পশ্চিমে দিগন্তবিস্তৃত বঙ্গোপসাগর। তার শিয়র ঘেঁষে এগিয়ে গেছে চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড। সড়কের পূর্ব পাশে কোথাও ধূ ধূ ফাঁকা জমি, কোথাও সবজির বাগান, আবার কোথাও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ভবন। প্রকৃতির এমন স্নিগ্ধ পরশেও স্বস্তি নেই এই জনপদের ভূমি মালিকদের মনে। সমুদ্রের কোমল হাওয়ায় যেন মিশে আছে তাঁদের দীর্ঘদিনের হতাশা। চড়া দামে জমি কিনেও ভবন নির্মাণ করতে পারছেন না তাঁরা। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নকশা অনুমোদন না পাওয়ায় প্রায় দেড় যুগ ধরে আটকে আছে তাঁদের স্বপ্নের আবাসন।
উত্তরে আনন্দবাজার থেকে দক্ষিণে আকমল আলী রোড, পশ্চিমে আউটার রিং রোড থেকে পূর্বে চান্দের পাড়া পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মধ্যম হালিশহরের ধুমপাড়া। স্থানীয় ভূমি মালিকদের দাবি, গত ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে এ এলাকায় ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন কার্যত বন্ধ। এর পেছনে রয়েছে প্রস্তাবিত উর্মিমালা আবাসন প্রকল্প। প্রকল্পের নামে ভ‚মি অধিগ্রহণের অনিশ্চয়তা তৈরি করে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে নির্মাণ অনুমোদন আটকে রাখা হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। অথচ এত বছরেও অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়নি, দেওয়া হয়নি ক্ষতিপূরণও।
ভূমি মালিকদের ভাষ্য, কোন জমি অধিগ্রহণ করা হবে, সেই সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত নয়। অথচ সম্ভাব্য অধিগ্রহণের বিষয়টি সামনে রেখে নকশা অনুমোদন বন্ধ থাকায় তাঁরা নিজেদের সম্পত্তি ব্যবহার করতে পারছেন না। নিয়মিত পরিশোধ করতে হচ্ছে জমির উন্নয়ন করও।
ইপিজেড ঘিরে আবাসনের চাহিদা : চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (সিইপিজেড) ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে কাজ করেন বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক। তাঁদের আবাসনের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ধুমপাড়া। আউটার রিং রোড নির্মাণের পর এলাকাটির যোগাযোগব্যবস্থা ও জমির মূল্য-দুটিই বেড়েছে। ফলে আবাসিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্বও বাড়ছে।
ভূমি মালিকদের মতে, পরিকল্পিত আবাসন গড়ে উঠলে শিল্পাঞ্চলে কর্মরত মানুষের আবাসন সংকট কমার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও গতি আসবে। কিন্তু নকশা অনুমোদন না থাকায় জমি থাকা সত্ত্বেও অনেকে ব্যাংকঋণ নিতে, ভবন নির্মাণ করতে কিংবা ভাড়া থেকে আয় করতে পারছেন না।
নিয়ম মানলে আটকে, নিয়ম ভাঙলে বহুতল : নকশা অনুমোদন বন্ধ থাকায় এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে অদ্ভুত এক পরিস্থিতি। নিয়ম মেনে ভবন নির্মাণ করতে চাওয়া মালিকেরা বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকলেও কেউ কেউ অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণ করছেন বহুতল ভবন। ইতোমধ্যে ছয়-সাততলা ভবনও উঠেছে।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিনে ধুমপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, শত শত ভবন নির্মিত হয়েছে। কিছু ভবনে চলছে নির্মাণকাজ। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এসব ভবনের বেশিরভাগই নির্মিত হয়েছে অনুমোদন ছাড়াই।
এতে ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা, রাস্তা ছাড়ার বিধান ও ভূমিকম্প সহনশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিকল্পিত নগরায়ণের স্বার্থে সিডিএ’র অনুমোদন ও তদারকি জরুরি হলেও দীর্ঘদিনের স্থবিরতায় অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের আক্ষেপ, নিয়ম মানতে গিয়ে সৎ ভূমি মালিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, আর নিয়ম ভেঙে কেউ কেউ তুলে ফেলছেন বহুতল ভবন।
নির্মাণাধীন একটি ভবনের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে পূর্বকোণকে বলেন, ‘ক্ষুধা যখন চরম আকারে চলে যায়, তখন বৈধ-অবৈধ মানা যায় না। আমরা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করেছি। কিন্তু সিডিএ আমাদের কোনো নকশা দিচ্ছে না। এত টাকা দিয়ে জমি কিনে দিনের পর দিন ফেলে রাখা যায়?’
রাজস্ব হারাচ্ছে সরকারও : নকশা অনুমোদন বন্ধ থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ভূমি মালিকেরা, ব্যাহত হচ্ছে সরকারি রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনাও। ভবনের নকশা অনুমোদন ও উন্নয়ন চার্জ থেকে সিডিএর আয় হতে পারত। পরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মিত হলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ও বাড়ত। পাশাপাশি জমি ও ভবন নিবন্ধন, ফ্ল্যাট কেনাবেচা এবং নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসার মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সম্প্রসারণের সুযোগ ছিল।
বেশ কয়েক বছর আগে আগ্রাবাদের কয়েকজন বাসিন্দা আত্মীয়স্বজন মিলে ধুমপাড়ায় ১৬ গন্ডা জমি কেনেন। কিন্তু দীর্ঘদিনেও সেখানে ভবন নির্মাণ করতে না পারায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তাঁরা। জমির কর ও ঋণের চাপ সামলানোর পাশাপাশি নিজেদের আবাসন কিংবা ভাড়া আয়ের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
তাঁদের দুজন শামসুল আলম ও শোয়েব বিজয় পূর্বকোণকে বলেন, ‘জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে জমিটা কিনেছিলাম। কিন্তু বহু বছর ধরে পড়ে আছে। অনেকে বলছেন, অন্যদের মতো ভবন তুলে ফেলতে। কিন্তু আমরা অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ করতে চাই না।’
সমাধান চান ভূমি মালিকেরা : ধুমপাড়ার ভূমি মালিকেরা দ্রুত নকশা অনুমোদন চালুর দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এলাকাটিকে পরিকল্পিত আবাসিক ও মিশ্র ব্যবহারের অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে মাস্টারপ্ল্যান ও ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) পর্যালোচনা, সড়ক প্রশস্তকরণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। অনুমোদনহীন ভবনগুলোর কাঠামোগত ও অগ্নিনিরাপত্তা যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন।
সিডিএর উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ (ভারপ্রাপ্ত) মো. আবু ঈসা আনছারী পূর্বকোণকে বলেন, “ধুমপাড়া এলাকায় যে প্রকল্পটি হওয়ার কথা ছিল, সেটি বাস্তবায়ন না করার বিষয়ে সিডিএ মোটামুটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সেখানে ধাপে ধাপে জমির মালিকদের নকশা দেওয়া হবে। আর যারা নিজ উদ্যোগে ইতোমধ্যে ভবন তুলে ফেলেছেন, তাঁদের বিষয়টি আইনিভাবে মোকাবিলা করা হবে।”
পূর্বকোণ/মিফতা


















