চট্টগ্রাম বুধবার, ০১ জুলাই, ২০২৬

রঙ, পুতুল আর শিশুমনের আজীবন কারিগর

মুস্তাফা মনোয়ারের জীবন ও কর্ম

রঙ, পুতুল আর শিশুমনের আজীবন কারিগর

নিজস্ব প্রতিবেদক

১ জুলাই, ২০২৬ | ১১:০০ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির আকাশে এমন কিছু নক্ষত্র আছেন, যাঁদের অবদান কোনো একটি পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়| তাঁরা একই সঙ্গে শিল্পী, শিক্ষক, সংগঠক, নির্মাতা এবং সংস্কৃতির পথপ্রদর্শক| একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের অন্যতম। তাঁর জীবন ছিল সৃজনশীলতার এক দীর্ঘ অভিযাত্রা, আর তাঁর কর্ম বাংলাদেশের চারুকলা, টেলিভিশন, পাপেট থিয়েটার এবং শিশু সংস্কৃতিকে দিয়েছে এক নতুন দিগন্ত। ২০২৬ সালের ২৯ জুন তাঁর প্রয়াণে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে।

 

১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন যশোর অঞ্চলে (বর্তমান মাগুরার নাকোল গ্রামে) জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার পুত্র। পারিবারিক পরিবেশেই সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর অনুরাগ গড়ে ওঠে। অল্প বয়স থেকেই ছবি আঁকার প্রতি ছিল প্রবল আকর্ষণ। পরে কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে চারুকলার শিক্ষা সম্পন্ন করেন।

 

স্বাধীনতা-পূর্ব ও স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে চারুকলার বিকাশে তাঁর অবদান ছিল অনন্য। তিনি শুধু ক্যানভাসে ছবি আঁকেননি; শিল্পকে মানুষের ˆদনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার নিরন্তর চেষ্টা করেছেন। তাঁর চিত্রকর্মে গ্রামীণ জীবন, বাংলার প্রকৃতি, লোকজ ঐতিহ্য এবং মানুষের আবেগ বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। শিল্পকে তিনি দেখতেন সামাজিক জাগরণ ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনের এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে।

 

মুস্তাফা মনোয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় অবদান সম্ভবত বাংলাদেশের পাপেট বা পুতুলনাট্যের বিকাশে। অনেকেই তাঁকে বাংলাদেশের পাপেট থিয়েটারের পথিকৃৎ বলে অভিহিত করেন। তাঁর সৃষ্ট পুতুলচরিত্র ‘পারুল’ শুধু একটি চরিত্র ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল কয়েক প্রজন্মের শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সহজ ভাষা, প্রাণবন্ত উপস্থাপনা এবং শিক্ষামূলক বার্তার মাধ্যমে তিনি শিশুদের কাছে আনন্দ ও শিক্ষাকে একসূত্রে গেঁথে দিয়েছিলেন।

 

বাংলাদেশ টেলিভিশনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন দেশের গণমাধ্যমের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায়। শিশুদের জন্য মানসম্মত অনুষ্ঠান নির্মাণে তিনি ছিলেন এক অগ্রদূত। তাঁর পরিকল্পনা ও পরিচালনায় নির্মিত অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’ অসংখ্য শিশু-কিশোরের প্রতিভা বিকাশের প্রথম মঞ্চে পরিণত হয়েছিল। একইভাবে ‘মনের কথা’ এবং অন্যান্য সৃজনশীল অনুষ্ঠান দর্শকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। পরবর্তীকালে ইউনিসেফের জনপ্রিয় চরিত্র ‘মীনা’-কে বাংলাদেশের শিশুদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

 

প্রশাসনিক দায়িত্বেও মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন সমান দক্ষ। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণযোগাযোগ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (এফডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যানসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এসব প্রতিষ্ঠানে তাঁর নেতৃত্ব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে নতুন গতি ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি জুগিয়েছিল।

 

মুস্তাফা মনোয়ারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো ভাষা আন্দোলন ও জাতীয় চেতনার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা। ছাত্রজীবনে তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং ভাষার অধিকারের প্রশ্নে শিল্পের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের লাল সূর্যের নকশা প্রণয়নের অন্যতম শিল্পী হিসেবেও তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। শিল্প ও জাতীয় ইতিহাস তাঁর জীবনে একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল।

 

শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০০৪ সালে একুশে পদকে ভূষিত করে। পরবর্তীকালে তিনি শিল্পকলা একাডেমির সুলতান স্বর্ণপদকসহ বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা লাভ করেন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পুরস্কার ছিল সাধারণ মানুষের ভালোবাসা-বিশেষ করে সেই সব মানুষের, যাঁদের শৈশব তাঁর সৃষ্টি করা চরিত্র, অনুষ্ঠান ও শিল্পকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

 

মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যু একজন শিল্পীর প্রস্থানমাত্র নয়; এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি। তবে শিল্পীর মৃত্যু হলেও তাঁর সৃষ্টির মৃত্যু হয় না। তাঁর আঁকা ছবি, নির্মিত অনুষ্ঠান, পুতুলনাট্য এবং সাংস্কৃতিক দর্শন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দীর্ঘদিন অনুপ্রাণিত করবে।

 

আজ যখন প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের ভিড়ে শিশুমনের নির্মল জগত ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে, তখন মুস্তাফা মনোয়ারের কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়-সৃজনশীলতা, মানবিকতা ও সংস্কৃতির প্রকৃত শক্তি কখনো পুরোনো হয় না। বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে তাঁর নাম তাই চিরকাল উচ্চারিত হবে গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে। তিনি ছিলেন রঙের শিল্পী, পুতুলের জাদুকর, শিশুদের প্রিয় বন্ধু এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের এক উজ্জ্বল নির্মাতা।

 

পূর্বকোণ/রাকিব

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট