চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০২ এপ্রিল, ২০২৬

ক্ষেতে সোনালি ধানের দোল

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

২৭ এপ্রিল, ২০২০ | ৮:১০ অপরাহ্ণ

বোরো ধান

  • কৃষকের দুচিন্তা এখন ভারী বৃষ্টি ও বজ্রপাত
  • সীমিত আকারে ধান কাটা শুরু, রয়েছে শ্রমিক সংকট
  • মে মাসে প্রথম সপ্তাহ থেকে পুরোদমে কাটা শুরু
  • সরকারের প্রণোদনায় খুশি হলেও ঋণপ্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার দাবি কৃষকদের।

কোথা পাকা, কোথাও আধা-পাকা সোনালি ধানে দুলছে কৃষকের ক্ষেত। বোরোর বাম্পার ফলনে হাসতে কৃষকের মন। ধান কাটার মুহূর্তে কৃষকের দুচিন্তা এখন ভারী বৃষ্টি ও বজ্রপাত নিয়ে। বিভিন্ন উপজেলায় সীমিত আকারে ধান কাটা শুরু হয়েছে। তবে আগামী ১০ মে থেকে পুরোদমে শুরু হবে বলে জানায় কৃষি বিভাগ।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চলতি মৌসুমে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬০ হাজার হেক্টর। অর্জিত হয়েছে ৫৬ হাজার ৪২ হেক্টর।জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. আখতারুজ্জামান পূর্বকোণকে বলেন, ‘ধান এখন পরিপক্ক হয়ে গেছে। বৃষ্টি বড় ক্ষতি করবে না। তবে ভারী বৃষ্টি বা শিলাবৃষ্টি হলে ক্ষতি হবে’। শ্রমিক সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ চট্টগ্রামে শ্রমিক আসে চকরিয়া, বাঁশখালী ও লোহাগাড়া উপজেলা থেকে। আর উত্তর চট্টগ্রামে আসে উত্তর বঙ্গ থেকে। ওই সময়ে হাওড় অঞ্চলে ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে। প্রয়োজনে ধান কাটার জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় শ্রমিক আনা হবে’। ১০ মে থেকে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হবে বলে জানান তিনি।

বোয়ালখালীর পশ্চিম গোমদ-ী এলাকার কৃষক রমিজ মিয়া বলেন, এবার ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রকৃতি সহায় থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। এখন কিন্তু বর্ষণ নিয়ে টেনশনে আছি। ধান কাটার মুহূর্তে শুরু হয়েছে ভারী বর্ষণ। আল্লাহ সহায় থাকলে এবার ভালো ফলন পাবো। তিনি বলেন, ধান পাকার আগে করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট লকডাউনে শ্রমিক নিয়ে দুচিন্তায় ছিলাম। এখন চিন্তা বর্ষণ নিয়ে।

দেখা যায়, জেলার শস্য ভা-ারখ্যাত রাঙ্গুনিয়ার গুমাইবিলসহ লোহাগাড়া, পটিয়া, আনোয়ারা, চন্দনাইশ, সীতাকু-, বাঁশখালীর বিভিন্ন স্থানে সীমিত আকারে ধান কাটা শুরু হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এখনো পাকা, আধা-পাকা সোনালী ধানে দোল খাচ্ছে ধান ক্ষেত। রোজার মাস আসায় শ্রমিক সংকটও রয়েছে। তারপরও লোহাগাড়া উপজেলায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কৃষকের ধান কাটায় সহায়তা করছে। লোহাগাড়া উপজেলায় ধান কাটা শুরু হয়েছে। এখনো পুরোদমে কাটা শুরু হয়নি। আগামী মাস থেকে পুরোদমে বোরো ধান কাটা শুরু হবে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

লোহাগাড়া উপজেলার কৃষক কামাল উদ্দিন বলেন, করোনাভাইরাসের এই সময়ে বোরো ধান কাটতে প্রথম থেকেই শ্রমিক সংকটের আশঙ্কা ছিল। এখন ধান কাটা শুরু হলে শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। তবে পুরোদমে কাটা শুরু হলে সংকটও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, কিছু এলাকায় ধান কাটায় সহায়তা করতে এগিয়ে এসেছে রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা। ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক যন্ত্রপাতিও। তবে এখন আশঙ্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে আগাম ভারী বৃষ্টিপাত। এপ্রিল মাসের শেষের দিকে ভারী বর্ষণ ও বৈরী আবহাওয়া থাকে। কয়েক বছর ধরে তা চলে আসছে। কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি আর বজ্রপাত হচ্ছে। এ নিয়ে এখন দুচিন্তায় আছি।

কৃষি বিভাগ জানায়, প্রতি বছর এ সময়ে কম-বেশি দুর্যোগ থাকে। ভারী বৃষ্টিপাত-শিলাবৃষ্টি, ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়। কৃষক ঝড়-বৃষ্টি মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। নতুন নতুন উদ্ভাবিত ও পানি সহিঞ্চুজাতের বীজ বপন করে। তারপরও এ মৌসুমে আশানুরূপ বোরো ফসল ঘরে তোলা যাবে বলে মনে করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।

কৃষি বিভাগ জানায়, বোরো ধানের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৫৬ হাজার ৪২ হেক্টর জমিতে ধান রোপণ করা হয়েছে। এরমধ্যে মিরসরাই উপজেলায় ১১৬০ হেক্টর, সীতাকু-ে ১০ হেক্টর, ফটিকছড়িতে ৭ হাজার ৫শ হেক্টর, হাটহাজারীতে ৩ হাজার ৫শ হেক্টর, রাউজানে দুই হাজার ৯৩০ হেক্টর, রাঙ্গুনিয়ায় ৫ হাজার ৮৮০ হেক্টর, পাঁচলাইশ থানায় ৬৮০ হেক্টর, ডবলমুরিং থানায় ৮ হেক্টর, বোয়ালখালীতে এক হাজার ১৫৪ হেক্টর, পটিয়ায় চার হাজার ৬৫০ হেক্টর, আনোয়ারায় পাঁচ হাজার ৫শ হেক্টর, চন্দনাইশে তিন হাজার ২৫০ হেক্টর, লোহাগাড়ায় তিন হাজার ৫৫০ হেক্টর, সাতকানিয়ায় ছয় হাজার ৫২০ হেক্টর, বাঁশখালীতে নয় হাজার ৭৫০ হেক্টর জমি।

কৃষি অফিস জানায়, এবার বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় ধান কাটা শুরু হয়েছে। আগামী সপ্তাহ থেকে পুরোদমে কাটা হবে।বোয়ালখালী উপজেলা কৃষি বিভাগের উপ-সহাকারী কৃষি কর্মকর্তা গৌতম চৌধুরী বলেন, ৮০% ধান পাকলে ধান কাটার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। শ্রমিক সংকট রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিছু কিছু জায়গায় ধান কাটা শুরু হয়েছে।

আগামী মাস থেকে বোরো ধান কাটা শুরু হবে। এরমধ্যে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না ঘটলে আশানুরুপ ফসল পাওয়ার আশা প্রকাশ করেছেন কৃষি কর্মকর্তারা। তবে করোনাভাইরাসের আতঙ্ক থাকায় কিছুটা সমস্যার মধ্যে পড়তে হবে কৃষকদের। করোনা সংকটের কারণে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে হাওড় অঞ্চলের মতো বিশেষব্যবস্থায় ধান কাটার শ্রমিক আনা হবে বলে জানায় কৃষি বিভাগ।
এদিকে, মাসখানেকের মধ্যেই কৃষকদের ঘরে উঠবে বোরো ধান। তাই কৃষকরা এখন শঙ্কিত উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাত করা ও ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিয়ে। এমন পরিস্থিতিতে কৃষকদের জন্য সরকারের প্রণোদনা ঘোষণায় খুশি হলেও ঋণপ্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের দাবি, অতীতে কৃষিঋণের বেশির ভাগ ভাগিয়ে নেয় জমিদার ও জমির মালিকেরা। প্রকৃত কৃষক অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বোয়ালখালী উপজেলার কৃষক আবদুর রহমান বলেন, এবার সাড়ে ৩ কানি জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছেন। দুই-তৃতীয়াংশ জমির ধান পেকে গেছে। এক সপ্তাহ পর থেকে ধান কাটা শুরু করতে হবে। কিন্তু এবার করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে যানবাহন বন্ধ থাকায় শ্রমিকেরা আসতে পারছেন না। এ ছাড়া সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এ অবস্থায় ক্ষেতের পাকা ধান নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি। একই এলাকার রহিম উদ্দিন বলেন, ‘ধান পেকে গেছে। আর সাত দিন পর ধান কাটা শুরু করতে হবে। অন্য উপজেলা থেকে শ্রমিক এনে ধান কাটা হয়। এবার শ্রমিকেরা আসছেন না। খুব বিপদে পড়ে গেছি। ধান কাটা, মাড়াই, পরিষ্কার ও গোলায় তোলা নিয়ে ভীষণ চিন্তায় আছি’।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, ধান কাটার যন্ত্র (কম্বাইন্ড হারভেস্টার) দিয়েছে ২৩টি। আরও দুটি সংগ্রহ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে অন্য জেলা থেকে শ্রমিক এনে ধান কাটার উদ্যোগ নেওয়া হবে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর বোরো ধানের বাম্পার ফলনেরও সম্ভাবনা রয়েছে।

 

পূর্বকোণ/-আরপি

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট