‘সিটি গভর্মেন্ট ব্যবস্থা চালু হলে সিটি মেয়রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয়ে নাগরিক সেবা প্রদান এমনকি বন্দরনগরী চট্টগ্রামের উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।’
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে পূর্ণাঙ্গ ‘নগর সরকার’ বা সিটি গভর্মেন্ট রূপান্তরের দাবি দীর্ঘদিনের। এ দাবি বাস্তবায়ন হলে সিটি মেয়র পান মন্ত্রী পদমর্যাদা। কিন্তু দাবি পূরণ না হওয়ায় ‘মন্ত্রী’ পদমর্যাদা পাননি সিটি মেয়র। তাতে বাড়েনি সিটি মেয়রের কর্তৃত্ব। এ কারণে সেবা সংস্থার সঙ্গে সিটি মেয়রের সমন্বয়ের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এতে নগরের অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর আসছে না গতি। নগরবাসী বঞ্চিত হচ্ছে জলাবদ্ধতা নিরসনসহ কাক্সিক্ষত নাগরিক সেবা থেকে।
নগরীর কয়েকজন বিশিষ্টজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে (চসিক) পূর্ণাঙ্গ ‘নগর সরকার’ বা সিটি গভর্মেন্ট-এ রূপান্তর করা হলে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের শাসন ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমান সিটি কর্পোরেশন ব্যবস্থায় বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে যে সমন্বয়হীনতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে, নগর সরকার হলে তা দূর হয়ে নাগরিক সেবার মান বাড়বে। নগর সরকারের মূল সুবিধার মধ্যে রয়েছে, প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কার্যক্রমে সমন্বয় করা সহজ হবে। বিশেষ করে-
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চট্টগ্রাম ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগ, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং চসিকÑএসব আলাদা সংস্থা ভিন্ন ভিন্নভাবে কাজ করায় উন্নয়নকাজে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়। কিন্তু নগর সরকার হলে এসব সেবা সংস্থা সরাসরি মেয়রের অধীনে চলে আসবে, ফলে ‘এক সংস্থার’ খোঁড়াখুঁড়ির পর অন্য সংস্থার কাজ বা জলাবদ্ধতার মতো সমস্যাগুলোর দ্রুত ও সমন্বিত সমাধান সম্ভব হবে। তাছাড়া চসিকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা ও দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
যেমন- চসিককে প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্তের জন্য বারবার কেন্দ্রীয় সরকারের মুখাপেক্ষী হতে হবে না। নিজস্ব ক্যাডার সার্ভিস এবং পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন থাকলে মেয়র ও কাউন্সিলররা নিজেদের মেয়াদে পরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারবেন। একইসাথে নগর সরকার ব্যবস্থায় মেয়রের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য শক্তিশালী মনিটরিং কমিটি থাকতে পারে। এর ফলে উন্নয়ন বাজেটের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং নাগরিকরা সরাসরি তাদের প্রতিনিধির কাছ থেকে হিসাব চাইতে পারবেন। তাছাড়া নগর সরকার হলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ট্রেড লাইসেন্স এবং হোল্ডিং ট্যাক্সের পুরো নিয়ন্ত্রণ সিটি কর্পোরেশনের হাতে চলে আসবে। এতে নিজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দের ওপর নির্ভরতা কমে যাবে, ফলে সিটি স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে যাবে।
চট্টগ্রাম যেহেতু দেশের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র, তাই শক্তিশালী নগর সরকার হলে বন্দর ও নগরীর মধ্যে সমন্বয় করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা যাবে, যা চট্টগ্রামকে সত্যিকারের ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন একটি ‘সক্ষম’ ‘স্বায়ত্তশাসিত’ এবং ‘নাগরিকবান্ধব’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, যেখানে স্থানীয় সমস্যার সমাধান স্থানীয়ভাবেই সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নগর সরকার প্রতিষ্ঠা বিলম্ব হলে চট্টগ্রামের উন্নয়নের স্বার্থে বিভিন্ন সেবা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করতে সিটি মেয়রের কর্তৃত্ব বাড়ানো দরকার। এজন্য সিটি মেয়রকে মন্ত্রী কিংবা প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া উচিত। না হয় অন্য সেবা সংস্থাগুলো মেয়রের নির্দেশকে অগ্রাহ্য করবে। কেননা ওইসব সংস্থার প্রধানদের পদমর্যাদা কারো কারো মেয়রের সমান। ফলে সমন্বয় সভায় মেয়র ডাকলেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রধানরা নিজেরা উপস্থিত না হয়ে নিচের স্তরের কোনো একজন প্রতিনিধি পাঠিয়ে থাকেন। তাই সেবা সংস্থাগুলোর ওপর কর্তৃত্ব বাড়াতে চসিক মেয়রের পদমর্যাদা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুসারে- মেয়ররা মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রীর মর্যাদা পান না। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনেও কিছু উল্লেখ নেই এ ব্যাপারে। আর সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী ছাড়া অন্য কাউকে এ মর্যাদা দিতে হলে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়। তার আগে অবশ্য এ বিষয়ে সুপারিশ লাগে প্রধানমন্ত্রীর। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী যদি মেয়রদের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রীর পদমর্যাদা দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেন, সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি সিদ্ধান্ত দেবেন।
নগরের বিশিষ্টজনেরা জানান, সিটি মেয়রদের প্রাপ্য মর্যাদা দিতে কার্পণ্যে তাদের মাঝে কিছুটা হতাশা আসতে পারে। নগরের কাজকর্মেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রধানের জন্য এরূপ পদমর্যাদা দেওয়ার বিধান সেই আইনে আছে কী নেই, তা অপ্রাসঙ্গিক। তা না থাকলেও সরকার ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রথম শ্রেণির পৌরসভার মেয়রদের একটি অবস্থান নির্ধারণ করে দিয়েছে। একইভাবে উপযুক্ত স্থানে সিটি মেয়রদের দেখাতে আপত্তি থাকার কথা নয়। ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স সংশোধন সময়সাপেক্ষ বা কিছু জটিলতা থাকলে আপাতত আগের মতো নির্বাহী আদেশে পদমর্যাদাটি নির্ধারণ করে দেওয়া যায়। তবে সেটা ব্যক্তির বরাতে না করে পদের বিপরীতে করাই যৌক্তিক হবে। তাই তিক্ততা সামনে না এনে দেশের সব সিটি মেয়রের পদের বিপরীতে যথাযথ মর্যাদা নির্ধারণ করে দেওয়ার দাবিটি যুক্তিসঙ্গত।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের পট পরিবর্তনের আগে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের দুই মেয়র ছিলেন ‘মন্ত্রী’ পদমর্যাদার। এমন কী রাজশাহী ও খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রও ‘মন্ত্রী’ পদমর্যাদা পান। কিন্তু ব্যত্যয় ঘটে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের। চট্টগ্রামে মেয়র হিসেবে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা পেয়েছিলেন জাতীয় পার্টির নেতা আলহাজ মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি ৮০ দশকের শেষের দিকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রথম মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দলটির মেয়র হন মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন। ওইসময়ে তিনিও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় সিটি মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
পরবর্তীতে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। দীর্ঘসময় মেয়রের দায়িত্ব পালনকালে একটা সময় তিনিও প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা পান। মহিউদ্দীন চৌধুরীর পর বিএনপির এম. মনজুর আলম ও আওয়ামী লীগের আ জ ম নাছির উদ্দীন ও রেজাউল করিম চৌধুরী চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হয়েছিলেন। মন্ত্রিত্বের পদমর্যাদা পাননি তিনজনের কেউ-ই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হন বিএনপির ডা. শাহাদাত হোসেন। কিন্তু তিনি এখনো ‘মন্ত্রী’ পদমর্যাদা পাননি। এ নিয়ে চট্টগ্রামবাসীর মনে রয়েছে হতাশা-ক্ষোভ। বিশেষ করে ভৌগলিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যার দিক বিবেচনায় দেশের ১২টি সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে চট্টগ্রাম অন্যতম। চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হলেও কিন্তু সেই সিটির মেয়রের নেই মন্ত্রী পদমর্যাদা। এ কারণে নগরীর অনেক জনগুরুত্বপূর্ণ কাজে সিদ্ধান্ত নিতে সরকারি সেবা সংস্থাগুলোর প্রধানদের পাশে পান না সিটি মেয়র। তাতে সমস্যাগুলো বছরের পর বছর ধরে সমাধান হচ্ছে না। তাছাড়া সরকারি যে কোন উন্নয়ন কাজে সমন্বয় সাধনের ক্ষেত্রেও ব্যত্যয় ঘটছে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রকে মন্ত্রী পদমর্যাদা দিতে সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে গত ২৪ মার্চ একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। যেহেতু নগর সরকার বাস্তবায়ন একটু সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাই সিটি মেয়রকে মন্ত্রী পদমর্যাদা দিলে নগরীর সেবা সংস্থার সাথে সমন্বয় করা সহজ হবে। তাতে নগরীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসনসহ বিভিন্ন কাজে গতি আসবে। এতে উপকৃত হবে নগরবাসী।’
নগর সরকার হলে সমন্বয় বাড়বে এবং উন্নয়ন সহজ হবে : এম মনজুর আলম
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আলহাজ এম মনজুর আলম নগর সরকারের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেন, ‘পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশে নগর সরকার ব্যবস্থা রয়েছে। এক প্রতিষ্ঠান আরেক প্রতিষ্ঠানের উপর কর্তৃত্ব করা নয়, উন্নয়নের ক্ষেত্রে সব বিভাগের মধ্যে সমন্বয় সাধন হবে এবং উন্নয়ন করা সহজ হবে। তাতে দেশের উন্নয়ন ও জনগণ উপকৃত হবে। নগর সরকার হলে কর্পোরেশনের যে কোন উন্নয়ন কাজে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো থেকে সহযোগিতা নেওয়া যায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী ঘোষণা করেছেন। আমি মনে করি, বর্তমান সরকারও চট্টগ্রামের উন্নয়নের ব্যাপারে অনেক আন্তরিক। সরকার চাইলে চট্টগ্রামের নেতাদের সাথে আলোচনা করে এ ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
মেয়র ‘মন্ত্রী’ পদমর্যাদায় থাকলে সরকারের সব সংস্থার সাথে সমন্বয় করা সহজ হয়: মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আলহাজ মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চসিকে ‘নগর সরকার’ চালু ছিল। আমি ছিলাম ‘প্রতিমন্ত্রী’ পদমর্যাদার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র। তখন প্রতিমাসে চট্টগ্রামের সব সংস্থার প্রধানদের উপস্থিতিতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে সমন্বয় সভা হতো। তাতে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম ওয়াসার চেয়ারম্যান, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধানরা উপস্থিত থাকতেন। সভায় সবসংস্থার প্রধানদের জবাবদিহি করতে হতো। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে বিল পাস করে দেশের সিটি কর্পোরেশনগুলোর ‘নগর সরকার’ ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে নগর সরকার ব্যবস্থা এবং সিটি মেয়র ‘মন্ত্রী’ পদমর্যাদায় থাকলে সরকারের সব সংস্থার সাথে মেয়রের সমন্বয় করা সহজ হয়। সরকারের যে কোন কাজ বাস্তবায়ন দ্রুত করা যায়।’
পূর্বকোণ/আরআর


















