সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র এবং দেশের বৃহত্তম শ্রমবাজারগুলোর একটি। গত কয়েক দশকে লাখো বাংলাদেশি শ্রমিক, পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী নিজেদের পরিশ্রম, দক্ষতা এবং সততার মাধ্যমে আমিরাতের উন্নয়নযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছেন। একই সঙ্গে তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে এবং দেশের লাখো পরিবারের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সাম্প্রতিক সময়ে আমিরাতে বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা প্রাপ্তি, নতুন কর্মী নিয়োগ, কোম্পানি ট্রান্সফার এবং বিভিন্ন ধরনের শ্রম-সংক্রান্ত অনুমোদন প্রক্রিয়ায় যে জটিলতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। শুধু সাধারণ কর্মপ্রত্যাশীরাই নন, আমিরাতে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরাও এই পরিস্থিতির কারণে নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
বর্তমানে অনেক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী অভিযোগ করছেন যে তাঁদের প্রতিষ্ঠানে কর্মীর চাহিদা থাকা সত্তে¡ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগে জটিলতা দেখা দিচ্ছে। নতুন ভিসা অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা, কিছু ক্ষেত্রে আবেদন প্রত্যাখ্যান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে কর্মীদের কোম্পানি ট্রান্সফার (লেবার ট্রান্সফার) প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যবসা পরিচালনায় গুরুতর সংকট তৈরি হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন খাতের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মী নিয়োগ করতে না পেরে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে নির্মাণ, পরিবহন, রেস্তোরাঁ, খুচরা বিক্রয়, পরিষেবা, কারিগরি ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতের অনেক বাংলাদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বর্তমানে জনবল সংকটে ভুগছে। কাজের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও কর্মী সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান সময়মতো প্রকল্প সম্পন্ন করতে পারছে না। এতে ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়ছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমিরাতে বাংলাদেশিদের উপস্থিতি শুধু শ্রমিকপর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমানে হাজার হাজার বাংলাদেশি উদ্যোক্তা সেখানে ছোট, মাঝারি এবং বৃহৎ ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তাঁরা স্থানীয় অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করছেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন এবং বাংলাদেশি কমিউনিটির মর্যাদা বৃদ্ধি করছেন। তাই ভিসা ও ট্রান্সফার-সংক্রান্ত জটিলতা কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি প্রবাসী ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। প্রতি বছর প্রবাসীরা যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠান, তা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমিরাত এই রেমিট্যান্স প্রবাহের অন্যতম প্রধান উৎস। ফলে এ বাজারে যেকোনো ধরনের দীর্ঘস্থায়ী সংকট বাংলাদেশের জন্যও উদ্বেগের বিষয়। এই প্রেক্ষাপটে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সক্রিয় ও ফলপ্রসূ কূটনৈতিক তৎপরতা। বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেটকে আরও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে নিয়মিত বৈঠক, শ্রমবাজার-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময় এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধানের জন্য কার্যকর আলোচনা জরুরি। একই সঙ্গে বাংলাদেশকেও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ওপর আরও গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমান বিশ্বে শুধু শ্রমিক পাঠালেই হবে না; প্রশিক্ষিত, দক্ষ ও প্রযুক্তি-সচেতন কর্মী তৈরির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে হবে। এতে বাংলাদেশের শ্রমশক্তির গ্রহণযোগ্যতা যেমন বাড়বে, তেমনি ভিসা ও নিয়োগ-সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতা নিরসনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। অন্যদিকে, কিছু অসাধু দালাল ও প্রতারণাকারী চক্রের অপতৎপরতার কারণেও অতীতে শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব অনিয়ম বন্ধে সরকারকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে হবে এবং বৈধ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিদেশগমন নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একটি দেশের শ্রমবাজারের সুনাম রক্ষা করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব।
বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তি অত্যন্ত দৃঢ়। তাই বর্তমান ভিসা ও ট্রান্সফার-সংক্রান্ত জটিলতাকে স্থায়ী সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আন্তরিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, বাস্তবভিত্তিক আলোচনা এবং দুই দেশের সদিচ্ছার মাধ্যমে এ সমস্যার গ্রহণযোগ্য সমাধান সম্ভব। প্রবাসীরা বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। আর প্রবাসী ব্যবসায়ীরা বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাঁদের স্বার্থ রক্ষা করা মানে দেশের স্বার্থ রক্ষা করা। তাই আমিরাতে বাংলাদেশিদের ভিসা জটিলতা, শ্রমবাজারের সীমাবদ্ধতা এবং ব্যবসায়ীদের জনবল সংকট নিরসনে দ্রুত ও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
লেখক: শাহেদ সরওয়ার, তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক, প্রবাসী সাংবাদিক সমিতি, ইউএই
পূর্বকোণ/পিবিরা

















