লাল মরিচের এক অন্তহীন সমুদ্র। সেই রক্তিম বিস্তারের বুক চিরে মাঝখানে বসে আছেন এক নারী মাথায় আঁচল, পরনে মলিন শাড়ি। মুখে রোদে পোড়া জীবনের রেখা, অথচ ঠোঁটে একরাশ উজ্জ্বল হাসি। তার চারপাছে যতদূর চোখ যায়, কেবল শুকনো মরিচের লাল ঢেউ। তীব্র রোদের নিচে মরিচগুলো যেন মাটিজুড়ে ছড়িয়ে থাকা আগুনের ফুলকি। আর সেই আগুনের মাঝেই শান্ত, নির্বিকার এই নারী মশগুল নিজের কাজে।
সুনিপুণ হাতে সেই অনন্য মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন বাংলাদেশি আলোকচিত্রী কাজী মো. জহিরুল ইসলাম। আট বছর আগে তোলা সেই ছবিই এবার তাকে এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। জাতিসংঘের উদ্যোগে বিশ্বব্যাপী মাটির স্বাস্থ্যরক্ষা ও মাটির ক্ষয় রোধে কাজ করা বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম কোয়ালিশন অব অ্যাকশন ৪ সয়েল হেলথ-এর উদ্যোগে আন্তর্জাতিক নারী কৃষকবর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় ‘হার্ভেস্টিং হোপ’ শিরোনামের ছবিটি বিজয়ী হয়েছে। গত ১২ আগস্ট নিজেদের ওয়েবসাইটে এ ঘোষণা দেয় সংগঠনটি।
ছবিটির বর্ণনায় আয়োজকেরা লিখেছে, বিশ্বজুড়ে জমা পড়া অসংখ্য চমৎকার ছবির মধ্যেও এটি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। কারণ, ছবিটিতে নারী কৃষকদের শক্তি, জ্ঞান এবং কৃষি-পরিবেশ ও খাদ্যব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে তাঁদের অনন্য অবদান অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
কাজী মো. জহিরুল ইসলামের বাড়ি নোয়াখালীতে হলেও বেড়ে ওঠা চট্টগ্রাম শহরে। বন্দরনগরীতে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান ইউরোপে। বর্তমানে বাস করছেন পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে। ছবি তোলার নেশা জহিরুলের ছোটবেলা থেকেই। পড়াশোনা ও কর্মব্যস্ততার ফাঁকে সেই নেশাই তাঁকে নিয়ে যেত দেশের নানা প্রান্তে। ২০১৮ সালের মার্চে তেমনই এক সফরে গিয়েছিলেন বগুড়ায়। সেখানেই তাঁর ক্যামেরায় ধরা পড়ে লাল মরিচের সমুদ্রের মাঝে বসে থাকা সেই নারী।
বাকিটা শোনা যাক কাজী মো. জহিরুল ইসলামের মুখ থেকেই, “দিনটি ছিল ২০১৮ সালের ১৯ শে মার্চ। সেদিন সকালে আমি মরিচ ক্ষেতের ছবি তুলেছিলাম, যেখানে নারী শ্রমিকেরা যত্নসহকারে ভালো মরিচগুলোকে নষ্ট মরিচ থেকে আলাদা করছিলেন। বিকেলে আমি ক্যামেরা ব্যাগে ভরে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, ঠিক তখনই হঠাৎ একটি দৃশ্য আমার নজর কাড়ল। দেখলাম এক বয়স্ক নারী নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন। আমি আবারও ক্যামেরা বের করলাম। তার সঙ্গে কথা বললাম। তারপর স্বতঃস্ফ‚র্তভাবেই সেই মুহূর্তটিকে ক্যামেরাবন্দী করলাম।’
আয়োজকেরা জানিয়েছে, এ পুরস্কার মূলত একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার সুযোগ। প্রতিযোগিতার নিয়ম অনুযায়ী বিজয়ী ছবিটি কোয়ালিশন অব অ্যাকশন ৪ সয়েল হেলথ-এর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করবে। ছবিটি পেশাদারভাবে মুদ্রণ করে আগামী সেপ্টেম্বরে রুয়ান্ডার কিগালি কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিতব্য আফ্রিকা ফুড সিস্টেমস ফোরাম ২০২৬-এ প্রদর্শন করা হবে।
এর আগেও জহিরুল ইসলামের আলোকচিত্র বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতায় স্থান পেয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাঁর কাজ পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও। সেই অর্জনের মুকুটে এবার যুক্ত হলো আরও একটি পালক-‘হার্ভেস্টিং হোপ’।
ছবিটির বয়স পেরিয়েছে আট বছর। কিন্তু এত বছর পরও সেই ছবির নারীর হাসি আলোকচিত্রীর মনে অমলিন। জহিরুল ইসলাম বলেন, “এত বছর পরেও আমি আজও আমার মানসপটে সেই হাসি দেখতে পাই। সেই মুহূর্তটি আমাকে জীবন সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। কখনও কখনও আমাদের জীবন নানা প্রতিক‚লতা, দায়িত্ব আর অনিশ্চয়তায় ঘেরা থাকে। তবুও ওই নারীর মতোই আমরা কাজ করে যাই, হাসিমুখে এগিয়ে চলি এবং আশা ধরে রাখি।”
আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতিকে তাই শুধু একটি আলোকচিত্র পুরস্কার হিসেবে দেখছেন না জহিরুল ইসলাম। পূর্বকোণকে তিনি বলেন, “আমার কাছে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এই স্বীকৃতি প্রথাগত কোনো আলোকচিত্র পুরস্কারের গন্ডি ছাড়িয়ে অনেক বেশি কিছু। বিজয়ী ছবিটিকে কৃষি, খাদ্যব্যবস্থা, মাটির স্বাস্থ্য, নারী কৃষক এবং জলবায়ু সহনশীলতা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরছে। ফলে ছবিটি নীতিনির্ধারক, কৃষিখাতের নেতৃবৃন্দ, গবেষক, উন্নয়ন সংস্থা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীজনদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছে।”
সময় পেরিয়ে গেছে। মুছে যায়নি শুধু সেই কৃষাণীর হাসি। আজ যেন সেই হাসিই বাংলাদেশের হয়ে কথা বলছে বিশ্বমঞ্চে!
পূর্বকোণ/নুসরাত
















