মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এখন আর কেবল ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আরব বিশ্বের কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে। বিশেষত ডোনাল্ড ট্রাম্প, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, এই চারটি শক্তির পারস্পরিক অবস্থান আজকের সংকটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে।
বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো- ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্ক আগের মতো একমুখী নয়। যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক অবস্থান নিলেও ট্রাম্প প্রশাসন এখন দ্রুত যুদ্ধবিরতি ও একটি ‘ব্যবস্থাপত্রভিত্তিক সমঝোতা’র দিকে এগোতে চাইছে। কিন্তু নেতানিয়াহু এখনো ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস না করা পর্যন্ত চাপ অব্যাহত রাখতে আগ্রহী।
এখানেই ওয়াশিংটন ও তেলআবিবের মধ্যে সূক্ষ্ম দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প উপলব্ধি করছেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ মার্কিন অর্থনীতিকে নতুন জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অপরদিকে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে ‘ইরানকে দমনকারী নেতা’ হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি ধরে রাখার ওপর। ফলে উভয়ের লক্ষ্য এক হলেও কৌশলগত অগ্রাধিকার এখন আর পুরোপুরি অভিন্ন নয়।
এই যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো তেলের বাজার। ইরান হরমুজ প্রণালী আংশিকভাবে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। ব্রেন্ট ক্রুড ১০০ ডলার অতিক্রম করে এবং এক পর্যায়ে ১২০ ডলারের আশঙ্কাও তৈরি হয়। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, যদি সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে তেলের দাম ১৩০-১৮০ ডলার পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উভয় দেশ একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র, অন্যদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখার প্রধান শক্তি। যুদ্ধের ফলে সরবরাহ সংকট দেখা দিলে সৌদি আরব ও ইউএই উৎপাদন বাড়িয়ে বাজারে আস্থা ফেরানোর চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে তারা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপরও চাপ দিচ্ছে যাতে দ্রুত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
কিন্তু এখানে আরেকটি গভীর রাজনৈতিক হিসাব রয়েছে। সৌদি আরব ও ইউএই চায় না ইরান পুরোপুরি ধ্বংস হোক; বরং তারা চায় একটি ‘নিয়ন্ত্রিত দুর্বল ইরান’। কারণ সম্পূর্ণ অস্থিতিশীল ইরান গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলকে নিরাপত্তাহীন করে তুলবে, যা তাদের অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য হুমকি। তাই প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নিলেও আড়ালে এই আরব রাষ্ট্রগুলো মধ্যস্থতা ও সমঝোতার পথ খুঁজছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে তেলের মূল্যবৃদ্ধি এখন বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। গ্যাসোলিনের দাম বাড়লে মার্কিন ভোক্তাদের অসন্তোষ সরাসরি হোয়াইট হাউসে চাপ সৃষ্টি করে। যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং আমেরিকানদের জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে। ট্রাম্প তাই একদিকে শক্ত অবস্থান প্রদর্শন করছেন, অন্যদিকে দ্রুত একটি ‘ডিল’ করে বাজার শান্ত করার চেষ্টা করছেন। এ কারণেই তিনি সম্প্রতি দাবি করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা ‘প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে’।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছেÑ এই সমঝোতা আদৌ কি টেকসই হবে? কারণ মূল সমস্যাগুলো এখনো অমীমাংসিত। ইরান এখনো উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধে সম্মত হয়নি। ইসরায়েল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আপসহীন। আবার যুক্তরাষ্ট্রও চায় হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে থাকুক। ফলে যুদ্ধবিরতি হলেও প্রকৃত শান্তি এখনো অনেক দূরের বাস্তবতা।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘ হলে তেলের দাম বৃদ্ধি, ডলারের ওপর চাপ, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হতে পারে। হরমুজ প্রণালীতে অস্থিতিশীলতা মানে কেবল যুদ্ধ নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থায় আঘাত।
সবশেষে বলা যায়, সংঘর্ষÑনিরাপত্তা, জ্বালানি এবং আধিপত্য- এই তিনটি বিষয়ের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট। ট্রাম্প যুদ্ধ থামিয়ে অর্থনীতি বাঁচাতে চান; নেতানিয়াহু ইরানকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করতে চান; সৌদি আরব ও ইউএই বাজার স্থিতিশীল রাখতে চায়; আর ইরান নিজের কৌশলগত অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এই জটিল সমীকরণে যুদ্ধ হয়তো সাময়িকভাবে থামতে পারে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অগ্নিগর্ভ বাস্তবতা এখনো শেষ হয়নি।
















