চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬

সর্বশেষ:

টাইব্রেকারে জার্মানিকে বিদায় করে শেষ ষোলোয় প্যারাগুয়ে

টাইব্রেকারে জার্মানিকে বিদায় করে শেষ ষোলোয় প্যারাগুয়ে

ক্রীড়া ডেস্ক

৩০ জুন, ২০২৬ | ১১:২১ পূর্বাহ্ণ

কাতার, রাশিয়ার পর এবার আমেরিকার বিশ্বকাপও জার্মানির জন্য হয়ে রইল হতাশার গল্প। শেষ ষোলো পেরোনোর সুযোগ থাকলেও সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি ইউলিয়ান নাগেলসম্যানের দল। টাইব্রেকারে প্যারাগুয়ের কাছে হেরে টানা তিন বিশ্বকাপেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলো চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে এই প্রথম বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে টাইব্রেকারে হারল জার্মানি।

 

পেনাল্টি মিস করা জার্মান ফরোয়ার্ড কাই হাভার্টস ম্যাচের পর দেশটির গণমাধ্যম জেডডিএফ-কে বলেন, ‘আমি শুধু দুঃখ প্রকাশ করতে পারি। আবারও এভাবে সবাইকে হতাশ করা মোটেও ভালো অনুভূতি নয়।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা উইং দিয়ে আক্রমণ করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তা কাজে লাগেনি। আমার মনে হয় না এবার আমরা জয়ের যোগ্য ছিলাম।’

দলের এই বিদায়ের পরও জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘যদিও এই বিদায় আমাদের কষ্ট দিচ্ছে, কিন্তু কী চমৎকার একটি ম্যাচই না ছিল। এই বিশ্বকাপে তোমাদের নিষ্ঠা ও দলগত চেতনা আমাদের দেশকে অনুপ্রাণিত করেছে। আমরা তোমাদের জন্য গর্বিত।’

এই জার্মান দলে প্রতিভার অভাব ছিল না। বৈচিত্র্য, অভিজ্ঞতা ও দলগত সংহতিরও ঘাটতি ছিল না। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে প্রয়োজনীয় দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস দেখাতে পারেনি ইউলিয়ান নাগেলসম্যানের দল।

ম্যাচের আগে নাগেলসম্যান বলেছিলেন, বিশ্বকাপে টিকে থাকতে হলে তার দলকে আরও লড়াকু ও আগ্রাসী হতে হবে। কিন্তু মাঠের চিত্র ছিল উল্টো। জার্মান ফুটবলারদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ছিল স্পষ্ট। পুরো দলকে দেখা গেছে দ্বিধাগ্রস্ত ও মন্থর। নির্ধারিত সময়ে এক গোল পিছিয়ে থেকেও সমতায় ফেরা এবং টাইব্রেকারে প্যারাগুয়ের দুটি শট ঠেকিয়েও শেষ পর্যন্ত পরাজয় এড়াতে পারেনি তারা।

আসলে জার্মানির ছন্দপতনের শুরু হয়েছিল ইকুয়েডরের বিপক্ষে হারের পর থেকেই। সেই ম্যাচের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেনি তারা। চার দিন পর বস্টনে শেষ ষোলোর ম্যাচেও একই চিত্র দেখা যায়।

নাগেলসম্যান শুরু থেকেই দেনিজ উন্দাভকে একাদশে রাখলেও আক্রমণে গতি আনতে পারেনি দল। ম্যাচের প্রথম ৩০ মিনিটে প্যারাগুয়ের তুলনায় প্রায় সাত গুণ বেশি পাস খেলেও প্রতিপক্ষের রক্ষণে ফাটল ধরাতে ব্যর্থ হয় জার্মানি।

