চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সর্বশেষ:

চিঠি লিখতে ভুলে গেছে যে প্রজন্ম...

আজ আন্তর্জাতিক চিঠি দিবস

চিঠি লিখতে ভুলে গেছে যে প্রজন্ম…

তাসনীম হাসান

১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১:১১ অপরাহ্ণ

একটি চিঠি কতটা শক্তিশালী হতে পারে, তার অসাধারণ উদাহরণ পাওয়া যায় দেড়শ বছরেরও বেশি আগের এক ঘটনায়। ১৮৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ১১ বছরের কিশোরী গ্রেস বেডেল চিঠি লিখেছিল আব্রাহাম লিঙ্কনকে। ছোট্ট মেয়েটির পরামর্শ ছিল-লিঙ্কন যদি দাড়ি রাখেন, তাহলে তাকে আরও ভালো দেখাবে এবং নির্বাচনে জিততেও সুবিধা হবে।

 

লিঙ্কন চিঠিটির উত্তর দিয়েছিলেন। তবে দাড়ি রাখবেন কি না, তা জানাননি। কিন্তু প্রায় এক মাস পর তার মুখে দেখা গেল সেই বিখ্যাত গালভরা দাড়ি। পরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর, ১৮৬১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনে যাওয়ার পথে লিঙ্কনের ট্রেন গ্রেসের শহর নিউইয়র্কের ওয়েস্টফিল্ডে থামে। বিশাল জনতার ভিড়ের মাঝে লিঙ্কন গ্রেস বেডেলকে খুঁজে বের করেন। প্ল্যাটফর্মে নিচু হয়ে গ্রেসের গালে চুমু খান। এরপর নিজের দাড়িতে হাত দিয়ে হেসে বলেন, ‘গ্রাসি, দেখ! তোমার কথা রেখেছি।’ জানা আছে নিশ্চয়-ওই দাড়িই পরবর্তীতে লিঙ্কনের ঐতিহাসিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।

 

দেড়শ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। গ্রেস নেই, লিঙ্কনও নেই। কিন্তু তাদের সেই চিঠি এবং তার গল্প আজও টিকে আছে। একটি ছোট্ট কাগজ কীভাবে সময় পেরিয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকতে পারে, এই ঘটনা যেন তারই প্রমাণ। কিন্তু সেই চিঠির জগত থেকে আজকের প্রজন্ম যেন অনেক দূরে। ‘ভালো আছি, ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’-এই গানের মতো করে কেউ কি ভেবেছিলেন, মানুষ একসময় সত্যিই শুধু আকাশের ঠিকানায়, অর্থাৎ অন্তর্জালে, চিঠি লিখে যাবে? মুঠোফোন, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারের খুদে বার্তার ভেতর তলিয়ে যাবে চিঠির সেই আবেদন!

 

অথচ একসময় চিঠি ছিল মানুষের জীবনের স্বাভাবিক অংশ। দূরে থাকা বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধু কিংবা প্রিয় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল চিঠি। একটি চিঠি আসা মানে ছিল দূরের একজন মানুষের খবর এসে পৌঁছানো। ডাকপিয়নের হাতে খাম দেখলেই বাড়িতে তাই তৈরি হতো আলাদা এক উত্তেজনা-কার চিঠি? আবার ব্যক্তিগত প্রেমের চিঠিও আসত চুপিচুপি। দূর প্রবাসে পড়ে থাকা স্বজনের সঙ্গেও হতো চিঠি চালাচালি। সেই সব চিঠির জন্য অপেক্ষাও ছিল জীবনের অংশ।

 

এই প্রজন্মের অন্তত এক ডজন তরুণের সঙ্গে কথা হয় পূর্বকোণের। তাদের কারও কখনো চিঠি লেখার অভিজ্ঞতা হয়নি। কেউ কেউ শুধু একজীবনে পরীক্ষার খাতাতেই চিঠি লিখেছেন। তাদেরই একজন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান পূর্বকোণকে বলেন, ‘আমরা প্রযুক্তির সময়ে বেড়ে উঠছি। তাই হয়তো কখনো চিঠি লেখার প্রয়োজন বোধ করিনি। স্কুলে বাংলা পরীক্ষাতেই শুধু চিঠি লিখতে হয়েছিল। সেসবই চিঠি লেখার শেষ অভিজ্ঞতা।’

 

চিঠির যুগের মানুষ-বিশিষ্ট কবি, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক ওমর কায়সার মনে করেন চিঠি নিয়ে যে অনাবিল আনন্দ তা মেসেঞ্জার বা ই-মেইল দিতে পারবে না। তিনি বলেন, ‘চিঠির প্রচলন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি মিস করবে, তা হলো পত্রসাহিত্য। রবীন্দ্রনাথ, নজরুলসহ আমাদের সব মনীষীর চিঠি আমরা সাহিত্য হিসেবেই পড়েছি। একসময় ‘দেশ’ পত্রিকায় নিয়মিত পত্রসাহিত্য প্রকাশিত হতো। ভবিষ্যতে এমন চিঠি আর কোথায় পাওয়া যাবে! এখন যেমন ফেসবুক বন্ধু, আমাদের সময়ে ছিল পত্রমিতা। দূরের, কখনো না-দেখা একজন মানুষের সঙ্গে পত্র বিনিময় করতে করতে সে-ই হয়ে উঠত আপনজন।

 

আমার ছোটবেলার পত্রমিতাদের মধ্যে ছিলেন কবি আবু হাসান শাহারিয়ার, কথাসাহিত্যিক নাসরিন জাহান, সামসাদ জাহান রেখাসহ আরও অনেকে। একটি চিঠির অপেক্ষা, কিংবা প্রিয়জনকে মনের সব কথা লিখে ডাকবাক্সে ফেলে দেওয়ার যে অনাবিল আনন্দ-পৃথিবীর কোনো মেসেঞ্জার বা ই-মেইল তা দিতে পারবে না।’
আগে ডাকবাক্স মানেই ছিল চিঠির দুনিয়া। এখন সেই ডাকবাক্সগুলো পড়ে আছে চিঠিহীন অবহেলায়। পোস্টমাস্টার জেনারেলের কার্যালয় পূর্বাঞ্চল, চট্টগ্রামের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল মো. শফিউল আরেফিনও বলেছেন সেই কথা।

 

তিনি বলেন, ‘একটা সময় ডাক বিভাগে বহু ব্যক্তিগত চিঠি আসতো। এখন সেটি আর নেই। এর কারণও অবশ্য আছে। এখন অনেক বিকল্প তৈরি হয়েছে। মুঠোফোন তো আছেই-এর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারসহ নানা অ্যাপস চলে এসেছে। তবে দাপ্তরিক চিঠি আগের চেয়ে বেড়েছে।’ চিঠি নামের হারিয়ে যাওয়া শিল্পকে ধরে রাখতে প্রতিবছর ১ সেপ্টেম্বর পালিত হয়ে আসছে ‘আন্তর্জাতিক চিঠি দিবস’। ২০১৪ সালে প্রথম অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক রিচার্ড সিম্পকিনের হাত ধরে এই দিবসের প্রচলন শুরু হয়। তার চাওয়া, চিঠি লেখার চর্চা আবার ফিরে আসুক। সেই আকাক্সক্ষা কি ফিরবে কভু?

পূর্বকোণ/নুসরাত

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট