চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬

সর্বশেষ:

ন্যারেটিভ লন্ডারিং : আধুনিক তথ্যযুদ্ধের নতুন অস্ত্র

ন্যারেটিভ লন্ডারিং : আধুনিক তথ্যযুদ্ধের নতুন অস্ত্র

আবসার মাহফুজ

২৫ আগস্ট, ২০২৬ | ১২:৩১ অপরাহ্ণ

আজকের বিশ্বে যুদ্ধের ময়দান যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে যুদ্ধের ভাষাও। এখন একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শুধু সৈন্য পাঠায় না; পাঠায় গল্পও, পাঠায় কিছু বয়ানও। সেই গল্প ও বয়ান কখনো আসে ভুয়া সংবাদ হয়ে, কখনো আসে ‘বিশেষজ্ঞের মতামত’ হয়ে, কখনো ভাইরাল ভিডিও হয়ে, কখনো অজ্ঞাত সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট হয়ে। তারপর এক হাত থেকে আরেক হাতে ঘুরতে ঘুরতে একসময় তার জন্মপরিচয় হারিয়ে যায়।

 

তখন মিথ্যাটি আর মিথ্যা বলে মনে হয় না মনে হয়, ‘সবাই তো বলছে।’ এটিই ন্যারেটিভ লন্ডারিং। একটি ক্ষেপণাস্ত্র কোনো স্থাপনা ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু একটি সফল বয়ান একটি রাষ্ট্র সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দিতে পারে, সরকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে পারে, মিত্রদের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারে কিংবা সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে রাজনৈতিক সমর্থন বাড়াতে পারে। এই বাস্তবতায় ‘ন্যারেটিভ লন্ডারিং’ অর্থাৎ একটি সন্দেহজনক বা মিথ্যা বয়ানকে ধাপে ধাপে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার প্রক্রিয়া আধুনিক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।

 

সাম্প্রতিক ইরান-সংক্রান্ত একটি ঘটনা এই ঝুঁকিকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের মধ্যে ভারতের একটি অজ্ঞাত এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে কয়েকদিন আগে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ ভাহিদির নামে একটি বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। দাবি করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকা পর্যন্ত ইরানও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাবে। পোস্টটির সঙ্গে ভাহিদির ছবি এবং পারমাণবিক বিস্ফোরণের একটি এআই-তৈরি ছবি ছিল। কিন্তু ইরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে ভাহিদি এমন বক্তব্য দেননি।

 

আবার ভাহিদি এরকম বক্তব্য দেওয়ার নির্ভরযোগ্য প্রমাণও পাওয়া যায়নি। ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মিথ্যা উদ্ধৃতিটির পরবর্তী ধাপ ও যাত্রাপথগুলো। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কথিত বক্তব্যটি ভারতের আরেকটি অ্যাকাউন্টে অনূদিত হয়। এরপর ‘মোসাদ কমেন্টারি’ নামে একটি ইসরাইলি অ্যাকাউন্ট সেটি পুনরায় প্রচার করে। নামের সঙ্গে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের মিল থাকলেও অ্যাকাউন্টটির সঙ্গে মোসাদের কোনো নিশ্চিত সম্পর্ক ছিল না। পরে ইসরায়েলের একটি টেলিভিশন চ্যানেল দাবিটি প্রচার করে এবং এটিকে ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির ‘প্রথম প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করে।

 

এরপর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সেটি শেয়ার করেন। অল্পসময়ের মধ্যেই একই বয়ান যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে যায়। জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিনদূত মাইক ওয়াল্টজ এবং রিপাবলিকান সিনেটর রিক স্কটও তা শেয়ার করেন। পরে বয়ানটির সত্যতা না পাওয়ায় ওয়াল্টজ পোস্টটি মুছে দেন এবং ফক্স নিউজ স্বীকার করে, কথিত উদ্ধৃতিটি যাচাইহীন ও ভুল ছিল। কিন্তু ততক্ষণে মিথ্যা বয়ানটি বহু স্তরের বিশ্বাসযোগ্যতার আবরণ পেয়ে গেছে। একটি অজ্ঞাত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টের বক্তব্য সাধারণত খুব বেশি গুরুত্ব পায় না। কিন্তু একই বক্তব্য যখন অন্যভাষায় অনূদিত হয়, বিদেশি অ্যাকাউন্টে পুনঃপ্রচারিত হয়, টেলিভিশন চ্যানেলে আসে, রাজনৈতিক নেতা শেয়ার করেন এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের আলোচনায় জায়গা করে নেয়, তখন মানুষের কাছে সেটি আর আগের মতো সন্দেহজনক মনে হয় না। ন্যারেটিভ লন্ডারিংয়ের মূল শক্তি এখানেই।

