আজ ২১ জুলাই জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)-এর প্রতিষ্ঠাকালীন উপ-পরিচালক, আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বর্ষীয়ান পুলিশ ব্যক্তিত্ব মুসা মিয়া চৌধুরীর মৃত্যুবার্ষিকী।
তিনি বাংলাদেশ পুলিশের একজন সিনিয়র এসপি ছিলেন। বাংলাদেশ পুলিশ এবং গোয়েন্দা প্রশাসনের ভিত্তি গঠনে তাঁর অবদান আজো শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরন করা হয়।
পেশাগত জীবনের সূচনা ও সিলেটের কর্মঅধ্যায়
চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার মহামুনি পাহাড়তলী গ্রামে জন্মগ্রহণকারী মুসা মিয়া চৌধুরী পাকিস্তান আমলে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি যখন সিলেটের জেলা দুর্নীতি দমন কর্মকর্তা (District Anti-Corruption Officer, Sylhet) এবং ডেপুটী সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ (ডিএসপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, ওই বছরের ১৪ আগস্ট তৎকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (Ministry of Home Affairs Division) এক বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় police পদক ‘প্রেসিডেন্টস পুলিশ মেডেল’ (PPM)-এ ভূষিত করে, যা পরবর্তীতে সরকারি গেজেটেও প্রকাশিত হয়।
আমেরিকায় উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও বৈশ্বিক মূল্যায়ন
পেশাগত উৎকর্ষের কারণে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ একাডেমিতে (আইপিএ) উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য মনোনীত ১১৩ জন বিশ্বমানের ইনপোলস (INPOLSE) কর্মকর্তার একজন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ১৯৭০ সালের ১৫ জুন থেকে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইউ.এস. ডিপার্টমেন্ট অব স্টেটের (U.S. Department of State) অধীনে তিনি ‘পাবলিক সেফটি অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স’ বিষয়ে জেনারেল কোর্স সম্পন্ন করেন এবং ওয়াশিংটন ডি.সি. থেকে অফিশিয়াল ডিপ্লোমা সার্টিফিকেট লাভ করেন।
ঐতিহাসিক গ্রন্থে স্বীকৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা
মার্কিন গবেষক লরেন্স লিফশুলজ তাঁর Bangladesh: The Unfinished Revolution গ্রন্থে স্বাধীন বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর আধুনিকায়ন ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা কাঠামো গঠনে মুসা মিয়া চৌধুরীর দূরদর্শিতার বিশেষ উল্লেখ করেছেন। লিফশুলজের মতে, তিনি ছিলেন একজন বিরল ও বিচক্ষণ কর্মকর্তা, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ একাডেমিতে অর্জিত দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ, বিদ্রোহ দমন ও পুলিশ কৌশলগত পরিচালনার আধুনিক কৌশল দেশে সফলভাবে প্রয়োগ করে কেন্দ্রীয় সচিবালয়ে একটি আধুনিক কেন্দ্রীয় পুলিশ কন্ট্রোল রুম প্রতিষ্ঠা করেন। নিউ রিপাবলিক এবং POCC-এর মূল্যায়নেও তাঁকে একজন দক্ষ ও দূরদর্শী কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বাধীন বাংলাদেশে এনএসআই গঠন, চট্টগ্রামে বিভাগীয় দপ্তর প্রতিষ্ঠা ও পুলিশ সংস্কার
স্বাধীনতার পর, ১৯৭২ সালের ২৯ ডিসেম্বর দেশের শীর্ষ ও দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে যখন ‘জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা’ (এনএসআই) গঠন করা হয়, তখন মুসা মিয়া চৌধুরী এর প্রতিষ্ঠাকালীন উপ-পরিচালক (Deputy Director) হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। বিশেষ করে, স্বাধীনতার পর চট্টগ্রামে এনএসআই-এর বিভাগীয় দপ্তর প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। পরবর্তীতে তিনি অত্যন্ত সফলতার সাথে চট্টগ্রামে এনএসআই-এর কার্যক্রমের নেতৃত্ব দেন।। গোয়েন্দা কার্যক্রমে আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত বিশ্লেষণ কাঠামো যুক্ত করার পাশাপাশি ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের সিপাহী বিদ্রোহ পরবর্তী জটিল পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং বাংলাদেশ পুলিশের পুনর্গঠন ও আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে গঠিত ১২,৫০০ সদস্যের বিশেষ পুলিশ বাহিনীর বিশেষ ইউনিটগুলোর পরিচালনায় এনএসআই-এর উপ-পরিচালক মুসা মিয়া চৌধুরী গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভূমিকা পালন করেন।
তিনি ১৯৮১ সালে এনএসআই থেকে অবসর নেন, কিন্তু তাঁর প্রভাব রয়ে যায় বাংলাদেশ পুলিশের কৌশলগত উন্নয়নে, বিশেষ করে এনএসআই ও গোয়েন্দা প্রশাসনের ভিত গঠনে। ১৯৮৫ সালের ২১ জুলাই তিনি ইন্তেকাল করেন। মুসা মিয়া চৌধুরীর জীবন এবং কর্ম দেশের নিরাপত্তা ও প্রশাসন ব্যবস্থায় এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
















