চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬

সর্বশেষ:

ভারতে পেঁয়াজের দামে আগুন, অক্টোবরেই দেখা দিতে পারে বড় সংকট

২৭ আগস্ট, ২০২৬ | ৯:৫৯ অপরাহ্ণ

ভারতের বাজারে পেঁয়াজের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন শহরে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম উঠেছে ৫০ থেকে ৬৫ রুপিতে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় সরকার এবার রেলপথে পেঁয়াজ পরিবহনের উদ্যোগ নিয়েছে।

বুধবার (২৬ আগস্ট) মহারাষ্ট্রের লাসালগাঁও থেকে দিল্লির উদ্দেশে ছেড়ে গেছে ‘কান্দা এক্সপ্রেস’। ট্রেনটিতে প্রায় ৫০০ টন পেঁয়াজ ছিল। কিন্তু সরকারের এই তৎপরতার মধ্যেই সামনে এসেছে আরও বড় উদ্বেগ।

২০২৬ সালের গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে ভারত সরকার যে ১ লাখ ২০ হাজার টন পেঁয়াজ সংগ্রহ করেছিল, তার প্রায় ৩০ শতাংশ এরই মধ্যে পচে বা অঙ্কুর গজিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে বাজারে সরবরাহ ধরে রাখা নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা।

কেন হঠাৎ পেঁয়াজের দাম বাড়ছে

ভারতের পেঁয়াজের বাজারে বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে অমৌসুমি বৃষ্টিকে।পেঁয়াজ কাটার মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে অনেক পেঁয়াজের মান নষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে কমেছে সংরক্ষণক্ষমতা।

ভারতের কৃষি ও বাজারসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সাধারণত প্রতিবছর সংরক্ষণ করা পেঁয়াজের প্রায় ২০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। এ বছর সেই হার ৪০ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল কো-অপারেটিভ মার্কেটিং ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া বা নাফেডের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, অমৌসুমি বৃষ্টির কারণে পেঁয়াজের মান খারাপ হয়েছে। ফলে পেঁয়াজ দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

দিল্লিতে যাচ্ছে ‘কান্দা এক্সপ্রেস’

বাজারে সরবরাহ বাড়াতে বুধবার বিকেলে লাসালগাঁও থেকে দিল্লির উদ্দেশে ছেড়ে যায় বিশেষ পেঁয়াজবাহী ট্রেন ‘কান্দা এক্সপ্রেস’।

রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রেনটি মঙ্গলবারই ছাড়ার কথা ছিল। তবে পেঁয়াজের মান যাচাই, বাছাই ও শ্রেণিবিন্যাসের কাজ শেষ করতে দেরি হওয়ায় প্রায় ২৪ ঘণ্টা পিছিয়ে যায় যাত্রা।লাসালগাঁও রেলস্টেশনের স্টেশন ব্যবস্থাপক প্রীতিশ দুবে বলেন, প্রায় ৫০০ টন পেঁয়াজ নিয়ে কান্দা এক্সপ্রেস দিল্লির উদ্দেশে ছেড়ে গেছে। ট্রেনটি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দিল্লিতে পৌঁছানোর কথা।

কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, দিল্লিতে নাফেড, ন্যাশনাল কো-অপারেটিভ কনজিউমার্স ফেডারেশন বা NCCF এবং কেন্দ্রীয় ভান্ডারের মাধ্যমে ভর্তুকি দামে এসব পেঁয়াজ বিক্রি করা হবে। প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম রাখা হবে ৩৫ রুপি।

সড়কপথেও পেঁয়াজ পাঠানোর উদ্যোগ

পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় সরকার শুধু রেলপথের ওপর নির্ভর করছে না। সরকারি সংস্থা নাফেড ও এনসিসিএফ সড়ক পথেও বিভিন্ন বাজারে পেঁয়াজ পাঠাচ্ছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাতে নাফেড ট্রাকে করে ৩০ টন পেঁয়াজ দিল্লিতে পাঠিয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় আরও ৩০ টন পেঁয়াজ পাঠিয়েছে এনসিসিএফ।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রয়োজনে কলকাতা ও চেন্নাইয়ের মতো বড় শহরেও বিশেষ ট্রেনে পেঁয়াজ পাঠানো হবে। পরবর্তী সময়ে চেন্নাই, এরনাকুলাম, মাদুরাই ও গুয়াহাটিতেও রেলপথে পেঁয়াজ পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারি মজুতেও চাপ

পেঁয়াজের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো সরকারি মজুত। এই গ্রীষ্মে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার দুই লাখ টন পেঁয়াজ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল।

কিন্তু নাফেড ও এনসিসিএফ মিলিয়ে সংগ্রহ করতে পেরেছে মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার টন। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮০ হাজার টন কম পেঁয়াজ সংগ্রহ হয়েছে।

এবার সরকারের মজুতের ৯০ শতাংশের বেশি পেঁয়াজ আসার কথা নাশিক অঞ্চল থেকে। দেশটির মোট পেঁয়াজ সংগ্রহেরও ৮০ শতাংশের বেশি সাধারণত এই অঞ্চল থেকেই আসে।

কিন্তু এবার সংরক্ষিত পেঁয়াজ দ্রুত কমে যাচ্ছে। তার ওপর সংগৃহীত পেঁয়াজের প্রায় ৩০ শতাংশ পচে বা অঙ্কুর গজিয়ে নষ্ট হয়েছে। ফলে সরকারি মজুতের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

কৃষকের গুদামেও কমে গেছে পেঁয়াজ

সাধারণত কৃষকেরা সেপ্টেম্বর থেকে গুদামে সংরক্ষণ করা পেঁয়াজ বাজারে আনতে শুরু করেন। কিন্তু এ বছর পরিস্থিতি ভিন্ন। পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেক কৃষক জুন ও জুলাই থেকেই তাঁদের মজুত বিক্রি শুরু করেছেন।

কৃষি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, পাইকারি বাজারে ভালো দাম পাওয়াও কৃষকদের দ্রুত বাজারে পেঁয়াজ নিয়ে আসার অন্যতম কারণ। ফলে এখন কৃষকদের নিজস্ব গুদামে থাকা মজুতও দ্রুত কমে যাচ্ছে।

ভারতের সবচেয়ে বড় পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চল নাশিকে কৃষকদের গুদামে প্রায় ২৪ লাখ টন পেঁয়াজ সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে তাদের হাতে সেই মজুতের মাত্র ২৫ শতাংশ রয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

অর্থাৎ নতুন ফসল বাজারে আসার আগেই বর্তমান মজুত শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সামনে আরও বড় সমস্যা খরিফ পেঁয়াজ

পেঁয়াজের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো খরিফ মৌসুমের পেঁয়াজ। কম বৃষ্টির কারণে এ বছর খরিফ পেঁয়াজের চাষই পিছিয়ে গেছে।

নাশিক জেলায় সাধারণত খরিফ পেঁয়াজের আওতায় প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর জমি থাকে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেখানে মাত্র ৩৭০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে।

অর্থাৎ মোট লক্ষ্যমাত্রার মাত্র প্রায় এক শতাংশ জমিতে চাষ হয়েছে। সাধারণ সময়ে এই সময়ের মধ্যে খরিফ পেঁয়াজের প্রায় অর্ধেক জমিতে চাষ হয়ে যায়।

এবার সেই তুলনায় চাষের অগ্রগতি অত্যন্ত কম। ফলে নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসতেও দেরি হবে।

অক্টোবরে সংকটের আশঙ্কা

নতুন খরিফ পেঁয়াজ বাজারে আসতে পারে নভেম্বরের মাঝামাঝি। নিয়মিত সরবরাহ শুরু হতে পারে ডিসেম্বরের শুরু থেকে। এ কারণে অক্টোবর মাসে বাজারে সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারাও সতর্ক করেন, বর্তমান মজুত যেভাবে কমছে, তা অব্যাহত থাকলে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরেই নাশিকসহ বিভিন্ন এলাকায় পেঁয়াজের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

সূত্র: ইন্ডিয়া ডটকম

পূর্বকোণ/আরআর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট