ব্যস্ত সড়কের একপাশজুড়ে সারি সারি মাইক্রোবাস আর কার। দেখে বোঝার উপায় নেই-এটি সড়ক, নাকি স্থায়ী কোনো স্ট্যান্ড। বছরের পর বছর ধরে চলা এই অবৈধ দখলে সংকুচিত হয়ে পড়েছে পুরো পথ। স্কুলগামী শিক্ষার্থী থেকে অফিসফেরত মানুষ-প্রতিদিনই দুর্ভোগ আর ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন সবাই। চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাট এলাকার ‘ওয়াপদা কলোনি সড়কের’ চিত্র এটি।
বহদ্দারহাট মোড় থেকে আরাকান সড়ক ধরে একটু এগোলেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যালয়। এই প্রতিষ্ঠানটির সামনের সড়কটিই স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ওয়াপদা কলোনি সড়ক নামে। ফরিদারপাড়া, শমসের পাড়া, খতিবের হাট ও খতিবপাড়া এলাকার অন্তত ৫০ হাজার মানুষের যাতায়াত এই পথ দিয়ে। শশব্যস্ত সেই সড়কটির এক পাশে ন্যাশনাল পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আর বোর্ড কার্যালয় লাগোয়া ওয়াপদা কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই দুটি প্রতিষ্ঠানে কয়েকশ শিক্ষার্থী এই সড়ক ব্যবহার করে। সেই সড়কটিতেই ‘বহদ্দারহাট কার-মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের’ নামে বসানো হয়েছে মাইক্রোবাস-কারস্ট্যান্ড।
গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের প্রবেশমুখেই ২০-২৫ জনের জটলা।
কেউ আড্ডা দিচ্ছেন, কেউ ভাড়ার জন্য হাঁকডাক করছেন, কেউবা যাত্রী নিয়ে তর্কে ব্যস্ত। প্রায় ২০ ফুট প্রশস্ত সড়কের পশ্চিমপাশজুড়ে সারি করে দাঁড়িয়ে আছে মাইক্রোবাস ও কার। প্রবেশমুখ থেকে ওয়াপদা কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শেষ সীমানাপর্যন্ত তখন দাঁড়িয়ে ছিল ২৮টি গাড়ি।
প্রায় এক ঘণ্টা ওই এলাকায় অবস্থান করে দেখা যায়, একের পর এক গাড়ি ঢুকছে, আবার যাত্রী নিয়ে বেরিয়েও যাচ্ছে। একদিকে সড়কের অর্ধেক অংশ স্থায়ীভাবে দখল করে রাখা হয়েছে, অন্যদিকে বাকি অংশে অব্যাহত রয়েছে মাইক্রোবাস ও কার চলাচল। ফলে সাধারণ যাত্রীবাহী যান চলাচলের জায়গা প্রায় থাকছেই না। সড়কটিতে কোনো ফুটপাতও নেই। তাই শিক্ষার্থী ও পথচারীদের ঝুঁকি নিয়ে সড়কের একপাশ ঘেঁষে চলতে হচ্ছে। এর মধ্যে সড়কের একপাশ ভাঙাচোরা। কিন্তু ভালো অংশজুড়ে স্ট্যান্ড থাকায় বাধ্য হয়ে যানবাহন ও মানুষকে চলতে হচ্ছে এবড়োখেবড়ো অংশ দিয়েই।
ন্যাশনাল পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও ওয়াপদা কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঁচজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় পূর্বকোণের। এই শিশুরা বলে, ‘রাস্তার একপাশে সবসময় গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে। ছোট রাস্তায় সারাক্ষণ গাড়ি চলাচল করায় ভয়ে থাকতে হয় সবসময়।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজের কারণে বহদ্দারহাট মসজিদ সংলগ্ন ব্রিজ, খতিবের হাটের কালারপুলসহ তিনটি পুল ভেঙে সংস্কার করা হচ্ছে। এতে বিকল্প হিসেবে এই সড়কের ওপর চাপ বেড়েছে। ফলে মাইক্রোস্ট্যান্ডের কারণে দুর্ভোগ বেড়েছে কয়েকগুণ।
স্থানীয় অন্তত ১০ জন বাসিন্দার দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে পূর্বকোণকে বলেন,‘বহু বছর ধরে সড়কের অর্ধেক অংশ দখল করে স্ট্যান্ড বসানো হয়েছে। এতে প্রতিদিন ভয়াবহ যানজট তৈরি হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক চলাচল। আবার স্ট্যান্ডে থাকা কিছু চালক ও সহকারী রাস্তার ওপর আড্ডা দেন, উচ্চস্বরে অশালীন ভাষায় কথা বলেন, এমনকি চলাচলকারী নারীদের উদ্দেশে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যও করেন। এতে শিক্ষার্থী ও নারীরা চরম অস্বস্তি ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।’ বহুবার প্রশাসন ও থানায় অভিযোগ দিয়েও কোনো সমাধান হয়নি বলে জানান তাঁরা।
বেশিরভাগ গাড়িই রাখা হয় পানি উন্নয়নবোর্ড কার্যালয়ের সীমানাদেয়াল ঘেঁষে। চালকেরা বিশ্রাম ও আড্ডার জন্য প্রায়ই কার্যালয় প্রাঙ্গণে ঢুকে পড়েন।
এভাবে মাইক্রোস্ট্যান্ড গড়ে তোলায় কার্যালয়ের কাজে সমস্যা হয় কিনা জানতে চাইলে চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ পূর্বকোণকে বলেন, ‘এটা আমাদের ওপর একপ্রকার অত্যাচার। কিন্তু সড়কটি তো আমাদের অধীনে নয়, তাই আমরা চাইলেও কোনো ব্যবস্থা নিতে পারি না। আগে স্থানীয় কাউন্সিলরকে জানিয়েছিলাম, কিন্তু কোনো সমাধান পাইনি।’
তবে নিজেদের বহুবছরের পুরনো নিবন্ধনভুক্ত সংগঠন উল্লেখ করে বহদ্দারহাট কার-মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মোহাম্মদ আলমগীর পূর্বকোণকে বলেন, ‘আমাদের সমিতির প্রায় ৫০০ সদস্যের বেশিরভাগই স্থানীয় বাসিন্দা। এলাকার কেউ কেউ হয়তো অভিযোগ করেন, কিন্তু বেশিরভাগই আমাদের পক্ষে। কারণ আমাদের কারণে সড়কটি রাতে সবসময় আলোকিত থাকছে, আমরা না থাকলে তো চুরি-ছিনতাই বেড়ে যাবে।’
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন পূর্বকোণকে বলেন, ‘এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে স্ট্যান্ডটি উচ্ছেদ করা হবে।’
পূর্বকোণ/পিবি
















