ইউক্রেন-রাশিয়া মধ্যে গত চার বছর ধরে চলা যুদ্ধ ক্রমেই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। জনবল সংকট ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের চাপে ইউক্রেন এখন ব্যাপকভাবে রোবট, ড্রোন এবং দূরনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধযানের ওপর নির্ভর করছে। সামনের সারিতে সেনা পাঠানোর পরিবর্তে দেশটি এখন ভূগর্ভস্থ নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে হামলা পরিচালনা করছে, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে ড্রোনের লাইভ ভিডিওর মাধ্যমে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির সম্প্রতি দাবি করেন, এপ্রিল মাসে প্রথমবারের মতো শুধুমাত্র রোবট ও ড্রোন ব্যবহার করে একটি রুশ ঘাঁটি দখল করা হয়েছে। তিনি জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ২২ হাজারেরও বেশি মিশন পরিচালনা করেছে ইউক্রেনের মানববিহীন যুদ্ধযান।
পূর্ব ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত বিস্ফোরকবাহী চার চাকার রোবটগুলোকে রুশ সেনারা ‘নীরব মৃত্যু’ নামে ডাকছে বলে জানিয়েছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। এসব রোবট এতটাই নীরবে এগিয়ে আসে যে শত্রুপক্ষ মাত্র ১০ মিটার দূরে এলে তাদের উপস্থিতি টের পায়- যা বিস্ফোরণের জন্য যথেষ্ট কাছাকাছি দূরত্ব।
ইউক্রেনের তৃতীয় অ্যাসল্ট ব্রিগেডের ‘এনসি-১৩’ ইউনিটের হিসাব অনুযায়ী, তারা ১৬৪টি অভিযানে রোবট ব্যবহার করে যে ফলাফল পেয়েছে, একই ফল পেতে প্রায় ২ হাজার ৩০০ সেনা প্রয়োজন হতো। এসব অভিযানে অন্তত অর্ধেক সেনা নিহত বা আহত হওয়ার ঝুঁকি ছিল। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর এই যুদ্ধপদ্ধতি হাজারেরও বেশি ইউক্রেনীয় সেনার জীবন রক্ষা করেছে বলে দাবি তাদের।
ইউনিটের উপ-কমান্ডার ‘বার’ বলেন, ডনবাসের তীব্র যুদ্ধের সময় এমন প্রযুক্তি থাকলে আমার আরও অনেক সহযোদ্ধা বেঁচে থাকতেন।
ইউনিটের কমান্ডার মাইকোলা ‘মাকার’ জিনকেভিচের মতে, যুদ্ধের চরিত্র বদলে গেছে। তিনি বলেন, আগে যুদ্ধ ছিল সৈনিকের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের পরীক্ষা। এখন প্রযুক্তিই সবকিছু নির্ধারণ করছে। আর পেছনে ফেরার কোনো সুযোগ নেই।
এই প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধে নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তিবিদরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ২২ বছর বয়সী প্রকৌশলী ‘গোরা’ যুদ্ধ শুরুর সময় ছিলেন মাত্র ১৮ বছরের তরুণী। রুশ ড্রোন হামলার আতঙ্কে ঘুমহীন রাত কাটানোর পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন যুদ্ধ প্রচেষ্টায় প্রযুক্তিগত অবদান রাখবেন।
গোরা বলেন, মূল বিষয় শুধু যানবাহন নয়; আসল বিষয় হলো মানুষের চিন্তাশক্তি এবং পরিকল্পনা। কীভাবে অপারেটর, যানবাহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে একত্রে কাজ করানো যায়, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রুশ বাহিনীর ইলেকট্রনিক যুদ্ধকৌশলের কারণে অনেক সময় জিপিএস সিগন্যাল বিভ্রান্ত করা হয়। তখন অপারেটরদের আগের ড্রোন ফুটেজ ও বিস্তারিত মানচিত্র বিশ্লেষণ করে রোবট পরিচালনা করতে হয়।
সাম্প্রতিক এক অভিযানে ছয়টি বিস্ফোরকবাহী রোবট ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি সফলভাবে রুশ অবস্থানে আঘাত হানে, তবে একটি ট্রেঞ্চে উল্টে যায় এবং আরেকটি রুশ বাহিনীর হাতে ধ্বংস হয়।
শুধু হামলাই নয়, ইউক্রেন এখন রোবট ব্যবহার করছে গোলাবারুদ সরবরাহ, আহত সেনা উদ্ধার এবং মেশিনগান পরিচালনার মতো কাজেও। একটি ইউনিট এমনকি ট্যাংকের ট্র্যাকের ওপর ভারী ব্রাউনিং মেশিনগান স্থাপন করে দূরনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধযান তৈরি করেছে, যা দিনের পর দিন গাছপালার আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে।
ইউনিটের সদস্য ‘সাইবার’ জানান, রোবট মোতায়েন করার পর শত্রুরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তারা বুঝতে পারে না কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে।
চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ ইউক্রেনের জনশক্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে ড্রোন ও রোবটনির্ভর যুদ্ধ কৌশল ইউক্রেনকে নতুন সম্ভাবনা এনে দিয়েছে। তবে প্রযুক্তিগত এই অগ্রগতি এখনো নাজুক, কারণ রাশিয়াও সমানতালে নিজেদের মানববিহীন যুদ্ধক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে যে দ্রুততর প্রযুক্তিগত অভিযোজন ঘটাতে পারে তার ওপর।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ সেই ভবিষ্যতের এক বাস্তব পরীক্ষাগার হয়ে উঠেছে।
পূর্বকোণ/আদর
