 

উল্লেখ্য, ন্যারেটিভ লন্ডারিংকে অনেক সময় ‘ফেক নিউজ’ বলে সরলীকরণ করা হয়। কিন্তু দুটির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ফেক নিউজ হলো মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য। অন্যদিকে ‘ন্যারেটিভ লন্ডারিং’ হলো সেই তথ্যকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার একটি প্রক্রিয়া। অর্থপাচারে যেমন অবৈধ অর্থ বিভিন্ন লেনদেনের মধ্য দিয়ে ঘুরিয়ে বৈধ অর্থের মতো দেখানো হয়, তেমনি ন্যারেটিভ লন্ডারিংয়ে একটি মিথ্য ও সন্দেহজনক দাবি বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট, ওয়েবসাইট, সংবাদমাধ্যম, ইনফ্লুয়েন্সার, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ঘুরে এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে তার মূল উৎস আর সহজে দৃশ্যমান থাকে না। এখানে ‘কর্তৃত্বের স্থানান্তর’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

মানুষ প্রতিটি আন্তর্জাতিক সামরিক, কূটনৈতিক বা গোয়েন্দা-দাবি নিজে যাচাই করতে পারে না। তাকে নির্ভর করতে হয় সাংবাদিক, সংবাদমাধ্যম, বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর। ফলে একটি মিথ্যা দাবি যদি এই বিশ্বাসযোগ্যতার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে পারে, তাহলে তা মানুষের কাছে সত্যের মতো গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। প্রথম উৎসটি দুর্বল হলেও পরবর্তী উৎসগুলোর কর্তৃত্ব সেই দুর্বলতাকে আড়াল করে দেয়। ন্যারেটিভ লন্ডারিংকে তাই একটি নেটওয়ার্ক সমস্যা হিসেবেও দেখা প্রয়োজন। একটি মিথ্যা পোস্ট একা খুব শক্তিশালী নয়; তার শক্তি আসে পরিবহনকারী নেটওয়ার্ক থেকে। একজন দাবি করে, দ্বিতীয়জন অনুবাদ করে, তৃতীয়জন পুনঃপ্রচার করে, চতুর্থজন ব্যাখ্যা দেয়, পঞ্চমজন রাজনৈতিক বক্তব্যে ব্যবহার করে এবং ষষ্ঠজন সংবাদ প্রতিবেদন তৈরি করে।

 

একপর্যায়ে কেউই আর প্রথম উৎসটির দিকে ফিরে তাকায় না। তখন একই দাবির বহু পুনরাবৃত্তিকে মানুষ স্বাধীন একাধিক সূত্রের প্রমাণ হিসেবে ভুল করতে থাকে। অথচ একই অজ্ঞাত উৎস থেকে পাঁচটি ওয়েবসাইট তথ্য কপি করলে সেটি পাঁচটি স্বাধীন সূত্র নয়; এটি একটি উৎসের পাঁচটি প্রতিধ্বনি। ন্যারেটিভ লন্ডারিংয়ের অন্যতম কৌশল হলো একটি উৎসকে অনেক উৎসের মতো দেখানো। এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া সবাই একই ষড়যন্ত্রের অংশও নাও হতে পারে। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তৈরি করতে পারে, কেউ রাজনৈতিক কারণে তা ছড়াতে পারে, কেউ বেশি ভিউয়ের আশায় শেয়ার করতে পারে, আবার কেউ সত্যিই বিশ্বাস করতে পারে যে দাবিটি সঠিক। উদ্দেশ্য ভিন্ন হলেও তাদের সম্মিলিত আচরণ একই বয়ানকে শক্তিশালী করতে পারে। তাই শুধু ‘কারা ষড়যন্ত্র করেছে?’ প্রশ্ন করাই যথেষ্ট নয়; বরং জানতে হবে, কোন নেটওয়ার্ক কীভাবে একটি দাবিকে পরিবহন করেছে।

 

তথ্যযুদ্ধের কাঁচামালও সবসময় সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়। অনেক সময় বাস্তব ঘটনা, অসম্পূর্ণ তথ্য, মানুষের পূর্বধারণা এবং রাজনৈতিক আবেগ একত্র হয়ে একটি শক্তিশালী বিভ্রান্তিকর বয়ান তৈরি করে। কোনো সমাজে যদি একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আগে থেকেই সন্দেহ থাকে, তাহলে সেই সন্দেহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মিথ্যা তথ্য দ্রুত ছড়াতে পারে। রাজনৈতিক মেরুকরণ থাকলে একই ঘটনা দুই পক্ষের জন্য দুইধরনের বয়ান তৈরি করতে পারে। ধর্মীয় উত্তেজনা থাকলে পুরোনো ছবি নতুন সংঘাতের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সীমান্ত উত্তেজনার সময় অন্যদেশের পুরোনো ভিডিওকে নতুন হামলার দৃশ্য হিসেবে প্রচার করাও সম্ভব।

 

এরকম ঘটনা আমরা অসংখ্যবার দেখেছি। এখনও দেশের অভ্যন্তরে এবং বাইরে মিথ্যা বয়ান তৈরি করে তা সুকৌশলে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও নানাভাবে এমন বয়ান তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়ার অসংখ্য ঘটনা ঘটছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে এসব বয়ানের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব নয়। এই কারণে ন্যারেটিভ লন্ডারিং প্রচলিত ফেক নিউজের চেয়েও জটিল। সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি খণ্ডন করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু একটি বাস্তব ঘটনার সঙ্গে মিথ্যা ব্যাখ্যা যুক্ত হলে সমস্যা গভীর হয়। মানুষ বাস্তব ঘটনাটিকে দেখে এবং সেখান থেকে পুরো গল্পটিকেই সত্য বলে ধরে নেয়।

 

পরে ফ্যাক্ট-চেকার মিথ্যা অংশটি খণ্ডন করলেও বয়ানের আবেগগত প্রভাব থেকে যেতে পারে। মানুষ অনেক সময় প্রথমে যে তথ্যটি শুনেছে, সেটিই মনে রাখে; সংশোধনটি একই শক্তিতে স্মৃতিতে জায়গা করে নিতে পারে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এই প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করে। অ্যালগরিদম সাধারণত কোনো বক্তব্য সত্য কি না, তা যাচাই করে কনটেন্ট ছড়ায় না; বরং ব্যবহারকারীর মনোযোগ, প্রতিক্রিয়া, মন্তব্য, শেয়ার এবং অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেয়। ফলে উত্তেজক, ভয়-সৃষ্টিকারী বা সংঘাতপূর্ণ কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুবিধা পায়। যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক সংকটের সময় এই ঝুঁকি আরও বাড়ে।

 

মানুষ দ্রুত তথ্য চায়, সরকার দ্রুত ব্যাখ্যা দিতে চায়, সংবাদমাধ্যম দ্রুত সংবাদ প্রকাশ করতে চায় এবং রাজনৈতিক পক্ষগুলো নিজেদের অবস্থানের পক্ষে প্রমাণ খোঁজে। এই তাড়াহুড়োর পরিবেশে যাচাইয়ের সময় কমে যায়, অথচ প্রচারণার সুযোগ বেড়ে যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই সংকটকে আরও গভীর করছে। একটি মিথ্যা বয়ানের অসংখ্য সংস্করণ অল্পসময়ে তৈরি করা সম্ভব। একই দাবি বিভিন্ন ভাষায়, বিভিন্ন রাজনৈতিক আবেগে এবং বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের উপযোগী করে ছড়ানো যায়।

