যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জয়ে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধসের মুখে পড়েছে ইলন মাস্কের দুই কোম্পানি টেসলা ও স্পেসএক্স।
কঠোর সরকারি তদারকি ও নতুন বিধিনিষেধের আশঙ্কায় কেবল কয়েক দিনেই ৪২ হাজার কোটি ডলারের বেশি বাজার মূলধন হারিয়েছে দুই কোম্পানি, যার ধাক্কায় মাস্কের নিজের সম্পদও এক ট্রিলিয়ন থেকে কমে নেমেছে ৮০ হাজার কোটি ডলারের নিচে।
বৃহস্পতিবার বিকালে লেনদেন চলাকালে স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম প্রায় ৯ শতাংশ ও টেসলার শেয়ারমূল্য প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
নির্বাচনী ফলাফলের পর মাস্ক যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কংগ্রেসের তদন্তের মুখে পড়তে পারেন ও তার মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোতে কঠোর সরকারি তদারকি ও বিধিনিষেধ আসতে পারে, বিনিয়োগকারীদের এমন শঙ্কা থেকেই এই পতন।
প্রযুক্তি খাতের সার্বিক পতনে মঙ্গলবারের পর থেকে স্পেসএক্স ও টেসলার সম্মিলিত বাজার মূলধন ৪২ হাজার কোটি ডলারের বেশি কমেছে।
সাময়িক এই ধসে মোটা অংকের আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন মাস্ক নিজেই। এ বছরের জুনে স্পেসএক্সের আইপিও ছাড়ার পর মাস্কের মোট সম্পদ ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল।
ফোর্বসের তথ্য অনুসারে, এক সপ্তাহেই তার সম্পদ প্রায় ৯ হাজার কোটি ডলার কমেছে। এ দরপতনের পরও বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় নিজের প্রথম স্থান ধরে রেখেছেন মাস্ক।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ও নির্বাচনী প্রচারে সবচেয়ে বড় অর্থদাতা ছিলেন মাস্ক। তার অনুদানের পরিমাণ ছিল ৪৭ কোটি ডলারের বেশি।
তবে রিপাবলিকানদের তহবিলে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালার পরও মাস্ক সমর্থিত প্রার্থীদের অধিকাংশকেই পরাজয় বরণ করতে হয়েছে।
নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেট উভয় কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি।
টেসলা ও স্পেসএক্সের সদর দফতর টেক্সাসেও মাস্কের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট ও অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন হেরেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস ট্যালারিকো ও জিনা হিনোহোসার কাছে।
বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ডয়চে ব্যাংকের বিশ্লেষকরা তাদের মূল্যায়নে লিখেছেন, “রাজনৈতিক নীতি বা সিদ্ধান্তের পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন হলেও এমন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে স্পেসএক্স বেশ কিছু নতুন ও বাড়তি প্রতিকূলতার মুখে পড়তে পারে বলে আমাদের ধারণা।”
বিশ্লেষকরা বলেছেন, নবনির্বাচিত গভর্নর জিনা হিনোহোসা তার নির্বাচনী প্রচারণায় ‘ডেটা সেন্টার’ নির্মাণকে অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, “আইনসভা যতক্ষণ না পানি ব্যবহার, বিদ্যুৎ খরচ, স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ ও কর ছাড় বা প্রণোদনার ক্ষেত্রে আরও কঠোর সুরক্ষামূলক আইন পাস করছে ততক্ষণ পর্যন্ত নতুন ডেটা সেন্টার অনুমোদনের ওপর স্থগিতাদেশ জারি রাখতে হবে।”
পাশাপাশি, অবকাঠামোগুলোর জন্য কর মওকুফ বা বিশেষ ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন জিনা হিনোহোসা।
বর্তমানে টেসলা ও স্পেসএক্স উভয় কোম্পানিই টেক্সাসে বিপুল পরিমাণ এআই অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
টেক্সাসের গ্রাইমস কাউন্টিতে যৌথভাবে ‘টেরাফ্যাব’ নামে বিশালাকার এক সমন্বিত কারখানা ও ডেটা সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে মাস্কের দুই কোম্পানি, যার মধ্যে একটি সেমিকন্ডাক্টর তৈরির সুবিধাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এ ছাড়া, স্পেসএক্সের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, তারা টেক্সাসে কোম্পানির নিজস্ব শহর ও প্রধান উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ‘স্টারবেইসে’ শক্তিশালী ‘সুপারকম্পিউটার’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে।
ডয়চে ব্যাংকের বিশ্লেষকরা বলছেন, টেক্সাসে স্পেসএক্সের ডেটাভিত্তিক প্রযুক্তি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ এখন দীর্ঘসূত্রতা ও বিলম্বের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সম্ভাব্য কঠোর নতুন বিধিনিষেধ পূরণ করে ডেটা সেন্টার ও অবকাঠামো নির্মাণ বাস্তবায়নে কোম্পানিটিকে এখন অতিরিক্ত অংকের মূলধনী ব্যয় করতে হতে পারে।
অন্যদিকে, ইউক্রেইনে ব্যবহৃত রাশিয়ার হামলা ঠেকাতে সহায়ক ‘স্টারলিংক’ স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সার্ভিসের সামরিক সংস্করণের ওপর চাপানো বিধিনিষেধ সংক্রান্ত যাবতীয় নথি সংরক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে মাস্ক ও স্পেসএক্সকে।
একজন ডেমোক্র্যাটিক সেনেটরের সহকারীকে উদ্ধৃত করে প্রথম এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
পাশাপাশি, কঠোর আইনগত ও নিয়ন্ত্রক তদারকির কারণে স্পেসএক্স ও টেসলাকে একীভূত করার মাস্কের বহুদিনের ইচ্ছাও আটকে যেতে পারে।
মাস্ক নিজেই বলেছিলেন, এই ধরনের একীভূতকরণের জন্য সবার আগে উভয় কোম্পানির বিনিয়োগকারীদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।
নির্বাচনী ফলাফলের পরবর্তী সার্বিক ধসে বৃহস্পতিবার বাজার বন্ধের সময় স্পেসএক্স ও টেসলার সম্মিলিত বাজার মূলধন কমে দাঁড়ায় প্রায় ৪৫ হাজার ৬০০ কোটি ডলারে।
পূর্বকোণ/পিআর

















