পিছিয়ে পড়া ব্রাজিল একের পর আক্রমণ করেও গোলের দেখা পাচ্ছিল না। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তখন অনেকটাই জাপানের হাতে। পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিদায়ের শঙ্কা ক্রমেই ঘন হচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই দলের অভিজ্ঞ ফুটবলার কাসেমিরোর দুরন্ত হেডে অসামান্য গোলে সমতায় ফেরা। ওই গোলেই ঘুরে যায় ম্যাচের গতিপথ, ফিরে আসে ব্রাজিল| শেষ পর্যন্ত জয়ের হাসিও হাসে সেলেসাওরা।
ব্রাজিলের সেই প্রত্যাবর্তনের গল্প বলতেই ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ-এর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে কাসেমিরোর ছবি দিয়ে লেখা হলো বাংলায়-‘যদি লক্ষ্য থাকে অটুট, বিশ্বাস হৃদয়ে…’।
কোনো ইংরেজি অনুবাদ নয়। নয় কোনো ভাষান্তর। বাংলার সেই পরিচিত পঙক্তিই ব্যবহার করল বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল সংস্থা। গতকাল বিকেল তিনটা ৫২ মিনিটে প্রকাশিত পোস্টটি মূহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। অল্প সময়েই তাতে জমা পড়ে হাজার হাজার প্রতিক্রিয়া, মন্তব্য ও শেয়ার।
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে বাংলা ভাষার এই অনুপ্রেরণার পঙক্তি দেখে উচ্ছ্বসিত বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা। তবে চট্টগ্রামের মানুষের জন্য গর্বের উপলক্ষটা আরও বড়| কারণ এই কথাগুলোর রচয়িতা যে বন্দরনগরীর সন্তান, দেশের অন্যতম জনপ্রিয় গীতিকার আসিফ ইকবাল।
দুই দশকেরও বেশি আগে জনপ্রিয় সংগীত প্রতিযোগিতা ক্লোজআপ ওয়ান ‘তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ’-এর জন্য গানটি বেঁধেছিলেন আসিফ ইকবাল। উদ্দেশ্য ছিল নতুন শিল্পীদের স্বপ্ন দেখতে শেখানো, কঠিন পথেও হাল না ছাড়ার সাহস জোগানো। আসিফ ইকবাল তখনও হয়তো ভাবেননি, একটি প্রতিযোগিতার জন্য লেখা কয়েকটি লাইন একদিন প্রজন্মের পর প্রজন্মের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে। সময় গড়িয়েছে। গানটি সংগীতের সীমানা পেরিয়ে জায়গা করে নিয়েছে মানুষের জীবনে। খেলার মাঠে বাংলাদেশ দলকে উৎসাহ দিতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করতে, সাংস্কৃতিক আয়োজনে থেকে ব্যক্তিগত সংগ্রামের মুহূর্ত-অসংখ্যবার উচ্চারিত হয়েছে সেই পঙক্তি—‘যদি লক্ষ্য থাকে অটুট…’।
একসময় গানটির লাইন পৌঁছে যায় জাতীয় সংসদেও। এবার তো দেশের সীমানা ছাড়িয়ে একেবারে দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে-বড় স্বীকৃতিটাই যেন পেলেন আসিফ ইকবাল। এমন একটি মুহূর্ত আসবে, আসিফ ইকবাল নিজেও কল্পনা করেননি। সেই কথা লিখতে গিয়ে আবেগ ছুঁয়ে গেছে এই কীর্তিমান গীতকারকেও।
গানের এই যাত্রাপথ স্মরণ করে আবেগঘন এক স্ট্যাটাস দিয়েছেন আসিফ ইকবাল। লিখেছেন, ‘একটু ভাবুন। একটা লাইন। গান থেকে সংসদে। সংসদ থেকে বইয়ের নামে। বই থেকে ফিফার পেজে। প্রতিটা ধাপে আমি শুধু দিয়ে গেছি। কোনোদিন ভাবিনি কোথায় কী পৌঁছাবে। আবেগের ভাষার কোনো অনুবাদ লাগে না| আর যেটা হৃদয় থেকে লেখা, সেটার যাত্রা কেউ থামাতে পারে না। এই অর্জন আমার না। এ অর্জন বাংলাদেশের। বাংলা ভাষার।’
আসিফ ইকবাল আরও লেখেন, ‘আল্লাহর পরিকল্পনা আমার কল্পনার চেয়ে অনেক বড়। চট্টগ্রামের একটা ছেলে একদিন একটা লাইন লিখেছিল। সে লাইন আজ বিশ্বমঞ্চে। কারণ ছোট দেশের ছোট মানুষের কথাও একদিন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মঞ্চে পৌঁছায়। শুধু লক্ষ্য থাকতে হয় অটুট। আলহামদুলিল্লাহ।’
গতকাল রাত ৯টা পর্যন্ত ছবিটিতে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ রিঅ্যাক্ট করেছেন। মন্তব্য-শেয়ার হয়েছে হাজারো। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নেই, কিন্তু বিশ্বকাপের গল্পে আছে বাংলা ভাষা। আছে চট্টগ্রামের এক ছেলের লেখা। এই অর্জনও কম কি বা?
পূর্বকোণ/রাকিব
