বরং প্রথম উল্লেখযোগ্য আক্রমণ থেকেই এগিয়ে যায় প্যারাগুয়ে। কর্নার থেকে ভেসে আসা বলে মাত্র ১৬৮ সেন্টিমিটার উচ্চতার হুলিও এনসিসো পেনাল্টি স্পটের কাছ থেকে হেডে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। গোলটি যেমন জার্মান রক্ষণভাগের দুর্বলতা প্রকাশ করে, তেমনি তাদের নিষ্প্রভ আক্রমণভাগের চিত্রও স্পষ্ট করে।

গোল শোধে মরিয়া হয়ে ওঠে জার্মানি। একের পর এক আক্রমণ করলেও কাঙ্ক্ষিত গোল মিলছিল না। শেষ পর্যন্ত কৌশল বদলে উইং থেকে ক্রসের ওপর ভরসা করে সমতায় ফেরে তারা। কাই হাভার্টসের দুর্দান্ত এক হেডে ম্যাচে ফিরে আসে জার্মানি। তখন মনে হচ্ছিল, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হয়তো জয়ও তুলে নেবে তারা।

কিন্তু সেই আশা শেষ পর্যন্ত আর বাস্তবে রূপ নেয়নি। অতিরিক্ত সময়ে জোনাথান তাহের হেড থেকে করা গোল ফাউলের অভিযোগে বাতিল করে দেন রেফারি। সিদ্ধান্তটিকে পরে ‘কেলেঙ্কারি’ বলে মন্তব্য করেন নাগেলসম্যান। তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ানোর আগেই শেষ করে দেওয়া উচিত ছিল জার্মানির।

শেষ পর্যন্ত ভাগ্য নির্ধারণ হয় টাইব্রেকারে। সেখানে কাই হাভার্টস ও নিক ভলতেমাদে গোল করতে ব্যর্থ হলে বিদায়ের শঙ্কা ঘনীভূত হয়। এরপরও নাটকীয়তা বাকি ছিল। প্যারাগুয়ের আন্তোনিও সানাব্রিয়া শট মিস করেন, আর ফাবিয়ান বালবুয়েনার পেনাল্টি দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন ম্যানুয়েল নয়্যার। তাতে আবারও আশার আলো দেখে জার্মানি।

কিন্তু সাডেন ডেথে সেই আশাও নিভে যায়। নিজের প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে নামা জোনাথান তাহ ক্রসবারের ওপর দিয়ে শট উড়িয়ে দিলে সুযোগ পেয়ে যান হোসে ক্যানালে। তাঁর সফল শটেই টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে প্যারাগুয়ে।

অতিরিক্ত সময় শেষে ১-১ গোলে সমতার পর টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হার—জার্মানি কীভাবে ম্যাচটি এভাবে হাতছাড়া করল? এই বিদায়ের পর এখন অনেক প্রশ্ন উঠবে। নয়্যারের জন্য এই ফেরাটা কেবল কয়েকটি রেকর্ড ভাঙা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেনি। জার্মানির অধিনায়ক জশুয়া কিমিখের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার এখন কেবলই হতাশায় ভরা। ৩১ বছর বয়সী এই ফুটবলার ২০২৮ সালের ইউরোতে থাকবেন কি না, তা নিয়ে এখনই প্রশ্ন উঠছে। এছাড়া আন্তোনিও রুডিগার (৩৩), ও লিওন গোরেটজকা (৩১) ও লেরয় সানে (৩০) হয়তো আর কখনোই জাতীয় দলে ফিরবেন না। জার্মানির ফুটবলে এখন বড় পরিবর্তনের সময়।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে প্রধান কোচ ইউলিয়ান নাগেলসম্যানকে নিয়ে। ২০২৫ সালের শুরুতে বাড়ানো চুক্তি অনুযায়ী ২০২৮ সাল পর্যন্ত তাঁ চুক্তি রয়েছে।

নাগেলসম্যান ম্যাচের পর বলেন, ‘আমি এখানে কাজ করতে এসেছি। ডিএফবি (জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন) যদি অন্য কিছু সিদ্ধান্ত নেয় তবে তারা আমাকে জানাবে। আমি এমন মানুষ নই যে পালিয়ে যাব।’

পূর্বকোণ/এএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট