মধ্যপ্রাচ্য আবারও বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত কেবল একটি সামরিক মুখোমুখি অবস্থান নয়; এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতি, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর রাজনৈতিক লড়াই। যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দের আড়ালে যে বাস্তবতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে সেটি হলো-আধুনিক বিশ্বে সামরিক বিজয় রাজনৈতিক সমাধানের নিশ্চয়তা দেয় না।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক ত্রিতা পার্সি সাম্প্রতিক আলোচনায় বারবার একটি বিষয় তুলে ধরেছেন। তা হলো, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কেন্দ্রে পারমাণবিক কর্মসূচি যতটা না রয়েছে, তার চেয়েও বেশি রয়েছে অবিশ্বাসের সংকট। তাঁর মতে, আজকের উত্তেজনা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং বহু বছর ধরে জমে ওঠা কূটনৈতিক ব্যর্থতা, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পারস্পরিক অনাস্থার ফল।
পশ্চিমা বিশ্বের আলোচনায় প্রায়ই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। নিঃসন্দেহে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু পারমাণবিক প্রশ্নকে কেন্দ্র করে যে বিরোধ দেখা দিয়েছে, তার শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত। এটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যে কার প্রভাব থাকবে, কে আঞ্চলিক নিরাপত্তার কাঠামো নির্ধারণ করবে এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ভারসাম্য কোন দিকে যাবে, সেই প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই সংকট বোঝার জন্য একটি মৌলিক বাস্তবতা অনুধাবন করা জরুরি। ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে না। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) ছিল কয়েক দশকের বৈরিতার মধ্যে একটি বিরল কূটনৈতিক সাফল্য। ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর নজরদারি ও সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েছিল, আর বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে সেই চুক্তি থেকে সরে আসে। তেহরানের দৃষ্টিতে এটি শুধু একটি নীতিগত পরিবর্তন নয়; বরং একটি গভীর বিশ্বাসঘাতকতা।
ফলে আজ যখন ওয়াশিংটন নতুন কোনো সমঝোতার প্রস্তাব দেয়, তখন ইরানের নীতিনির্ধারকদের মনে একটি প্রশ্ন জাগে- যে চুক্তি একবার বাতিল করা হয়েছে, তার ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তা কোথায়? ত্রিতা পার্সির মতে, বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দু এখানেই। সমস্যাটি শুধু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা নিষেধাজ্ঞা নয় বরং বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট। ইরান মনে করে, মার্কিন প্রশাসন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নীতিও বদলে যেতে পারে। ফলে নতুন কোনো সমঝোতা তাদের কাছে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ বলে মনে হয় না।
এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের ভূমিকাও গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে তার সবচেয়ে বড় কৌশলগত হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছে। ইসরায়েলের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশ বিশ্বাস করে যে, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়া তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যেকোনো উদ্যোগ নিয়ে তারা সতর্ক থেকেছে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, যখনই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তখনই আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্ন সামনে এসেছে। ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ছিল নিরাপত্তার বিষয়। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এর ফলে সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমাধানের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। শান্তি আলোচনার পাশাপাশি সামরিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রাখার নীতি শেষ পর্যন্ত আস্থার পরিবেশকে আরও দুর্বল করেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকাও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। তিনি একদিকে নিজেকে একজন চুক্তিনির্মাতা ও শান্তির প্রবক্তা হিসেবে তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে তাঁর প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি এবং পারমাণবিক চুক্তি থেকে প্রত্যাহার ইরানের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন করে সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। সমালোচকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির মধ্যেই একটি মৌলিক বৈপরীত্য ছিলÑএকদিকে আলোচনা, অন্যদিকে এমন চাপ যা আলোচনার ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।
সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, সামরিক শক্তি দিয়ে রাজনৈতিক বাস্তবতা মুছে ফেলা যায় না। ব্যাপক সামরিক চাপ সত্ত্বেও ইরান রাষ্ট্র হিসেবে টিকে আছে। তার রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়েনি বরং আঞ্চলিক বাস্তবতায় তার উপস্থিতি এখনও গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালির মতো কৌশলগত স্থানের ওপর তার প্রভাব আবারও প্রমাণ করেছে যে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোতে ইরানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
একই সঙ্গে এই সংঘাত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর নীতিতেও পরিবর্তন এনেছে। তারা উপলব্ধি করছে যে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ তাদের অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর। তাই আজ মধ্যপ্রাচ্যে কেবল সামরিক প্রতিযোগিতা নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতাও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। ইরাক ও আফগানিস্তানের দীর্ঘ যুদ্ধ আমেরিকান জনগণকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে প্রশ্ন উঠছেÑঅবিরাম সামরিক হস্তক্ষেপ কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করছে? একইভাবে গাজা যুদ্ধের পর ইসরায়েল সম্পর্কেও পশ্চিমা সমাজে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে ওয়াশিংটনের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তগুলো আগের তুলনায় আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এই সংকট কোনো দূরবর্তী ঘটনা নয়। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লক্ষাধিক বাংলাদেশি শ্রমিক, রেমিট্যান্স প্রবাহ, জ্বালানি আমদানি এবং বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা সরাসরি এ অঞ্চলের পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তেলের মূল্যবৃদ্ধি আমাদের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, আবার আঞ্চলিক অস্থিরতা শ্রমবাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বাংলাদেশের স্বার্থ যুদ্ধের বিস্তারে নয়, বরং শান্তি ও স্থিতিশীলতায়।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সাম্প্রতিক অধ্যায় আমাদের একটি গভীর সত্য স্মরণ করিয়ে দেয়। যুদ্ধের মাধ্যমে অবকাঠামো ধ্বংস করা যায়, শত্রুকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যায়, কিন্তু বিশ্বাস তৈরি করা যায় না। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার ইরানের মনে যে আস্থাহীনতার জন্ম দিয়েছে তা আজও দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তির রাজনীতি, ইসরায়েলের নিরাপত্তা-উদ্বেগ এবং মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ শান্তির পথকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইতিহাসের শিক্ষা হলো, যুদ্ধের মাধ্যমে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটও সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে। শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও তেহরানÑউভয় পক্ষকেই বুঝতে হবে যে সামরিক শক্তির সীমা রয়েছে, কিন্তু কূটনীতির সম্ভাবনা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। স্থায়ী শান্তির পথ যুদ্ধক্ষেত্রে নয়; তা খুঁজে নিতে হবে আলোচনার টেবিলেই।
















