মাত্র চার মাস বয়সী ছোট্ট আফরোজা মেহেজাবিনের শরীরটা তীব্র জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। সারা গায়ে লালচে দানার ভিড়ে চেনা দায় সেই নিষ্পাপ মুখটি। কক্সবাজারের রামুর দুর্গম গ্রাম থেকে আসা এই শিশুটির প্রতিটি যন্ত্রণার গোঙানি গিয়ে বিঁধছে মা শাহিনুর আক্তারের বুকে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ‘হাম কর্নারের’ দমবন্ধ পরিবেশ আর ভ্যাপসা গরমে এক মুহূর্তের জন্য চোখের পাতা এক করতে পারছেন না তিনি। নিজের শরীরও ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে, তবুও এক মুহূর্তের জন্যও সন্তানের শরীর থেকে হাতটি সরাচ্ছেন না। যেন হাতের ওই আলতো স্পর্শই যমদূতের কাছ থেকে ছিনিয়ে আনবে সন্তানের প্রতিটি নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস।
এই দৃশ্য কেবল শাহিনুর আক্তারের নয়; চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের হাম কর্নারে এমন শত ‘অজেয় জননী’ এক অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে কেবল মমতা আর মনের জোরে জীবনপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
চমেক হাসপাতালের হাম কর্নারের আরেকটি বিছানায় ধুঁকছে ৯ মাস বয়সী ছোট্ট সিয়াম। নগরীর চকবাজার এলাকা থেকে আসা এই শিশুটির অবস্থাও বেশ করুণ। সিয়ামের মা নুসরাত ছেলের শিয়রে বসে আছেন পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে। সিয়ামের যন্ত্রণাকাতর কান্নায় হাসপাতালের বাতাস ভারী হয়ে উঠলেও মা নুসরাত অবিচল; সন্তানের প্রতিটি নিঃশ্বাসের পাহারাদার হয়ে তিনি লড়ছেন এক অনিশ্চিত আগামীর বিরুদ্ধে।
সরেজমিনে দেখা যায়, চমেক হাসপাতালের হাম কর্নারে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। প্রায় শতাধিক শিশু ভর্তি আছে এখানে। তাদের সবার সঙ্গেই আছেন মায়েরা। শয্যা সংকটে এই মায়েরা পড়েছেন চরম বিপাকে। সিট না পেয়ে অনেক মা হাসপাতালের স্যাঁতসেঁতে মেঝেতেই পেতেছেন কষ্টের সংসার। গুমোট পরিবেশ আর সংক্রামক রোগের ভয়কে তুচ্ছ করে মায়েরা কেবল সন্তানের শিয়রে পাহারাদারের মতো বসে আছেন। নিজের আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে সন্তানের প্রতিটি তপ্ত নিঃশ্বাসের হিসাব গুনেই যেন কাটছে তাদের বিনিদ্র রজনী। যন্ত্রণায় ছটফট করা শিশুকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরে রাখাই এখন তাদের একমাত্র ধ্যান। সন্তানের স্যালাইন লাগানো ছোট্ট অবশ হাতটি যখন মা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রাখেন, তখন সেই স্পর্শই যেন হয়ে ওঠে দুনিয়ার সব ওষুধের চেয়ে শক্তিশালী। মায়েদের এই ধৈর্য আর সাহসিকতার গল্পগুলো হাসপাতালের প্রতিটি কোণে এক নতুন ইতিহাস রচনা করছে।
হাসপাতালের শয্যায় সন্তান ফারিয়ার পাশে বসে আছেন লোহাগাড়ার বাসিন্দা মা পারভীন আক্তার। তাঁর নিজের শরীরও প্রচণ্ড দুর্বল। জ্বর জ্বর অনুভব করছেন। কিন্তু চোখে মুখে কান্তির কোন চিহ্ন যেন নেই। নিস্তেজ শিশুর পাশে বসে থাকা পারভীন আক্তার বলেন, ‘নিজের শরীরের দিকে তাকানোর সময় কই? বাচ্চাটা যখন ব্যথায় ছটফট করে, তখন নিজের সব কষ্ট ভুলে যাই, যখন ও একটু চোখ খুলে তাকায়।’
এভাবেই নিজের কোল খালি হওয়ার শঙ্কাকে জয় করে লড়ে যাচ্ছেন প্রতিটি মা। অনেক মা ইতোমধ্যে তাদের প্রিয় সন্তানকে হারিয়েছেন, তবুও যারা এখনো হাসপাতালের বিছানায় লড়ছেন, তাদের জন্য প্রতিটি মুহূর্ত হলো এক একটি যুদ্ধ জয়ের গল্প। আজ বিশ্ব মা দিবসে অনেক সন্তান মায়ের হাতে তুলে দেবেন ফুলের তোড়া-ভালোবাসার কার্ড। কিন্তু এ মায়েদের দিন কাটছে প্রিয় সন্তানের শুশ্রুষায়।
বিশ্ব মা দিবস আজ
আজ বিশ্ব মা দিবস। মায়েদের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন। প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মা দিবস পালন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে দিবসটির সূচনা হলেও বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে সারা বিশ্বেই পালিত হয়। সে হিসেবে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে আজ বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হবে।
পূর্বকোণ/ইবনুর



















