প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকটকে নিছক একটি মানবিক বিষয় হিসেবে না দেখে একযোগে মানব নিরাপত্তা, জাতীয় নিরাপত্তা, কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন। পরিকল্পনাহীনভাবে গ্রহণ করা এই দায় গত নয় বছরে বাংলাদেশের জন্য এক ক্রমবর্ধমান বোঝায় পরিণত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধীন সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ আয়োজিত “Challenges of Rohingya Repatriation: International Politics and National Priorities” শীর্ষক সেমিনারে রবিবার সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি কক্সবাজার ও ভাসানচরের ৩৩টি ক্যাম্পে অবস্থানরত প্রায় ১১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গার মধ্যকার নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির চিত্র তুলে ধরেন, যেখানে ছয় থেকে ১১টি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয়, ইয়াবাসহ মাদক পাচার অব্যাহত, ২০১৭ সাল থেকে দুই হাজারের বেশি মামলা দায়ের হয়েছে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির প্রায় শতকরা নব্বই ভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণে থাকার তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রতি সংগঠনটির মনোভাব মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চেয়েও কঠোর।
অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি স্মরণ করেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৮ সালের এবং বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকের রোহিঙ্গা আগমন সংকট নিরবচ্ছিন্ন কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের মধ্য দিয়ে সমাধান হয়েছিল, যা প্রমাণ করে যে ধৈর্য ও কৌশলগত দৃঢ়তার সঙ্গে পরিচালিত কূটনীতি ফল বয়ে আনতে পারে।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার “বাংলাদেশ ফার্স্ট” নীতির ভিত্তিতে মানবিক দায়বদ্ধতা, জাতীয় স্বার্থ এবং নিরবচ্ছিন্ন কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার সমন্বয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে অগ্রসর হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি সরকারের ছয়দফা কৌশলগত পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন- জাতিসংঘ, আসিয়ান, ওআইসি, চীন ও ভারতসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনের মাধ্যমে বিষয়টিকে আন্তর্জাতিকীকরণ; চীন ও ভারতের মধ্যে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা; মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মি উভয়ের সঙ্গে দ্বৈত-পর্যায়ের সম্পৃক্ততা; ক্যাম্পের নিরাপত্তা জোরদারকরণ; পূর্ব সীমান্তে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলা; এবং আসিয়ান-ওআইসিকে যুক্ত করে একটি আঞ্চলিক কাঠামো গঠনে নেতৃত্ব প্রদান।
সেমিনারে তিনি ১৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক তিন লাখ আট হাজার সাতশত সাতানব্বই জন রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনযোগ্য হিসেবে যাচাইয়ের ঘোষণাকে আন্তর্জাতিক চাপ প্রশমন ও আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান গণহত্যা মামলা মোকাবিলার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ বলে মূল্যায়ন করেন, প্রকৃত প্রত্যাবাসনের আন্তরিকতা নয়।
বক্তব্যের সমাপনীতে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান এবং সরকার “বাংলাদেশ ফার্স্ট” নীতি অনুসরণ করে বিচক্ষণতা ও মানবিক বিবেচনার সঙ্গে নিরাপত্তা-সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এ সংকট মোকাবিলায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
পূর্বকোণ/রেহেনুমা


















