বসনিয়া যুদ্ধের সময় গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বসনিয়ান সার্ব জেনারেল রাটকো ম্লাদিচ মারা গেছেন। প্রায় ৮ হাজার মুসলমান হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও নেতৃত্ব দেওয়ায় তিনি ‘বসনিয়ার কসাই’ নামেও পরিচিত ছিলেন।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরের একটি বন্দিশিবিরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী দ্রাগান ইভেতিচ। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৮৪ বছর।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ নৃশংসতা হিসেবে পরিচিত ১৯৯৫ সালের স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার জন্য তাকে দায়ী করা হয়। ওই ঘটনায় অন্তত ৮ হাজার বসনিয়ান মুসলিমকে হত্যা করে গণকবরে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল এবং প্রমাণ নষ্ট করতে অনেক লাশ দুর্গম পাহাড়ে সরিয়ে ফেলা হয়।
এর আগে তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধে স্লাদিচের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী সার্ব বাহিনী রাজধানী সারায়েভো অবরুদ্ধ করে রাখে। সেখানে তাদের নির্বিচার আর্টিলারি ও ট্যাংক হামলায় অন্তত ১০ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটিওয়াই) মতে, একটি ‘বৃহত্তর সার্বিয়া’ গড়তে বসনিয়ান মুসলিম ও ক্রোয়াটদের জাতিগতভাবে নির্মূল করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।
এই ঘৃণ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্লাদিচের অন্যতম সহযোগী ছিলেন সার্বিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোসেভিচ এবং বসনিয়ান সার্ব রাজনৈতিক নেতা রাদোভান কারাদজিচ। যুদ্ধ শেষে দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকার পর ২০১১ সালে ম্লাদিচকে কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে মিলোসেভিচ ২০০৬ সালে বন্দিদশায় মারা যান এবং কারাদজিচ ২০১৬ সালে গণহত্যার দায়ে দণ্ডিত হন।
২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল ম্লাদিচকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। বিচার চলাকালে তিনি আদালতকে অস্বীকৃতি জানান এবং রায় ঘোষণার সময় বিচারকদের ‘মিথ্যাবাদী’ বলে চিৎকার করেন। স্রেব্রেনিৎসায় স্বামী ও সন্তান হারানো মুনিরা সুবাসিচ ম্লাদিচকে যুদ্ধের সব বীভৎস অপরাধের প্রতীক আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘জার্মানদের যেমন হিটলার ছিল, সার্বদের তেমন ম্লাদিচ। এই দুজনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।’
গ্রেপ্তারের সময় থেকেই ম্লাদিচ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। স্ট্রোক ও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তাকে আদালতে বেশ ভগ্ন ও অসুস্থ অবস্থায় দেখা যেত। স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে একাধিকবার মুক্তির আবেদন করলেও ন্যায়বিচারের স্বার্থে ২০২১ সালে তার আপিল খারিজ করে দেয় আদালত। চলতি বছরের আগস্ট মাসে জাতিসংঘের চিকিৎসকরা তার মৃত্যুর আশঙ্কার কথা জানালেও মুক্তির আবেদন পুনরায় নাকচ করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত বন্দিদশাতেই তার জীবনের অবসান ঘটে।
সূত্র: রয়টার্স
পূর্বকোণ/ইবনুর

















