যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির ভরাডুবিতে আনন্দ প্রকাশ করেছিল ইরান। এবার তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে চার দেশ- ভারত, চীন, ইরাক এবং কাতারের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের উপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আমির হায়াত-মোকাদ্দম বুধবার ইরানিয়ান ‘স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সি’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই ছাড় দেওয়ার কথা জানান।
স্থানীয় গণমাধ্যমে মোকাদ্দমের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, “আমরা বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে যাতায়াত নিষেধাজ্ঞা থেকে ভারত, চীন, ইরাক এবং কাতারকে অব্যাহতি দিয়েছি। এই দেশগুলোর জাহাজগুলো অবাধে চলাচল করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও তাদের বাধা দিচ্ছে না।”
গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি বর্তমানে দ্বিমুখী অবরোধের মুখোমুখি। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর তেহরান এই পথটি বন্ধ করে দেওয়ার আগে, এখান দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের পাঁচ ভাগের এক ভাগ পরিবাহিত হত।
পরে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি বন্দরে যাতায়াতকারী বা সেখান থেকে আসা জাহাজগুলোর ওপর নিজস্ব অবরোধের ঘোষণা দেয়। কিন্তু ৮ মাসেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চলতে থাকায়, তেহরান নির্দিষ্ট কিছু দেশের বাণিজ্যিক জাহাজকে হরমুজ প্রণালিতে যাতায়াত সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি দিয়েছে।
অন্যান্য জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেই, ইরান নির্দিষ্ট কিছু দেশের সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার জন্য হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের সুযোগকে একটি হাতিয়ার বা বাড়তি সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করছে।
যে দেশগুলোর সঙ্গে ইরান সম্পর্ক ভালো করতে চায় (অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিকভাবে), শুধু তাদের জাহাজগুলোকে এই পথ ব্যবহারের বিশেষ সুযোগ দিচ্ছে। এভাবে তারা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।
স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, এই ব্যবস্থা আংশিকভাবে গড়ে উঠেছে তেহরানের (ইরান সরকারের) জরুরি ওষুধের প্রয়োজনের কারণে। নিষেধাজ্ঞা এবং চলমান সংঘাতের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ ও আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ইরান বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।
ওষুধ উৎপাদনকারী বিশাল খাতের কারণে ভারত হলো ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য সরবরাহকারী। ভারতীয় জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে, তেহরান ভারতের কাছ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় পণ্য আনার প্রক্রিয়া সহজ করতে পারে।
অপরদিকে, চীনের ক্ষেত্রে এই হিসাব-নিকাশ মূলত অনেকটা রাজনৈতিক বলে মনে করা হচ্ছে। মোকাদ্দাম বলেছেন, চীন সরকারের সমর্থন নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই বিশেষ ছাড় বা অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
চীনের সঙ্গে ইরানের বিশেষ করে বাণিজ্য ও জ্বালানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্ব রয়েছে এবং ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের পক্ষ থেকে তেহরান যখন চাপের মুখে পড়ছে, তখন চীনের কূটনৈতিক সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে।
অন্যদিকে, ইরাক এবং কাতারের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পেছনে ইরানের নির্দিষ্ট কিছু কৌশলগত ও পারস্পরিক স্বার্থ রয়েছে।
তাছাড়া, কাতার পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাত ও যুদ্ধ থামাতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। এই কূটনৈতিক সহযোগিতার কারণে ইরান কাতারকে এই ছাড় দিয়েছে।
ইরাকের সঙ্গে ইরানের ভৌগোলিক সীমানা ছাড়াও অত্যন্ত গভীর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সম্পর্ক রয়েছে। ইরাকের বর্তমান সরকার ও অনেক রাজনৈতিক গোষ্ঠী ইরানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র।
ইরান থেকে ইরাকে প্রচুর পরিমাণে গ্যাস ও বিদ্যুৎ রপ্তানি করা হয় এবং ইরাকও ইরানের একটি বড় বাণিজ্য অংশীদার। দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক সচল রাখতেই হরমুজ প্রণালিতে ইরাকের জাহাজকে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
পূর্বকোণ/আরআর


















