চট্টগ্রাম সোমবার, ০২ নভেম্বর, ২০২৬

মন্তব্য প্রতিবেদন

বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে আগামী কয়েকটি দিন

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন, ইসরায়েলের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও ইরান যুদ্ধের হুমকি

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

২ নভেম্বর, ২০২৬ | ৮:১৩ পূর্বাহ্ণ

বিশ্ব রাজনীতিতে উত্তেজনার নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন, ৪ নভেম্বর ইসরায়েলের নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের সম্ভাবনা এবং এরই মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের নতুন সামরিক হুমকি, তিনটি ঘটনা একই সময়ে বিশ্বকে এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে। ওয়াশিংটনের নির্বাচনী ফল, জেরুজালেমের ক্ষমতার সমীকরণ এবং তেহরানের পাল্টা আক্রমণের হুঁশিয়ারি শেষ পর্যন্ত শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ভবিষ্যৎও প্রভাবিত করতে পারে।

 

ওয়াশিংটন: ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার পরীক্ষা
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি এবং সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট হবে। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে থাকবে, নাকি রাজনৈতিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আসবে, তা নির্ধারিত হবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এটি কেবল কংগ্রেসের নির্বাচন নয়; তাঁর নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক নীতি ও পররাষ্ট্রনীতির ওপরও এক ধরনের গণরায়। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলে গেলে তাঁর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং ইরানসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্তের ওপর নজরদারি বাড়তে পারে।
নির্বাচনের সময়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের নতুন সামরিক হুমকি এবং সম্ভাব্য অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে নির্বাচনের পরই হামলা হবে- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নিশ্চিত তথ্য নেই।

 

জেরুজালেম: সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা
২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে ইসরায়েলে আবারও ঝুলন্ত পার্লামেন্টের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট ৫৩টি এবং সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৪৮টি আসন পেয়েছে। আরব দলগুলো পেয়েছে ১৯টি আসন। ১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন।
৪ নভেম্বর নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের পর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সরকার গঠনে আরও কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে।
আইজেনকোটের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মতাদর্শগতভাবে ভিন্ন বিরোধী দলগুলোকে একত্র করা এবং আরব দলগুলোর সমর্থন নিশ্চিত করা। অন্যদিকে নেতানিয়াহুও রাজনৈতিকভাবে এখনো প্রাসঙ্গিক। নতুন জোট কিংবা ঐক্য সরকার, কোনো সম্ভাবনাই পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে সরকার পরিবর্তন হলেই ফিলিস্তিন নীতিতে পরিবর্তন আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রীয় অধিকার, নিরাপত্তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নের সমাধান ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের স্থায়ী অবসান সম্ভব নয়।

 

তেহরান: পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি
সবচেয়ে তাৎক্ষণিক উদ্বেগের বিষয় ইরানকে ঘিরে নতুন সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা। ট্রাম্প সামরিক অভিযানের হুমকি জোরদার করেছেন। অন্যদিকে তেহরানও স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নতুন কোনো হামলা হলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
ইরানের পাল্টা আক্রমণ শুধু সরাসরি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ না-ও থাকতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও কৌশলগত অবকাঠামোও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও নৌবাণিজ্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সামরিক হুমকির পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনাও এখনো রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, ওয়াশিংটন ও তেহরান শেষ পর্যন্ত আলোচনার পথ বেছে নেবে, নাকি সামরিক শক্তির প্রদর্শন পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলবে।

 

বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য
ভৌগোলিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে দূরে হলেও অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এই অঞ্চলের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। ফলে নতুন করে ইরান যুদ্ধ শুরু হলে বাংলাদেশ তার অভিঘাত থেকে মুক্ত থাকতে পারবে না।
প্রথম আঘাত আসবে জ্বালানি খাতে। বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানিনির্ভর। বাংলাদেশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এবং কাতার থেকে আমদানি করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)। হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ব্যাহত হলে জ্বালানি সরবরাহ ও আমদানি ব্যয় উভয়ই চাপে পড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের বার্ষিক আমদানি ব্যয় প্রায় ১২০ কোটি ডলার বাড়তে পারে বলে ফিচ রেটিংসের হিসাব। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, টাকার বিনিময় হার ও মূল্যস্ফীতিতে।
দ্বিতীয়ত, ঝুঁকিতে পড়বে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স। উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেক আসে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসীদের কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। এর প্রভাব শুধু জাতীয় অর্থনীতিতে নয়, লাখ লাখ প্রবাসী পরিবারের জীবনযাত্রায়ও পড়বে।
তৃতীয়ত, তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিবহন, জ্বালানি ও কাঁচামালের ব্যয় বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ও বীমা ব্যয় বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের প্রয়োজন তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি। জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুত, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তায় আগাম পরিকল্পনা জরুরি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। কোনো সামরিক পক্ষের সংঘাতে জড়িয়ে না পড়ে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা।
আগামী কয়েকটি দিন তাই শুধু ওয়াশিংটন ও জেরুজালেমের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না; মধ্যপ্রাচ্য নতুন সংঘাতের দিকে এগোবে, নাকি কূটনীতির পথে ফিরবে, তারও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেবে।
বিশ্বের এখন আরেকটি যুদ্ধ নয়, প্রয়োজন উত্তেজনা প্রশমন ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্ব। সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি উভয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, অধিকার এবং ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ন্যায্য আকাক্সক্ষাকে স্বীকৃতি দিতে হবে। বাংলাদেশের জন্যও এটাই হওয়া উচিত নীতিগত অবস্থান, শান্তি, সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইন এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট