দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা অর্থনৈতিক ধাক্কার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো অমিমাংসিত রয়ে গেছে, অথচ পরিস্থিতিগত ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা আগের চেয়ে কমে এসেছে।
বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত তাদের সাম্প্রতিক ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’-এ জানিয়েছে, কাঠামোগত সংস্কার ত্বরান্বিত না হলে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট, নিম্ন রাজস্ব সংগ্রহ, অব্যাহত মূল্যস্ফীতি, দুর্বল হতে থাকা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং ক্রমবর্ধমান রাজস্ব চাপের পুঞ্জীভূত প্রভাবে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ থাকতে পারে।
চরম দরিদ্র পরিবারের প্রায় অর্ধেক অংশই এখনো কোনো সরকারি বা সামাজিক সহায়তা পাচ্ছে না। এছাড়া, প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যরেখার সামান্য ওপরে থাকলেও যেকোনো বিপদে বা সংকটে যেকোনো মুহূর্তে আবার দরিদ্র হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে, সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে সরকারি ভর্তুকির সুফল সবসময় পৌঁছাচ্ছে না। বাংলাদেশ তার বার্ষিক জিডিপির প্রায় ৩.৫ শতাংশ জ্বালানি, সার ও সামাজিক নিরাপত্তায় ব্যয় করলেও এর একটি বড় অংশ ভুল জায়গায় অপচয় হচ্ছে। যেমন—শুধুমাত্র সবচেয়ে ধনী শহুরে পাঁচ ভাগের এক ভাগ জনগোষ্ঠীই বিদ্যুৎ ভর্তুকি ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক সুবিধা পেয়ে থাকে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, বিদ্যমান খাদ্য ভর্তুকি ও নগদ সহায়তা কর্মসূচিগুলোকে একত্রীকরণের পাশাপাশি আরও নির্ভুলভাবে প্রকৃত সুবিধাভোগী চিহ্নিত করা গেলে, খুব সামান্য অতিরিক্ত ব্যয়ে আরও অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করা সম্ভব।
মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়ে গেছে। ২০২৫ অর্থবছরের ১০ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ অর্থবছরে গড় সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ৮.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা পণ্যের দামের ওপর চাপ বজায় রেখেছে। কম বেতনের শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি ঋণাত্মক বা নেতিবাচকই রয়ে গেছে, যা তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
এর প্রভাব ইতোমধ্যেই দারিদ্র্যের পরিসংখ্যানে দৃশ্যমান। ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ অর্থবছরে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২২.৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সাথে, ২০২৬ অর্থবছরে দৈনিক ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন আরও প্রায় ২১ লাখ মানুষ। এতে বৈষম্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, দারিদ্র্য বিমোচনের গতি ধীর থাকবে এবং ২০২৭ অর্থবছরে জাতীয় দারিদ্র্যের হার আরও বেড়ে ২২.৮ শতাংশে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোর সমাধান না হওয়ায় যেকোনো পরিস্থিতিগত বা বাহ্যিক ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা দিন দিন কমে আসছে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। এমন বাস্তবতায় অর্থনীতিকে ঝুঁকিমুক্ত করতে জরুরি ভিত্তিতে তিন খাতে সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি।
বিশ্বব্যাংকের চিহ্নিত করা এই তিন অগ্রাধিকার খাতের মধ্যে রয়েছে— আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সুশাসন জোরদার করা এবং উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বাড়াতে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধি করা।
পূর্বকোণ/মিফতা

















