পতেঙ্গা এলাকার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন রহিমা খাতুন (ছদ্মনাম)। কয়েক মাস ধরে তীব্র শ্বাসকষ্টে ভুগলেও তিনি ইনহেলার ব্যবহার করেন না। রহিমার ভয়, ‘একবার ইনহেলার ধরলে কলিজা শুকিয়ে যাবে, মানুষ জানলে কাজ থাকবে না।’ রহিমার মতো এমন হাজারো শ্রমিকের ফুসফুস এখন শিল্পাঞ্চলের বিষাক্ত ধূলিকণা আর ভুল চিকিৎসার গোলকধাঁধায় আটকা পড়েছে।
অথচ চিকিৎসকরা বলছেন, ইনহেলার সরাসরি ফুসফুসে কাজ করে বলে এর কার্যকারিতা বেশি এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক কম। সঠিক সময়ে ইনহেলার ব্যবহার না করায় সাধারণ হাঁপানি রোগীদের শেষ পর্যন্ত আইসিইউ বা জরুরি বিভাগের দিকে যেতে হচ্ছে, এমনকি মৃত্যুবরণ করছেন ও ফুসফুসের জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, হাঁপানি রোগ নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইনহেলার নিয়ে ভীতি, ফার্মেসিনির্ভর ভুল চিকিৎসা এবং ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণ। চিকিৎসা পদ্ধতি ও কার্যকর ওষুধ থাকা সত্ত্বেও এই তিনটি কারণের প্রভাবে অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রেই রোগ নিয়ন্ত্রণে আসছে না বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসকদের মতে, প্রদাহ-বিরোধী ইনহেলার ব্যবহারের মাধ্যমে হাঁপানি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও বাস্তবে দেশের বড় একটি অংশ এই চিকিৎসার বাইরে রয়েছে। দেশে আনুমানিক ৭০ লাখ মানুষ হাঁপানিতে ভুগছেন, তবে গবেষণা অনুযায়ী প্রায় ৯০ শতাংশ রোগীই আধুনিক চিকিৎসা, বিশেষ করে ইনহেলার ব্যবহারের সুযোগ বা অভ্যাস থেকে বঞ্চিত।
এদিকে, চট্টগ্রামের ইপিজেড, সীতাকু- কিংবা বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার অলিগলিতে থাকা ফার্মেসিগুলোই এখন নিম্ন আয়ের মানুষের প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র। শ্বাসকষ্টের সঠিক কারণ নির্ণয় না করেই এসব ফার্মেসি থেকে রোগীদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে উচ্চমাত্রার স্টেরয়েড ট্যাবলেট। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, প্রেসক্রিপশন ছাড়া এসব ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহার রোগীর রক্তচাপ বৃদ্ধি, কিডনি ও হাড়ের স্থায়ী ক্ষতি করছে। দ্রুত আরাম মিললেও শ্বাসনালির মূল সমস্যা থেকে যাচ্ছে তিমিরেই।
তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বক্ষব্যাধি বিভাগে প্রতিদিনই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হাঁপানি রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন। তবে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তাদের একটি বড় অংশই নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ করেন না বা সঠিকভাবে ইনহেলার ব্যবহার করেন না, ফলে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
চিকিৎসকদের মতে, ইনহেলার নিয়ে রোগীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই মনে করেন ইনহেলার ব্যবহার করলে অভ্যাস তৈরি হয় অথবা এটি রোগের শেষ পর্যায়ের চিকিৎসা। এই ভীতি ও অজ্ঞতার কারণে রোগীরা প্রাথমিক পর্যায়েই এই কার্যকর চিকিৎসা গ্রহণ থেকে বিরত থাকছেন।
একই সঙ্গে ফার্মেসিনির্ভর চিকিৎসা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। অনেক রোগী চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই সরাসরি ফার্মেসি থেকে ওষুধ গ্রহণ করেন। এতে তারা মূলত সাময়িক উপশমকারী ওষুধ ব্যবহার করলেও রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় প্রদাহ-বিরোধী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত থাকেন, যা দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
এদিকে, বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বায়ুদূষণও হাঁপানি রোগীদের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলাবালি এবং শিল্পকারখানার নির্গমন অ্যাজমার ট্রিগার হিসেবে কাজ করছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকাতেও রান্নার ধোঁয়া ও বায়োমাস জ্বালানির ব্যবহার শ্বাসকষ্টজনিত রোগ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। শিশুদের মধ্যেও হাঁপানির প্রভাব উল্লেখযোগ্য। দেশে প্রতি ১৩ জন শিশুর মধ্যে একজন হাঁপানিতে আক্রান্ত। চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলোতেও শিশুদের শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
মেডিসিন ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ সহকারী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ দিদারুল আলম বলেন, ‘অ্যাজমা একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগ। কিন্তু আমাদের দেশে রোগীরা নিয়মিত ইনহেলার ব্যবহার করেন না। অনেকেই ভুল ধারণায় ভোগেন, আবার অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ নেন। ফলে রোগ জটিল হয়ে ওঠে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রদাহ-বিরোধী ইনহেলার নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে অধিকাংশ রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন ও ভবিষ্যতে ফুসফুসের বিভিন্ন জটিলতার হাত থেকে রক্ষা পাবে।’


