 

ফলে একটি বয়ান একইসময়ে বহু তথ্য-পরিবেশে প্রবেশ করতে পারে। ভবিষ্যতের বড় ঝুঁকি হতে পারে মানুষের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির অবকাঠামোকেও প্রভাবিত করা। বিপুল পরিমাণ ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ইন্টারনেটে ঢুকিয়ে দেওয়া গেলে সার্চ ইঞ্জিন ও এআই ব্যবস্থার তথ্যভিত্তিক উত্তর দেওয়ার পরিবেশও নষ্ট হতে পারে। তখন তথ্যযুদ্ধ শুধু মানুষের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে নয়; মানুষের তথ্য পাওয়ার অবকাঠামোর বিরুদ্ধেও পরিচালিত হবে।

 

বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সংঘাত, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, সীমান্ত, অভিবাসন, ধর্মীয় উত্তেজনা কিংবা আঞ্চলিক ভ‚রাজনীতি নিয়ে কোনো বিদেশি বয়ান বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ করলে সেটি দ্রুত স্থানীয় রাজনৈতিক ভাষা পেতে পারে। প্রথম উৎস হারিয়ে যেতে পারে; পরে স্থানীয় কোনো পেজ, ইউটিউবার কিংবা অনলাইন সংবাদমাধ্যম সেটিকে নতুন প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করতে পারে। তাই কোনো মিথ্যা বয়ানকে শুধু ‘বিদেশি প্রচারণা’ বললেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। দেখতে হবে, বিদেশি কোনো বয়ান কীভাবে স্থানীয় অসন্তোষ, রাজনৈতিক মেরুকরণ বা সামাজিক বিভাজনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন শক্তি অর্জন করছে।

 

এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র, সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক সবার দায়িত্ব রয়েছে। রাষ্ট্রকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য তথ্য দিতে হবে। সংবাদমাধ্যমকে শুধু সর্বশেষ পুনঃপ্রচারিত উৎস নয়, উৎসের উৎস খুঁজতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিকে সমন্বিত কৃত্রিম আচরণ শনাক্ত করতে হবে। আর নাগরিককে বুঝতে হবে একটি তথ্য বারবার চোখে পড়া এবং তথ্যটি সত্য হওয়া এক বিষয় নয়। ফ্যাক্ট-চেকিংকেও শুধু মিথ্যা খণ্ডনের প্রযুক্তি হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে তথ্য-সাক্ষরতার অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

 

একটি দাবির সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন কার্যকর হতে পারে: মূল উৎস কে? উৎসটি কি স্বাধীন? বক্তব্যের কোনো পূর্ণ ভিডিও, অডিও, নথি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ আছে কি? পরবর্তী সংবাদমাধ্যমগুলো কি স্বাধীনভাবে তথ্যটি যাচাই করেছে, নাকি একই পোস্ট পুনরাবৃত্তি করেছে? কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক পক্ষ এই দাবির মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে লাভবান হচ্ছে কি? তথ্যটি কি বাস্তব কোনো ঘটনার সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করা হয়েছে, যাতে মিথ্যা অংশটি সত্যের আড়ালে লুকিয়ে যায়? এর পাশাপাশি প্রয়োজন ‘অ্যাট্রিবিউশন ডিসিপ্লিন’।

 

প্রমাণ ছাড়া কোনো রাষ্ট্র, গোয়েন্দা সংস্থা বা রাজনৈতিক সংগঠনের ওপর দায় চাপানো উচিত নয়। কোনো ভুয়া তথ্য ভারত থেকে এসেছে বলেই ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দায়ী এমন সিদ্ধান্ত যেমন অযৌক্তিক, তেমনি কোনো তথ্য ইসরায়েলি বা মার্কিন কোনো অ্যাকাউন্টে ছড়িয়েছে বলেই সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দায়ী এমন সিদ্ধান্তও গ্রহণযোগ্য নয়। তথ্যযুদ্ধ বিশ্লেষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো প্রমাণের মানদণ্ড সবার জন্য একই রাখা।

 

ইরান-সংক্রান্ত ভুয়া উদ্ধৃতির ঘটনাটি সবার সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হতে পারে। একটি সন্দেহজনক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বহুস্তরীয় রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম নেটওয়ার্ক অতিক্রম করে এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে তার প্রাথমিক উৎস প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। যখন দাবিটি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বক্তৃতায় পৌঁছে যায়, তখন প্রশ্নটি আর থাকে না ‘প্রথমে কে বলেছিল?’ বরং প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় ‘ইরান কি সত্যিই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কথা স্বীকার করেছে?’ এই পরিবর্তনটিই ন্যারেটিভ লন্ডারিংয়ের সাফল্য। ভুল তথ্য পরে সংশোধন করা যায়, কিন্তু তার রাজনৈতিক প্রভাব সবসময় সংশোধন করা যায় না।

 

একটি পোস্ট মুছে ফেলা সম্ভব, একটি বক্তব্য প্রত্যাহার করা সম্ভব, একটি সংবাদ সংশোধন করা সম্ভব। কিন্তু সেই বক্তব্য শুনে যে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছে, যে রাজনীতিবিদ অবস্থান নিয়েছেন, যে সংবাদমাধ্যম শিরোনাম করেছে কিংবা যে জনমত তৈরি হয়েছে সেগুলোকে এক ক্লিকে মুছে ফেলা যায় না। তাই ন্যারেটিভ লন্ডারিংকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাধারণ গুজব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আধুনিক তথ্যযুদ্ধের একটি কাঠামোগত কৌশল, যেখানে মিথ্যা নিজে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো মিথ্যাকে সত্যের মতো দেখানোর জন্য তৈরি করা নেটওয়ার্ক।

 

এই নেটওয়ার্কে অজ্ঞাত অ্যাকাউন্ট, অনুবাদক, ইনফ্লুয়েন্সার, সংবাদমাধ্যম, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং কখনো কখনো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বক্তাও একই বয়ানের পরিবহনকারী হয়ে উঠতে পারেন, ইচ্ছাকৃতভাবে কিংবা অনিচ্ছাকৃতভাবে। আজকের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু ‘খবরটি কী?’ নয়। প্রশ্ন হলো খবরটি কীভাবে তৈরি হলো, কীভাবে ছড়াল এবং কীভাবে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠল? কে তৈরি করেছে? কে প্রথম ছড়িয়েছে? কে অনুবাদ করেছে? কে পুনরাবৃত্তি করেছে? কে বিশ্বাসযোগ্যতার আবরণ দিয়েছে? কে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে? এবং শেষপর্যন্ত এই বয়ান থেকে কে লাভবান হয়েছে? কারণ ন্যারেটিভ লন্ডারিং সত্যকে সরাসরি মিথ্যায় বা মিথ্যাকে সরাসরি সত্যে রূপান্তর করে না। বরং এটি মানুষের সত্য-মিথ্যা আলাদা করার সামাজিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়।

 

যখন একটি সমাজ সত্য যাচাইয়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা হারায়, তখন অস্থিরতা সৃষ্টি করতে সবসময় ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হতে পারে শুধু একটি অজ্ঞাত উৎস, কয়েকটি পুনরাবৃত্তি, কিছু রাজনৈতিক সমর্থন এবং সামাজিক বিভাজন। ন্যারেটিভ লন্ডারিংকে তাই নিছক ‘ভুয়া খবরের নতুন নাম’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি তথ্যকে অস্ত্রে পরিণত করার একটি সুসংগঠিত পদ্ধতি। এর লক্ষ্য মানুষের হাতে মিথ্যা তুলে দেওয়া যতটা, তার চেয়ে বেশি হলো মানুষের সত্য শনাক্ত করার ক্ষমতাকে দুর্বল করা। আর সেই কারণেই এর বিরুদ্ধে লড়াই শুধু সাংবাদিকের দায়িত্ব নয়, শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও নয়। এটি সমগ্র সমাজের দায়িত্ব।

পূর্বকোণ/নুসরাত

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট