চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার কেন্দ্র এই নগরী। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আজও উত্তরহীন- দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখা এই নগরী কেন এখনও উন্নত স্বাস্থ্যসেবার জন্য ঢাকার দিকে তাকিয়ে থাকবে?
চট্টগ্রাম ও ঢাকার স্বাস্থ্যসেবার ব্যবধান আজ উদ্বেগজনক। আধুনিক চিকিৎসা, সুপার-স্পেশালিটি সেবা, গবেষণা, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তির অধিকাংশই এখনও রাজধানীকেন্দ্রিক। ফলে ক্যানসার, হৃদরোগ, নিউরোসায়েন্স, কিডনি, জটিল শিশুস্বাস্থ্য কিংবা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মতো চিকিৎসার জন্য হাজার হাজার রোগীকে প্রতিনিয়ত ঢাকায় ছুটতে হয়। এতে শুধু চিকিৎসা ব্যয়ই বাড়ে না; মূল্যবান সময় নষ্ট হয়, অনেক ক্ষেত্রে জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
আশির দশকে আমি যখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছাত্র, তখন এটি ছিল দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সেখানকার মেধাবী শিক্ষার্থীরা স্নাতক শেষে বিপুল সংখ্যায় এফসিপিএস, এমডি, এমএসসহ বিভিন্ন উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতেন। পরবর্তীকালে তাঁরাই সরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ এবং বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতের নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন।
কিন্তু একটি নির্মম বাস্তবতা হলো- যে চিকিৎসকেরা চট্টগ্রাম থেকে বেরিয়ে দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে সমৃদ্ধ করেছেন, তাঁদের নিজেদের শহর সেই উন্নয়নের সমান অংশীদার হতে পারেনি।
এটি কোনো চিকিৎসকের ব্যর্থতা নয়; এটি পরিকল্পনার ব্যর্থতা। চট্টগ্রাম দক্ষ চিকিৎসক তৈরি করেছে, কিন্তু তাদের ধরে রাখার পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, উন্নত প্রযুক্তি, পর্যাপ্ত বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং পেশাগত বিকাশের সুযোগের অভাবে অনেকেই ঢাকায় চলে গেছেন। এটি ব্যক্তিগত পছন্দের চেয়ে অনেক বেশি একটি কাঠামোগত বাস্তবতা।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ চট্টগ্রাম বিভাগে বাস করে। চট্টগ্রাম মহানগরের পাশাপাশি কক্সবাজার, তিন পার্বত্য জেলা, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর, ইপিজেড, ভারী শিল্প, জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙা শিল্প এবং পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার- সব মিলিয়ে এই অঞ্চলে উচ্চমানের জরুরি ও বিশেষায়িত চিকিৎসা অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা ঢাকার তুলনায় কোনো অংশে কম নয়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রধান রেফারেল হাসপাতাল হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু রোগীর চাপ তার সক্ষমতার বহু গুণ বেশি। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সীমিত সম্পদ নিয়ে অসাধারণ নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তাদের সক্ষমতাকে সীমিত করে রেখেছে। শুধু নতুন ভবন নির্মাণ নয়; সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করাই এখন জরুরি।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে উন্নতি হলেও চিকিৎসক, নার্স এবং হাসপাতালের শয্যার প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে এখনও উন্নয়নের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এই সীমিত সম্পদেরও বড় অংশ রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়ায় আঞ্চলিক বৈষম্য আরও প্রকট হয়েছে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে সম্পদ, জনবল এবং বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের বিকেন্দ্রীকরণ অপরিহার্য।
বিশ্বের বহু দেশে রাজধানীর বাইরে শক্তিশালী স্বাস্থ্যনগরী গড়ে তোলা হয়েছে। ভারতের চেন্নাই ও ভেলোর, কিংবা থাইল্যান্ডের ব্যাংকক-সংলগ্ন বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো দেখিয়েছে যে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয় না। বাংলাদেশও সেই পথ অনুসরণ করতে পারে।
চট্টগ্রামের জন্য এখন একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন। এখানে আন্তর্জাতিক মানের একটি ন্যাশনাল সেন্টার অব এক্সেলেন্স ইন হেলথকেয়ার প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যার অন্তর্ভুক্ত থাকবে পূর্ণাঙ্গ সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতাল, আধুনিক ক্যানসার ইনস্টিটিউট, জাতীয় হৃদরোগ কেন্দ্রের আঞ্চলিক শাখা, নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউট, ট্রমা ও বার্ন সেন্টার, অঙ্গ প্রতিস্থাপন ইউনিট এবং একটি শক্তিশালী স্নাতকোত্তর চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি টেলিমেডিসিন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোগ নির্ণয় এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই কেন্দ্র সমগ্র দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জন্য একটি রেফারেল হাবে পরিণত হতে পারে।
একই সঙ্গে দক্ষ চিকিৎসকদের চট্টগ্রামে ধরে রাখতে গবেষণা অনুদান, আন্তর্জাতিক ফেলোশিপ, আধুনিক গবেষণাগার, স্বচ্ছ পদোন্নতি ব্যবস্থা এবং উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসকেরা চট্টগ্রাম ছাড়তে চান না; তাঁরা এমন পরিবেশে কাজ করতে চান, যেখানে তাঁদের জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার পূর্ণ বিকাশ সম্ভব।
চট্টগ্রামে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে নয়, জাতীয় অর্থনীতিতে কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। দেশের রপ্তানি আয়, শিল্প উৎপাদন এবং বন্দর কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত কোটি মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকলে তার সুফল সমগ্র অর্থনীতি ভোগ করবে।
চট্টগ্রাম দেশের অর্থনৈতিক রাজধানী। এখন সময় এসেছে একে স্বাস্থ্যসেবারও দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার। চিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষণার বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আজ যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা শুধু চট্টগ্রামের নয়; সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
চট্টগ্রামের মানুষ কোনো বিশেষ সুবিধা চাইছে না। তারা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের মতোই আধুনিক, সময়োপযোগী ও মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার দাবি করছে। সেই অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যসেবাকে আর অবহেলার ইতিহাসে আটকে রাখা যাবে না। এখনই সময় পরিকল্পিত বিকেন্দ্রীকরণের, সাহসী নীতিনির্ধারণের এবং ভবিষ্যতমুখী বিনিয়োগের।















