চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

সর্বশেষ:

আমি যত উঁচুতেই উঠি না কেন, পা থাকে মাটিতেই

বাবর আলীর সাক্ষাৎকার

আমি যত উঁচুতেই উঠি না কেন, পা থাকে মাটিতেই

তাসনীম হাসান

৬ মে, ২০২৬ | ১১:৪১ পূর্বাহ্ণ

মাউন্ট এভারেস্ট তো বটেই, পাঁচ পাঁচটা ৮ হাজারি পর্বত শৃঙ্গ জয়ের কৃতিত্ব তাঁর ঝুলিতে।সদ্যই লাল সবুজের পতাকা উড়িয়ে এসেছেন বিশ্বের পঞ্চম সর্বোচ্চ পর্বত-মাউন্ট মাকালুর চূড়ায়। যাকে ঘিরে এই আলোচনা, তাকে কি আর নতুন করে পরিচয় দেওয়ার দরকার আছে-নামটা বাবর আলী, মাত্র ৩৫ বছরেই যিনি হয়ে উঠেছেন কিংবদন্তী পর্বতারোহী। তিনি চট্টগ্রামেরই সন্তান।

 

প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে নেপালের মহালাঙ্গুর হিমালে অবস্থিত মাকালু পর্বত শৃঙ্গ জয় করা বাবর এখনো আছেন বেসক্যাম্পেই, তাঁবুতে।

 

রবিবার সন্ধ্যায় কনকনে ঠাণ্ডা আর হাওয়ার মাঝে পূর্বকোণকে মুঠোফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভক্তদের সামনে একরাশ উষ্ণতাই যেন ছড়িয়ে দিলেন বাবর আলী।

 

শুরুতেই এত এত শৃঙ্গ জয়ের পর নিজেকে এখন কীভাবে দেখেন-এমন প্রশ্নে বাবরের তাৎক্ষণিক জবাব-‘আমি যত উঁচুতেই উঠি না কেন, আমার পা থাকে মাটিতেই’| কথাটি বলার সময় কণ্ঠে ছিল না কোনো অহংকার, শুধু ছিল নিজের প্রতি অবিচল বিশ্বাস-দৃঢ়তা। 

 

বাবর বলেন, ‘৮ হাজার মিটারের চূড়া হোক কিংবা তার চেয়েও উঁচু স্বপ্ন-শেষ পর্যন্ত তো আমাকে ফিরতে হবে সমুদ্র সমতলের চট্টগ্রামেই। আবার সেখান থেকেই শুরু করতে হবে নতুন যাত্রা। এভারেস্ট জয়ের পর মাকালুতে যাওয়া মানে এই নয় যে এভারেস্টের উচ্চতা থেকেই এগিয়ে যাচ্ছি; বরং প্রতিবারই সমতল থেকেই শুরু করতে হচ্ছে।’

 

প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে মাকালু জয়ের মুহূর্তটা বাবর আলী বর্ণনা করলেন ঠিক এভাবেই-‘পর্বতের চূড়ায় দাঁড়িয়ে দেশের পতাকা উড়ানো-এ এক অনন্য অনুভূতি।’

 

মাউন্ট এভারেস্ট নাকি মাকালু-কোনটি জয় করা বেশি কঠিন ছিল, এমন প্রশ্নে বাবর আলী একটু ভাবলেন। তারপর ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, ‘দুটোর তুলনা হয় না। প্রতিটি পর্বতের আলাদা চরিত্র আছে। পর্বতে সবসময় ঠাণ্ডা, বাতাস-এগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। সেদিক থেকে তুলনা করতে বললে আমি নির্দ্বিধায় বলবো মাকালুই টাফ ওয়ান, অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। ঠাণ্ডা আর তীব্র বাতাসের সঙ্গে লড়াই এখানে অনেক বেশি নির্মম।’

 

মাকালু বাবরের সামনে কঠিন হয়েছে আরও এক কারণে। এ বছরের শুরুতে মাকালু অভিযানে দুজন পর্বতারোহী প্রাণ হারিয়েছেন। সেখানে একজনের সঙ্গে বাবর অন্য আরেক পর্বতে আরোহণ করেছিলেন। সেজন্য এই শৃঙ্গে ওঠা তার কাছে ছিল একটু কঠিনই।

 

২০১৯ সালে অন্য পর্বতারোহীদের কথা না শুনে ভারতে একটি পর্বতে উঠতে গিয়ে তুষারঝড়ের কবলে পড়েছিলেন বাবর। কয়েকবছরের মাথায় নিজের ভুলে আরেকবার পড়েছিলেন তুষার ধসের সামনে। দুবারইও ভাগ্য বাঁচিয়ে দিয়েছিল তাকে| ছোট ছোট এসব ভুলই তাকে শাণিত করেছে। 

 

পর্বত মানেই দেখলাম, উঠলাম, জয় করলাম-এমন সহজ কিছু নয়| প্রতিটি পদক্ষেপেই লুকিয়ে আছে মৃত্যুর ডাক। তবে বাবরের জন্য এটি সহজ হয়েছে বাবা-মায়ের নিরন্তর দোয়া আর শুভকামনায়। পর্বতে যাওয়ার আগে বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার অনুভুতি জানাতে গিয়ে এই তরুণ বললেন, ‘আমার বাবা-মা অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। ভয় হয়তো তাদের ভেতরেও থাকে, কিন্তু দেখান না। কারণ তারা জানেন-পর্বতারোহণটা সরিয়ে ফেললে আমি আর বাবর থাকবো না।’

 

যেখানে অনেক পর্বতারোহী একবার এভারেস্ট জয় করলেই জীবন সফল মনে করেন, সেখানে বাবর একের পর এক চূড়ায় উঠছেন। সব সাহসের উৎস কী? হেসে বাবর বললেন, ‘আত্মবিশ্বাস আর কৌতূহল। যখন যে পর্বত জয়ের স্বপ্ন দেখি, তখনই প্রস্তুতি শুরু করি। নিজেকে বলি-এটা জয় করতেই হবে| আর আমার প্রধান চালিকাশক্তি কৌতূহল| যেদিন কৌতূহল হারিয়ে ভয় জায়গা করে নেবে, সেদিন হয়তো আর পর্বতে যাওয়া হবে না।’

জীবন আর পর্বত-দুটোর মধ্যে বেছে নিতে হলে বাবর আলী বিনা দ্বিধায় বেছে নেন জীবনকেই| কারণ, তার বিশ্বাস-এই বিশাল প্রকৃতির টাইমলাইনে তিনি খুব ক্ষুদ্র এক অংশ| আর সেই জীবনের ভেতর দিয়েই তিনি ছুঁয়ে দেখেন পর্বতের চূড়া, পৌঁছে যান এমন সব জায়গায় যেখানে খুব কম মানুষই যেতে পারেন।

বাংলাদেশে পর্বতারোহণের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশাবাদী বাবর| তবে হিমালয়ের এত কাছাকাছি থেকেও আমরা এখনো সেই অর্থে বড় অবদান রাখতে পারিনি-এই আক্ষেপ আছে তার। সেজন্য তরুণদের জন্য বান্দরবানের মতো জায়গাগুলোকে আরও উন্মুক্ত করার কথা বলেন তিনি| কারণ বড় স্বপ্ন দেখার জন্য আগে প্রয়োজন ছোট ছোট পাহাড় ডিঙানো।

কোথায় থামতে চান-এমন প্রশ্নে বাবর কোনো রাখঢাক না রেখেই বললেন, ‘পৃথিবীতে ১৪টি আট হাজারি শৃঙ্গ রয়েছে| সবটাই জয় করতে চাই। পাঁচটা হয়ে গেছে, আরো নয়টি আছে। আশা করি সেগুলোও হয়ে যাবে।’

রেকর্ডের জন্যই বাবর এতো শৃঙ্গ ছুঁতে চান এমন নয়। তার দর্শনটা অন্যরকম-‘রেকর্ড কখনো মাথায় থাকে না| আমি যা করতে চাই, সেটা করতে পারার আনন্দটাই আসল। পর্বত আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা| সেখানে যতটা সম্ভব সময় কাটানো-এটাতেই আমার আনন্দ।’

 

বাবর আলীর গল্প তাই শুধু চূড়ায় ওঠার আখ্যান নয়| এটি প্রতিবার নিচে নেমে এসে আবার শুরু করার গল্প। এটি ভুল থেকে শেখার, ভয়কে অতিক্রম করার, আর কৌতূহলকে বাঁচিয়ে রাখার গল্প।

সবচেয়ে বড় কথা-এটি এমন এক ‘মাটির মানুষের’ গল্প, যিনি আকাশ ছুঁয়েও বলতে পারেন মাটিই তার চিরঠিকানা।

 

কবি সুনির্মল বসুর সেই বিখ্যাত পংক্তিই যেন প্রতিধ্বনিত হয় বাবরের জীবনে-‘পাহাড় শিখায়, তাহার সমান হই যেন ভাই-মৌন, মহান।’

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট