চট্টগ্রাম রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কালুরঘাট বিসিক শিল্পনগরীএ যেন ‘মগের মুল্লুক’

কালুরঘাট বিসিক শিল্পনগরী : এ যেন ‘মগের মুল্লুক’

তাসনীম হাসান

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১১:১২ পূর্বাহ্ণ

কালুরঘাট বিসিক শিল্পনগরীর প্রধান প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকে আঁকাবাঁকা সড়ক পেরোতেই হাতের বাঁ পাশে চোখে পড়ে সি এন্ড এ টেক্সটাইল লিমিটেডের চারটি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের দুটির ভবন একতলা, অন্য দুটি চার ও সাততলা। একতলা ভবন দুটির এখন কাঠামো ছাড়া প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। দরজা-জানালা থেকে শুরু করে ভেতরের প্রায় সব সরঞ্জামই লুট হয়ে গেছে। একটি ভবনের ছাদও খুলে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। অন্য দুই ভবনের জানালাসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা জিনিসও নিয়ে গেছে তারা।

 

নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ এসব প্রতিষ্ঠানের দেখভালেরও কেউ নেই। সেই সুযোগেই শুরু হয় লুটপাট। সি এন্ড এ টেক্সটাইলের প্রতিষ্ঠানগুলোতে একের পর এক লুটপাটের পর এবার দুর্বৃত্তদের নজর পড়েছে আশপাশের কারখানাগুলোতেও। এরই মধ্যে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে চুরি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।

 

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এসব ঘটনায় জড়িত রয়েছে প্রায় ৩০ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল। দলটির দৌরাত্ম্যে অনেকটাই জিম্মি হয়ে পড়েছেন শিল্পনগরীর ব্যবসায়ী ও শ্রমিক-কর্মচারীরা। আগে বিচ্ছিন্নভাবে চুরির ঘটনা ঘটলেও সাম্প্রতিক সময়ে দিনের আলোতেই প্রকাশ্যে লুটপাট চলছে। মাসের শুরুতে শ্রমিক-কর্মচারীরা বেতন তুলতে গেলেও তাদের কাছ থেকে পুরো বেতনের টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। বাধা দিতে গেলে নিরাপত্তারক্ষীদেরও দেখানো হচ্ছে ভয়ভীতি।

অথচ প্রায় পাঁচ দশক আগে, ১৯৭৮ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বিসিক শিল্পনগরীতে দেশ গার্মেন্টসের হাত ধরে শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পথচলা। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) অধীন দেশের ৮২টি শিল্পনগরীর একটি এটি। এখানে ১৫৯টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্লট বরাদ্দ রয়েছে। কিছু কারখানা চালু থাকলেও অনেকগুলোই নিষ্ক্রিয় বা বন্ধ। প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো এই শিল্পনগরীটি বর্তমানে নিরাপত্তার দিক থেকে কঠিন সময় পার করছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

লুটপাটের পর লুটপাট:
দেড় মাস আগে সানজি টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডে দু’বার চুরির ঘটনা ঘটে। দুর্বৃত্তরা প্রতিষ্ঠানটিতে ঢুকে একবার ১০ লাখ টাকার পাওয়ার কেবল ও দেড় লাখ টাকার মোটর কেবল এবং আরেকবার দেড় লাখ টাকার এসির কপার পাইপ চুরি করে নিয়ে যায়।

একই শিল্পগ্রুপের মালিকানাধীন আরেক প্রতিষ্ঠান ওয়েলমার্টেও সম্প্রতি চুরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি লুটপাটের শিকার সি এন্ড এ টেক্সটাইল লিমিটেডের সাততলা ভবনটির লাগোয়া। দুর্বৃত্তরা সেটি দিয়ে তৃতীয় তলার জানালা কেটে ওয়েলমার্টের ভেতরে প্রবেশ করে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার কেবল নিয়ে যায়।
সানজি টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও উৎপাদন) মোহাম্মদ শওকত নোমান পূর্বকোণকে বলেন, ‘আমি প্রায় ৩০ বছর ধরে কর্মরত আছি। কখনো এমন ঘটনা ঘটেনি। প্রায় এক বছর ধরে দুর্বৃত্তদের হাতে যেন জিম্মি হয়ে পড়েছি।’

সি এন্ড এ টেক্সটাইল লিমিটেডের সবচেয়ে বেশি লুটপাটের শিকার হওয়া একতলা ভবনটির পাশেই মেরিডিয়ান ফুডস লিমিটেডের কারখানা। গত মার্চে এই কারখানার নিচতলায় ঢুকে প্রায় আড়াই লাখ টাকার কেবল নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

মেরিডিয়ান ফুডস লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক ইঞ্জিনিয়ার মো. ফয়জুল ইসলাম বলেন, ‘এমনিতেই বিদ্যুৎ-গ্যাস সমস্যায় কারখানা চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে এখন নিয়মিত চুরি-লুটপাটের শিকার হচ্ছে কারখানাগুলো। দু’জন আমাদের কারখানায় ঢুকে কেবল নিয়ে গেল। আমরা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে একজনকে শনাক্ত করি। কদিন পর দেখি পাশের সি এন্ড এ টেক্সটাইলে ৭-৮ জন লুটপাট চালাচ্ছে। সেখানে আমাদের কেবল নিয়ে যাওয়া সেই ব্যক্তিকেও দেখা যায়।’
আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, ‘পরে আশপাশের মানুষ ধাওয়া দিয়ে চারজনকে আটক করে। পুলিশ এসে ওরা আহত হয়েছে জানিয়ে পাঁচ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ নেয়। কিন্তু কিছুদিন পর তাদের লোকজন এসে অন্যদের হুমকি দিতে থাকে।’

বেতনও নিরাপদ নয়:
চুরি-লুটপাটের পাশাপাশি শিল্পনগরীতে শ্রমিক-কর্মচারীদের কাছ থেকে বেতন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। কালুরঘাট বিসিক শিল্প এলাকায় ১০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেন সরওয়ার আলম। স্বামী-স্ত্রী কোনোমতে সংসার চালান এই আয় দিয়ে। সানজি টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের লিফট অপারেটর সরওয়ার গত ফেব্রুয়ারির শুরুতে শিল্পনগরীর একটি এটিএম বুথ থেকে বেতনের টাকা তুলে বের হচ্ছিলেন। তখন চারজন তাকে ঘিরে ধরে। একজন তার নাভি বরাবর ছুরি ধরে বলে, ‘একদম নড়াচড়া করবি না, নাড়িভুঁড়ি বের করে ফেলব।’ এরপর তার পকেট থেকে বেতনের পুরো টাকাই নিয়ে যায় তারা।

 

সেই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন সরওয়ার আলম। তিনি বলেন, ‘বেতনের টাকার অর্ধেকই চলে যায় বাসা ভাড়ায়। বাকি টাকায় কোনোমতে জীবনধারণ করি। ওই মাসে ছিনতাইকারীরা আমার পুরো মাসের টাকাটাই নিয়ে যায়। ঠিক সময়ে ভাড়া দিতে না পারায় জমিদার বাসায় তালা ঝুলিয়ে দেয়। পরে ধারদেনা করে বাসা ভাড়া দিই। সেই দেনা এখনো শোধ করছি।’শুধু সরওয়ার নন, বেতন হারানোর এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে আরও অনেক শ্রমিক-কর্মচারীর।

 

অবকাঠামোতেও দুর্দশা:
শুধু চুরি-লুটপাট নয়, অবকাঠামোগত সমস্যাতেও জর্জরিত শিল্পনগরীটি। প্রায় সব সড়কই ভাঙাচোরা। সড়কের একাংশ দখল করে গড়ে উঠেছে শত শত ভাসমান দোকান। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এসব দোকানের আশপাশে দিনভর কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের আড্ডা চলে। নারী শ্রমিকদেরও নিয়মিত উত্ত্যক্ত করা হয়। এর সঙ্গে রয়েছে নালা-নর্দমা ভরে থাকা ময়লা-আবর্জনা।

ব্যবসায়ীরা জানান, শিল্পনগরীতে প্রবেশের জন্য চারটি পথ রয়েছে। কিন্তু কোনো পথেই কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে যে কেউ সহজেই শিল্পনগরীতে ঢুকতে পারে। আবার অপরাধ সংঘটনের পর নির্বিঘ্নে বেরিয়েও যেতে পারে।
তাদের মতে, প্রবেশপথগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার এবং বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে চুরি-লুটপাটসহ নানা অপরাধ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

এসব সমস্যার সমাধান চেয়ে গত জুলাইয়ে বিসিক শিল্প মালিক সমিতির পক্ষ থেকে শিল্প মন্ত্রণালয়সহ পাঁচটি সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে চিঠি দেওয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
নিরাপত্তা বাড়ানোর উদ্যোগ:
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন পূর্বকোণকে বলেন, ‘বিসিক শিল্প মালিক সমিতির নেতারা এ বিষয়ে কথা বলতে আমার কাছে এসেছিলেন। আমি সমস্যার কথা শুনেছি। দ্রæত সময়ের মধ্যে সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ বলেন, ‘দুর্বৃত্তদের ধরতে শিল্পনগরীতে টহল বাড়াতে আমি থানা-পুলিশকে বলবো। পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়াতে হবে। যারা এসব লুটপাটের সঙ্গে যুক্ত, তারা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’
চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশ-৩-এর পুলিশ সুপার (এসপি) মাহমুদা বেগম বলেন, ‘বিসিক থেকে নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়ে একটি চিঠি পেয়েছি। আমরা শিগগির তাদের সঙ্গে মিটিং করব। ইতিমধ্যে আমাদের দুটি টিম সেখানে দায়িত্ব পালন করছে। তবে সেখানে আমাদের কোনো স্থাপনা নেই। সেখানে একটি ক্যাম্প করার বিষয়ে এই সপ্তাহেই বিসিকের সঙ্গে কথা বলব। তারা যদি জায়গা দেয়, তাহলে আমাদের ফোর্স নিয়মিত সেখানে থাকতে পারবে।

পূর্বকোণ/মিফতা

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট