চট্টগ্রাম সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬

ইসরায়েলের নির্বাচন: ফিলিস্তিনিদের মুক্তি ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন

নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের পরীক্ষা, গাজার ভবিষ্যৎ এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

২৬ অক্টোবর, ২০২৬ | ৭:৫৯ পূর্বাহ্ণ

আগামীকাল ২৭ অক্টোবর, ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এ নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ, ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, গাজার মানবিক বিপর্যয় এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রশ্ন। তাই এ নির্বাচনের তাৎপর্য শুধু ইসরায়েলি ভোটারদের প্রত্যাশা দিয়ে বিচার করলে চলবে না। দেখতে হবে, ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রহীনতা, দখলদারিত্ব ও অধিকারহীনতার অবসানে কোনো বাস্তব পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয় কি না।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য নির্বাচনটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান ব্যাপক প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি ও অবকাঠামোগত ধ্বংস ডেকে এনেছে। খাদ্য, পানি ও চিকিৎসার সংকট ফিলিস্তিনিদের জীবনকে বিপন্ন করেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্নটি শুধু নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকবেন কি না, তা নয়; প্রশ্ন হলো, যে নীতির ধারাবাহিকতায় ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হয়েছে, নতুন সরকার তা পরিবর্তন করবে কি না।

 

নেতৃত্বের জবাবদিহি
ইসরায়েলের রাজনীতিতে নিরাপত্তা একটি প্রধান নির্বাচনী ইস্যু। ৭ অক্টোবরের হামলা দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুতর ব্যর্থতা প্রকাশ করে। হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন এবং বহু মানুষ জিম্মি হন। পরবর্তী যুদ্ধ ইসরায়েলি সমাজেও গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে।
কিন্তু জবাবদিহির প্রশ্ন শুধু ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গাজায় বেসামরিক মানুষের জীবন রক্ষা, মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েলিদের নিরাপত্তার অধিকার যেমন স্বীকৃত, তেমনি ফিলিস্তিনিদের জীবন, স্বাধীনতা ও মর্যাদার অধিকারও অবিচ্ছেদ্য।
এক পক্ষের নিরাপত্তার যুক্তি অন্য পক্ষের ওপর অনির্দিষ্টকাল সামরিক নিয়ন্ত্রণ, বাস্তুচ্যুতি কিংবা অধিকারহীনতা চাপিয়ে দেওয়ার বৈধতা দিতে পারে না। দীর্ঘ সামরিক অভিযান যদি স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তবে নিরাপত্তানীতির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
ক্ষমতার অঙ্কে নির্ধারিত হবে সরকার ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে ১২০টি আসন রয়েছে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১ জন সদস্যের সমর্থন। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থায় বিভিন্ন দলের জোট গঠনের সক্ষমতা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি কতটি আসন পায়, বিরোধী দলগুলো কতটা সমর্থন অর্জন করে এবং ছোট দলগুলো কাকে সমর্থন দেয়- এসব বিষয় সরকার গঠনের সমীকরণ নির্ধারণ করবে। তবে আসনসংখ্যার পরিবর্তনকে ফিলিস্তিনিদের জন্য স্বয়ংক্রিয় বিজয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
নেতানিয়াহুর পরিবর্তে অন্য কেউ প্রধানমন্ত্রী হলেও ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের অবসান নিশ্চিত হবে না। নতুন সরকারের প্রকৃত অবস্থান বোঝা যাবে গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর, বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রীয় অধিকারের প্রশ্নে তার সিদ্ধান্ত থেকে।

 

ফিলিস্তিনিদের অধিকারই হোক পরিবর্তনের মাপকাঠি
ফিলিস্তিনিদের দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- নেতৃত্বের পরিবর্তনের সঙ্গে নীতিরও পরিবর্তন হবে কি না।
গাজায় যুদ্ধ বন্ধ, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরাপদে ঘরে ফেরার সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। একই সঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ, ফিলিস্তিনিদের ভূমি ও সম্পত্তির অধিকার রক্ষা এবং দখলদারত্বের অবসানে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ফিলিস্তিনিদের দুর্দশাকে শুধু মানবিক সহায়তার সংকট হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা আড়াল হয়ে যায়। খাদ্য ও ওষুধ প্রয়োজন, কিন্তু তার পাশাপাশি প্রয়োজন স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরা নির্ধারণের অধিকার। ফিলিস্তিনিরা শুধু যুদ্ধের শিকার জনগোষ্ঠী নন; তাঁরা নিজস্ব রাষ্ট্র, রাজনৈতিক পরিচয় ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারসম্পন্ন একটি জনগোষ্ঠী।
স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিকে কূটনৈতিক বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমারেখা ও প্রাসঙ্গিক জাতিসংঘের প্রস্তাবের ভিত্তিতে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বাস্তব পথ তৈরি করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকার, কার্যকর আন্তর্জাতিক উদ্যোগ এবং দখলদারিত্বের অবসানে ধারাবাহিক চাপ।

 

ন্যায়বিচার ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি অসম্ভব
ইসরায়েলের নির্বাচন ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক, প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ভবিষ্যৎকেও প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের অধিকারকে পাশ কাটিয়ে আঞ্চলিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা দীর্ঘস্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্ন অমীমাংসিত থাকলে সংঘাতের মূল কারণগুলো থেকেই যাবে। স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি, উভয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; তবে সেই নিরাপত্তার নামে ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকার বিসর্জন দেওয়া যাবে না।
বাংলাদেশের জন্যও এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির পক্ষে দৃঢ় থাকা এবং বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘনের বিরোধিতা করা বাংলাদেশের নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত মানবিক বিপর্যয় বন্ধে কার্যকর ভূমিকা নেওয়া এবং রাজনৈতিক সমাধানের জন্য উদ্যোগ জোরদার করা।

 

ভোটের ফল নয়, অধিকার প্রতিষ্ঠাই শেষ কথা
নির্বাচনের ফলাফল ইসরায়েলের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ভারসাম্য প্রকাশ করবে। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের জন্য এর গুরুত্ব নির্ধারিত হবে নতুন সরকারের কর্মকাণ্ড দিয়ে। গাজায় মানুষের দুর্ভোগ কমবে কি না, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ হবে কি না এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাস্তব পথ তৈরি হবে কি না- এসবই হবে পরিবর্তনের প্রকৃত সূচক।
ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রশ্ন কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এটি মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন ও জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্ন।
ফিলিস্তিনিদের প্রয়োজন শুধু ইসরায়েলের নেতৃত্বে পরিবর্তন নয়; প্রয়োজন দখলদারত্বের অবসান, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা এবং স্বাধীনভাবে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার। এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া ইসরায়েলের কোনো নির্বাচনী পরিবর্তনই মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির প্রতিশ্রুতি দিতে পারবে না।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট