চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সর্বশেষ:

১১ পয়েন্টে এআই প্রযুক্তির চেকপোস্ট বসানোর পরিকল্পনা পুলিশ

সীমান্তের প্রবেশমুখে ইয়াবার পাচার ঠেকানো

১১ পয়েন্টে এআই প্রযুক্তির চেকপোস্ট বসানোর পরিকল্পনা পুলিশের

নাজিম মুহাম্মদ 

১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১:০৯ অপরাহ্ণ

কোনভাবেই থামছে না সীমান্তে ইয়াবা পাচার। বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্ত পার হয়ে প্রতিদিন দেশে ঢুকছে ২০ থেকে ৩০ লাখ পিস ইয়াবা। বছরে প্রবেশ করছে ৭৫ থেকে ১০০ কোটি পিস ইয়াবা। মাদকের বিপরীতে বছরে অর্থ পাচার হচ্ছে প্রায় ৫০ কোটিরও বেশি। ২০২৫ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এক কোটি ৫১ লাখ ৩৪ হাজার ৯৪৫ পিস এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চার কোটি ৩৫ লাখ ৬২ হাজার ৮১১ পিস ইয়াবা জব্দ করেছে। তবে থেমে নেই ইয়াবা পাচার। এ অবস্থায় সীমান্তের প্রবেশমুখে ইয়াবা পাচার ঠেকাতে কক্সবাজার ও বন্দরবান জেলায় ১১ পয়েন্টে এআই প্রযুক্তির স্থায়ী চেকপোস্ট বসানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে পুলিশ।

 

 

এতে আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকা। জনবল লাগবে ৩০৭ জন। ইয়াবা পাচারের দীর্ঘদিনের তথ্য সংগ্রহ করে কোন চেকপোস্ট কোথায় হবে, কোন ধরনের প্রযুক্তি প্রয়োজন হবে, কি পরিমাণ জনবল লাগবে সবকিছুর বিস্তারতি তথ্য দিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজিমুল হক। প্রতিবেদন ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট্ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। সরকারের অনুমোদন পেলে এসব চেকপোস্টের কার্যক্রম শুরু হবে শিগগির।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ইয়াবা পাচারের ঐতিহ্যগত ও প্রধান প্রবেশদ্বার হিসাবে দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজার জেলার টেকনাফ এলাকাকে বিবেচনা করা হয়। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে নাফ নদী, সমুদ্রপথ এবং সীমান্তবর্তী বিভিন্ন পয়েন্ট ব্যবহার করে ইয়াবা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। রাখাইন রাজ্য আরাকান আর্মি শাসিত। তাদের যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্র, যুদ্ধের উপকরণসহ নানা খরচ মেটাতে মিয়ানমার হতে বাংলাদেশে তারা ইয়াবা পাচারে সহযোগিতা করে আসছে। এ কারণে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ইয়াবার চালান বেশি পাচার হচ্ছে।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্ত এলাকায় বিজিবি’র নিবিড় তদারকি ও অর্জন থাকা সত্বেও বাংলাদেশে ইয়াবা প্রবেশ করছে। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ থানার সীমান্ত এবং বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি থানার সীমান্ত এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে ইয়াবা প্রবেশের হার সবচেয়ে বেশি। গুরুত্বের বিবেচনায় যেসব এলাকায় স্থায়ী চেকপোস্ট বসানোর প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে তা হলো-কক্সবাজার জেলার রামু থানার আওতাধীন তিনটি, উখিয়া থানার আওতাধীন একটি ও চকরিয়া থানার আওতাধীন একটি। বাকি তিনটি হলো বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি থানা এলাকায়।

 

১১টি চেকপোস্টে ছয়টি ভেহিক্যাল স্ক্যানিং মেশিন, আটটি লাগেজ স্ক্যানার মেশিন, ৩১টি ফেস ডিডেকটিং এআই সিসি ক্যামেরা, একটি ফেস ডিটেকটিং এআই বেইজ সফটওয়ার, ১৪০টি সাধারণ সিসি ক্যামেরা, ১১টি ডিভিআর ও ২৩টি স্ক্যানিং দেখার টেলিভিশনের প্রয়োজনীয়তার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। ১১টি চেকপোস্টের জন্য জনবলের চাহিদা দেয়া হয়েছে ৩০৭ জন।

 

চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজিমুল হক বলেন, এখন আরাকান আর্মির সদস্যদের বেতনের সিংহ ভাগ অর্থই আসছে ইয়াবা কারবারের আয় থেকে। তাই তারা বাংলাদেশকে ইয়াবা পাচার ও ব্যবসার প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহার করছে। টেকনাফ-উখিয়া-নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা ঢুকে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। পুলিশ সনাতন পদ্ধতিতে ইয়াবা চোরাচালানকারী, কারবারি ও বাহকদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তবে ইয়াবা পাচারকারীরা অনেক ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক কৌশল ব্যবহার করায় পুলিশ সফল হতে পারছে না। তাই এবার এআইসহ অত্যাধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইয়াবা পাচার শতভাগ বন্ধ করার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। অতীতের মাদক মামলার আসামিদের ডাটাবেজ যুক্ত হবে এআই সফটওয়্যারে।

 

ভৌগলিকভাবে কক্সবাজার ও বান্দরবান এলাকা মিলে মিয়ানমার বাংলাদেশ সীমান্তের দৈর্ঘ্য ২৭১ কি.মি.। ২৭১ কি.মি. এর মধ্যে ৬৪ কি.মি. নাফ নদী। নদীটি মূলত টেকনাফ অংশকে মিয়ানমারের উত্তর রাখাইন রাজ্য থেকে আলাদা করেছে। প্রশাসনিকভাবে মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের তিনটি জেলার সীমান্ত রয়েছে। তা হলো কক্সবাজার, বান্দরবান এবং রাঙামাটি। এরমধ্যে কক্সবাজার ও বান্দরবান অংশে মাদক পাচার হয়ে থাকে সবেচেয়ে বেশি।

 

২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে মাদকের মাধ্যমে অবৈধ অর্থপ্রবাহের চিত্র প্রথমবারের উঠে এসেছিল জাতি সংঘের বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থা ও জাতিসংঘের মাদক অপরাধ বিষয়ক কার্যালয়ের যৌথ প্রতিবেদনে। ২০২৩ সালে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের নয়টি দেশের মাদকসংশ্লিষ্ট অবৈধ অর্থপ্রবাহের অনুমানভিত্তিক হিসাব তুলে ধরা হয়েছিল। অন্য দেশগুলো হলো আফগানিস্তান, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, মালদ্বীপ, মেক্সিকো, মিয়ানমার, নেপাল ও পেরু। তখন ভারত সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে ফেনসিডিল ঢুকত। একসময় ফেনসিডিলের জায়গা দখল করে হেরোইন। এখন দেশে ইয়াবার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়াবার চেয়ে ভয়ংকর মাদক আইস দেশে ঢুকছে।

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাদকের অবৈধ অর্থপ্রবাহের দিক থেকে বিশ্বে প্রথম অবস্থানে রয়েছে মেক্সিকো। এরপর যথাক্রমে রয়েছে কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, পেরু ও বাংলাদেশ। তালিকায় এশিয়ার যে পাঁচটি দেশের নাম রয়েছে, এর মধ্যে শীর্ষে থাকা বাংলাদেশের পরেই আছে মালদ্বীপ ও নেপাল। চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে আছে আফগানিস্তান ও মিয়ানমার।

পূর্বকোণ/নুসরাত

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট