঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে বিশ্ববাজারে। আর সেই অভিঘাতের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিকার হতে পারে আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলো- বাংলাদেশ যার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

 

তেলের বাজারে আপাত স্বস্তি, কিন্তু রয়ে গেছে ঝুঁকি

বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৯০ ডলারের নিচে রয়েছে। ২৮ আগস্টের রয়টার্স বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুড ৯০ ডলারের নিচে থাকলেও সংকটের কেন্দ্র এখন ক্রমশ পরিশোধিত জ্বালানি, বিশেষ করে ডিজেলের দিকে সরে যাচ্ছে। ইউরোপে ডিজেল ও অন্যান্য রিফাইন্ড প্রোডাক্টের বাজার ইতোমধ্যেই অত্যন্ত টানটান। অর্থাৎ তেলের দাম কিছুটা কমেছে মানেই সংকট শেষ- এমন ধারণা বিপজ্জনক।
হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক থাকলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের চাপ অনেকটাই কমে যাবে। কিন্তু সেখানে নতুন করে বড় ধরনের বিঘœ ঘটলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। বিশ্বব্যাংক এপ্রিলের কমোডিটি মার্কেটস আউটলুকে সতর্ক করেছিল, মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে ২০২৬ সালে ব্রেন্টের গড় মূল্য ৯৫ থেকে ১১৫ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। একই সঙ্গে সামগ্রিক পণ্যদ্রব্যের মূল্য ২০২৬ সালে প্রায় ১৬ শতাংশ এবং জ্বালানি মূল্য প্রায় ২৪ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া আছে।

 

আসল বিপদ তেল নয়- গ্যাস ও সার

এই সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো তেল থেকে গ্যাস এবং গ্যাস থেকে সারের সংযোগ। প্রাকৃতিক গ্যাস অ্যামোনিয়া সার উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল। অ্যামোনিয়া থেকে তৈরি হয় ইউরিয়া। তাই এলএনজি ও গ্যাসের সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী সংকট হলে তার অভিঘাত সরাসরি সার বাজারে পৌঁছে যায়। বিশ্বের মোট এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক সার বাণিজ্যের আনুমানিক ৩০ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে হরমুজ-নির্ভর।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এর বাস্তব প্রতিফলনও দেখা যাচ্ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে কাতারের এলএনজি রপ্তানি প্রায় ৯৬ শতাংশ কমে গেছে; যুদ্ধের আগে বিশ্ব এলএনজি বাজারে কাতারের অংশ ছিল প্রায় ২০ শতাংশ। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র তার এলএনজি রপ্তানি বাড়িয়ে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে।
ইউরোপীয় এলএনজির দামও আগস্টে ২২.৮৩ ডলার/ এমএমবিটি তে উঠে ২০২৩ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং এক বছর আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। এশিয়ার জেকেএম এলএনজি বেঞ্চমার্ক-ও আগস্টে প্রায় ১৩ শতাংশ বেড়েছে।
এখানে একটি ভয়ংকর সমীকরণ তৈরি হচ্ছে-
গ্যাসের দাম বৃদ্ধি → সার উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি → ইউরিয়ার দাম বৃদ্ধি → কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি → খাদ্যের দাম বৃদ্ধি।
বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালে সারমূল্য সূচক প্রায় ৩১ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। অর্থাৎ খাদ্য সংকটের বীজ অনেকাংশে জ্বালানি সংকটের মধ্যেই নিহিত।

 

বাংলাদেশ কেন বেশি ঝুঁকিতে?

বাংলাদেশের ঝুঁকি কয়েকটি স্তরে। প্রথমত, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর। মার্চের মধ্যপ্রাচ্য সংকটের সময় বাংলাদেশকে জ্বালানি বিক্রিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, এলএনজি। কাতার ২০২৫ সালে বাংলাদেশকে প্রায় ৪.১৫ মিলিয়ন টন এলএনজি সরবরাহ করেছিল। কিন্তু চলমান সংকটের কারণে ২০২৬ সালের নির্ধারিত কাতারি এলএনজি সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে বেশি এলএনজি কিনতে হচ্ছে।
স্পট মার্কেটের সমস্যা হলো- সংকটের সময় বাংলাদেশকে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ভারত ও ইউরোপের ক্রেতাদের সঙ্গে একই বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হয়। যার অর্থনৈতিক সামর্থ্য বেশি, সে বেশি দাম দিয়ে কার্গো কিনতে পারে।

 

ডলার ও রিজার্ভের ওপর দ্বিতীয় আঘাত

এখানেই বাংলাদেশের আরেকটি বড় দুর্বলতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে জুলাই ২০২৬ শেষে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৬.৪২ বিলিয়ন ডলার; আইএমএফ’র বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে তা ছিল প্রায় ৩১.৬০ বিলিয়ন ডলার। দেখতে সংখ্যাটি স্বস্তিদায়ক মনে হলেও জ্বালানি, এলএনজি, সার ও খাদ্যের আন্তর্জাতিক মূল্য একসঙ্গে বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় দ্রুত বাড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬- অর্থবছরে দেশের পণ্য আমদানি প্রায় ৭৫.২৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১০.১ শতাংশ বেশি। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ২০২১ থেকে ২০২৫ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক জ্বালানি, সার ও খাদ্যের আমদানি বিল পরিশোধে রিজার্ভ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছে।
অতএব আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের দাম আবার বড় আকারে বাড়লে বাংলাদেশের ওপর চাপ হবে দ্বিমুখী: আমদানি ব্যয় বাড়বে + ডলারের চাহিদা বাড়বে। এর ফলে টাকার ওপরও অবমূল্যায়নের চাপ তৈরি হতে পারে।
২৭ আগস্ট ২০২৬-এ বাংলাদেশ ব্যাংকের আন্ত-ব্যাংক ডলার হার ছিল প্রায় ১২৩ টাকা। টাকার আরও অবমূল্যায়ন হলে বিদেশ থেকে আমদানি করা প্রতি ব্যারেল তেল, প্রতিটি এলএনজি কার্গো এবং প্রতি টন সার বাংলাদেশের জন্য আরও ব্যয়বহুল হবে। তারপর আসবে মূল্যস্ফীতি। এখানেই বিষয়টি সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে। এলএনজি’র দাম বাড়লে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বাড়ে। সারের দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। এসব ব্যয়ের শেষ ভার পড়ে ভোক্তার ওপর। ফলে একটি সম্ভাব্য চক্র তৈরি হয়-
তেল ↑ → পরিবহন ব্যয় ↑ → উৎপাদন ব্যয় ↑ → খাদ্যের দাম ↑ → মূল্যস্ফীতি ↑ → মানুষের প্রকৃত আয় ↓।
আর যদি একই সময়ে টাকার বিনিময় হার দুর্বল হয়, তাহলে আমদানি-নির্ভর মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হয়।

 

খাদ্য সংকট সেপ্টেম্বরেই নয়, বিপদ হতে পারে ২০২৭-এ

এখানে আতঙ্কের পরিবর্তে বাস্তবতা বোঝা জরুরি। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা এলেই বাংলাদেশের বাজারে সঙ্গে সঙ্গে চাল বা খাদ্যের ঘাটতি দেখা দেবে- এমন নয়। সরকারি খাদ্য মজুত, বেসরকারি আমদানি এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ কিছু সময়ের জন্য পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি ও সার সংকট হলে বিপদটি পরবর্তী কৃষি মৌসুমে প্রকাশ পাবে।
বিশ্বব্যাংকের জুন ২০২৬-এর জরুরি সহায়তা প্যাকেজে বাংলাদেশকে ১.১ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে প্রায় ৬ লাখ টন সার আমদানির ব্যবস্থা করা হবে, যা প্রায় ১৪ লাখ হেক্টর কৃষিজমিতে সহায়তা করবে। এটি প্রমাণ করে যে বিষয়টি কেবল ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; খাদ্য ও কৃষি সরবরাহের ঝুঁকি ইতোমধ্যে নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে পৌঁছেছে।

 

এখন বাংলাদেশের করণীয়

সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহকে আতঙ্কের সময় হিসেবে দেখা উচিত নয়; দেখা উচিত প্রস্তুতির শেষ সতর্কবার্তা হিসেবে। প্রথমত, পর্যাপ্ত জ্বালানি ও এলএনজির নিরাপদ মজুত নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ইউরিয়া ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সারের বাফার স্টক বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, খাদ্যশস্যের সরকারি মজুতকে শুধু স্বাভাবিক চাহিদার ভিত্তিতে নয়, সম্ভাব্য বৈশ্বিক সরবরাহ-ব্যাঘাতের ভিত্তিতে পরিকল্পনা করতে হবে।
চতুর্থত, এলএনজি ও জ্বালানি আমদানিতে একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরবরাহকারী ও রুটের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, সম্ভাব্য আমদানি ব্যয়ের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য সংরক্ষণ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জ্বালানি, সার, খাদ্য, রিজার্ভ ও মূল্যস্ফীতিকে আলাদা আলাদা সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো একই অর্থনৈতিক শৃঙ্খলের পরস্পর-নির্ভর অংশ।
বিশ্ববাজারে এখনো কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। তেলের দাম ৯০ ডলারের নিচে এবং কূটনৈতিক তৎপরতা হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার সম্ভাবনা তৈরি করছে। কিন্তু একই সময়ে এলএনজি বাজার অত্যন্ত টানটান এবং ইউরোপ ও এশিয়া ভবিষ্যৎ সরবরাহের জন্য প্রতিযোগিতা করছে।
সুতরাং সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কী হবে, তা নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- যদি পরিস্থিতি আবার খারাপ হয়, বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত? আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধের অভিঘাত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার পরবর্তী যুদ্ধ হয় তেল, গ্যাস, সার, খাদ্য ও ডলারের বাজারে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই একটাই- সংকট শুরু হওয়ার পর বাজারে ছুটে গিয়ে জ্বালানি, সার ও খাদ্য কেনা নয়; সংকটের আগেই নিরাপদ মজুত, বিকল্প সরবরাহ, পর্যাপ্ত রিজার্ভ এবং কার্যকর কন্টিনজেন্সি প্ল্যান তৈরি করাই অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রথম শর্ত। কারণ জ্বালানি সংকটের তাৎক্ষণিক অভিঘাত আমরা দেখব পাম্পে ও কারখানায়; কিন্তু তার দীর্ঘমেয়াদি মূল্য দিতে হতে পারে কৃষিক্ষেত্রে, খাদ্যের বাজারে এবং প্রতিটি পরিবারের রান্নাঘরে।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট