চট্টগ্রাম শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

সর্বশেষ:

ডেন্টাল সার্জন (ডেন্টিস্ট) ও ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট এক নয়

ডেন্টাল সার্জন (ডেন্টিস্ট) ও ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট এক নয়

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন

২৪ জুলাই, ২০২৬ | ১১:৫৯ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন নিয়ে আলোচনা যত বাড়ছে, ততই একটি বিষয় উদ্বেগের সঙ্গে সামনে আসছে।স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন সহযোগী (Allied Health) পেশার কিছু অংশ থেকে সময়ে সময়ে এমন দাবি ওঠে যে, তাঁদেরও যেন চিকিৎসকদের মতো রোগ নির্ণয়, প্রেসক্রিপশন লেখা কিংবা স্বাধীনভাবে চিকিৎসা করার অধিকার দেওয়া হয়। সম্প্রতি কিছু ডেন্টাল টেকনোলজিস্টের পক্ষ থেকে তাঁদের ডেন্টিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জনপরিসরে আলোচিত হচ্ছে।

 

যে কোনো পেশাজীবী তাঁর কর্মক্ষেত্রের উন্নতি, মর্যাদা বৃদ্ধি কিংবা বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবি জানাতে পারেন। সেটি একটি গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু একটি পেশার উন্নয়নের দাবি আর অন্য একটি পেশার আইনগত ও পেশাগত পরিচয় দাবি করা এক বিষয় নয়। একজন ডেন্টাল টেকনোলজিস্টকে ডেন্টিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি যেমন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তেমনি এটি রোগীর নিরাপত্তা, চিকিৎসার মান এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার মৌলিক নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। বাংলাদেশে BDS-এ ভর্তি হওয়া অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। দীর্ঘ পাঁচ বছরের শিক্ষা, ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC)-এর নিবন্ধনের মাধ্যমে একজন ডেন্টাল সার্জন রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা পরিকল্পনা, দাঁত সংরক্ষণ, ফিলিং, রুট ক্যানেল, দাঁত তোলা, মুখ ও দাঁতের সংক্রমণের চিকিৎসা এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করার যোগ্যতা অর্জন করেন। অন্যদিকে, ডেন্টাল টেকনোলজিস্টদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য হলো ডেন্টিস্টের প্রেসক্রিপশন ও নির্দেশনা অনুযায়ী ডেনচার, ক্রাউন, ব্রিজ, অর্থোডন্টিক অ্যাপ্লায়েন্স এবং অন্যান্য ডেন্টাল প্রস্থেসিস তৈরি করা। তাঁরা স্বাস্থ্যসেবা দলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। কিন্তু তাঁদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ রোগ নির্ণয়, চিকিৎসাপরিকল্পনা বা স্বাধীনভাবে রোগীর চিকিৎসা দেওয়ার জন্য নয়। এই পার্থক্যটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি।

 

আইন ও অন্যান্য পেশায় কি এমন দাবি দেখা যায়?

বাংলাদেশে একজন প্যারালিগ্যাল বা আইনজীবীর সহকারী কখনো বলেন না যে তাঁকে অ্যাডভোকেট হিসেবে স্বৗকৃতি দিতে হবে। কারণ তিনি জানেন, আদালতে মামলা পরিচালনার জন্য আইন বিষয়ে নির্দিষ্ট শিক্ষা, বার কাউন্সিলের পরীক্ষা এবং লাইসেন্স অপরিহার্য। একইভাবে একজন অ্যাকাউন্টিং সহকারী কখনো দাবি করেন না যে তাঁকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের সমান আইনগত ক্ষমতা দিতে হবে। একজন ফার্মাসি টেকনিশিয়ান নিজেকে ফার্মাসিস্ট বলেন না। একজন অপারেশন থিয়েটার টেকনোলজিস্ট নিজেকে সার্জন দাবি করেন না। একজন অ্যানেস্থেসিয়া টেকনোলজিস্টও অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট নন। কারণ প্রতিটি পেশার নিজস্ব শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, আইনগত দায়িত্ব এবং জবাবদিহিতা রয়েছে।

 

তাহলে স্বাস্থ্যসেবায় কেন এই সীমারেখা মুছে ফেলার চেষ্টা হবে? চিকিৎসা শুধু একটি কারিগরি দক্ষতা নয়। অনেকেই মনে করেন দাঁত তোলা, স্কেলিং বা ফিলিং করা খুব সাধারণ কাজ। বাস্তবে বিষয়টি মোটেও এত সহজ নয়। একজন রোগীর দাঁতের ব্যথার পেছনে থাকতে পারে ডেন্টাল অ্যাবসেস, চোয়ালের টিউমার, মুখগহ্বরের ক্যান্সার, সাইনাসের রোগ, ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া কিংবা সিস্টেমিক রোগের প্রকাশ। রোগীর ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, কিডনি রোগ, রক্তক্ষরণের সমস্যা, অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট ওষুধ ব্যবহার বা অ্যালার্জির ইতিহাসও চিকিৎসার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসাপরিকল্পনা কেবল একটি কারিগরি দক্ষতা নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। সেই কারণেই পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ের অধিকার নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও নিবন্ধিত চিকিৎসকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়।

 

ডেন্টাল টেকনোলজিস্টদের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এটি স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন যে, ডেন্টাল টেকনোলজিস্টরা স্বাস্থ্যসেবায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের দক্ষতা ছাড়া আধুনিক ডেন্টাল প্রস্থেসিস ব্যবস্থা কার্যত অচল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হওয়া আর চিকিৎসক হওয়া এক বিষয় নয়।

 

একজন দক্ষ বিমান প্রকৌশলী যেমন পাইলট নন, তেমনি একজন দক্ষ ডেন্টাল টেকনোলজিস্টও ডেন্টিস্ট নন। উভয়ের কাজই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দায়িত্ব এক নয়।

 

গ্রামীণ জনগণের জন্য ভিন্ন মানের স্বাস্থ্যসেবা কেন?

ডেন্টাল টেকনোলজিস্টদের স্বাধীন চিকিৎসার পক্ষে একটি সাধারণ যুক্তি হলো—গ্রামে ডেন্টিস্ট নেই। প্রশ্ন হলো, গ্রামীণ মানুষ কি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক? শহরের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি যদি নিজের বা পরিবারের দাঁতের চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, তাহলে কি তিনি একজন ডেন্টাল টেকনোলজিস্টের কাছে যাবেন, নাকি একজন যোগ্য (BDS) ডেন্টাল সার্জনের কাছে? বাস্তবতা হলো, প্রায় সবাই নিজের এবং নিজের পরিবারের জন্য যোগ্য ডেন্টাল সার্জনের চিকিৎসাই চান। তাহলে গ্রামের দরিদ্র মানুষের জন্য কেন ভিন্ন মানদণ্ড? এটি একটি দ্বৈত নীতি (Double Standard)। একদিকে নিজের পরিবারের জন্য সর্বোচ্চ যোগ্য চিকিৎসক চাইবেন, অন্যদিকে গ্রামের মানুষের জন্য কম প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ডেন্টিস্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইবেন—এটি নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। গ্রামের মানুষেরও একই মানের নিরাপদ চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তাঁদের জন্য নিম্নমানের বিকল্প তৈরি করা সমাধান নয়; বরং এটি স্বাস্থ্যবৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া।

 

রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছু কিছু রাজনৈতিক দলের শীর্ষপর্যায়ের নেতা কখনো কখনো অ্যালাইড হেলথ পেশার একটি অংশকে সম্ভাব্য ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করেন। ফলে জনস্বার্থ বা বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার পরিবর্তে রাজনৈতিক লাভের হিসাব থেকে তাঁদের কিছু অযৌক্তিক দাবিকে প্রকাশ্যে বা নীরবে সমর্থন দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এ ধরনের রাজনৈতিক প্রশ্রয় স্বল্পমেয়াদে কিছু গোষ্ঠীর কাছে জনপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। স্বাস্থ্যনীতি কখনো ভোটের রাজনীতির ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়। স্বাস্থ্যনীতি নির্ধারিত হওয়া উচিত রোগীর নিরাপত্তা, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং জনস্বার্থের ভিত্তিতে। আজ যদি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য একটি পেশাকে এমন ক্ষমতা দেওয়া হয়, যার জন্য তারা প্রশিক্ষিত নয়, তাহলে আগামীকাল অন্য পেশাগুলোও একই দাবি তুলবে। এর ফলে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার পেশাগত কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়বে।

 

প্রকৃত সমাধান কী?

গ্রামে ডেন্টিস্টের স্বল্পতা থাকলে সমাধান হলো—উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত (BDS) ডেন্টাল সার্জন নিয়োগ। গ্রামীণ এলাকায় চাকরির জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা। আধুনিক ডেন্টাল ইউনিট স্থাপন। মোবাইল ডেন্টাল ক্লিনিক চালু করা। টেলি-ডেন্টিস্ট্রি ও কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ডেন্টাল টেকনোলজিস্টদের তাঁদের প্রকৃত কারিগরি দক্ষতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। এগুলোই টেকসই সমাধান।

 

উপসংহার :

একটি আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা দলগত কাজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সেখানে চিকিৎসক, ডেন্টিস্ট, নার্স, ফার্মাসিস্ট, ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট, মেডিকেল ল্যাব টেকনোলজিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট—সবারই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু দলগত কাজের অর্থ এই নয় যে, সবার পেশাগত দায়িত্ব এক হয়ে যাবে। পেশাগত মর্যাদা অর্জনের পথ অন্যের পরিচয় গ্রহণ করা নয়; বরং নিজের পেশার দক্ষতা, অবদান ও মান উন্নয়নের মাধ্যমে সমাজের আস্থা অর্জন করা।

 

সরকারের উচিত প্রতিটি স্বাস্থ্য পেশার (Scope of Practice) স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা। একই সঙ্গে অযৌক্তিক দাবিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রশ্রয় না দিয়ে রোগীর নিরাপত্তা ও জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।

বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক—তিনি শহরে থাকুন বা গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে—সমান মানের, নিরাপদ এবং যোগ্য স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রাখেন। গ্রামীণ জনগণের জন্য কম যোগ্যতাসম্পন্ন বিকল্প তৈরি করা কোনো সামাজিক ন্যায়বিচার নয়; বরং এটি বৈষম্যের একটি রূপ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত যোগ্য ইউঝ ডেন্টাল সার্জনের সেবা দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, পেশাগত সীমারেখা ভেঙে রোগীর নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা নয়।

 

লেখক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্টজন রেজিওনাল হসপিটাল, নিউব্রান্সউইক;

এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা|

 

পূর্বকোণ/আদর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট