চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬

সর্বশেষ:

ভারতের মহাকাশ খাত: বৈশ্বিক অংশীদারত্বের এক উৎক্ষেপণ মঞ্চ

ভারতের মহাকাশ খাত: বৈশ্বিক অংশীদারত্বের এক উৎক্ষেপণ মঞ্চ

১৩ আগস্ট, ২০২৬ | ২:১২ অপরাহ্ণ

মহাকাশ খাতে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা ভারতের সামনে এমন একটি আখ্যান গড়ে তোলার অনন্য এক সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে, যেখানে সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতাই হবে মহাকাশ অনুসন্ধানের চালিকাশক্তি। একটি নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী মহাকাশচারী দেশ হিসেবে স্বীকৃত ভারত এখন তার প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে দীর্ঘস্থায়ী আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বে রূপান্তরিত করার জন্য উপযুক্ত অবস্থানে রয়েছে, যা বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে অবদান রাখবে।

 

মহাকাশে ভারতের যাত্রা হলো স্বতন্ত্র। অন্যান্য অনেক মহাকাশ কর্মসূচি যখন স্নায়ুযুদ্ধের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে উদ্ভূত হয়েছিল, সেগুলোর বিপরীতে ভারতের মহাকাশ কর্মসূচি পরিকল্পিত হয়েছিল জাতীয় উন্নয়নের একটি হাতিয়ার হিসেবে। ড. বিক্রম সারাভাই ভারতের মহাকাশ ভাবনার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন এমন সব ব্যবহারিক প্রয়োগের ওপর, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে উন্নত করবে। তাঁর নেতৃত্বের অধীনে যোগাযোগব্যবস্থা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও শিক্ষাকে শক্তিশালী করার জন্য স্যাটেলাইট তৈরি করা হয়েছিল। এই উন্নয়নমুখী দর্শন ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে এখনও রয়েছে এবং সেটা গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর প্রয়োজনের সঙ্গেও গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেসব দেশ কেবল মর্যাদা অর্জনের জন্য নয়, বরং মহাকাশ প্রযুক্তির ব্যবহারিক প্রয়োগ প্রত্যাশা করে থাকে।

 

আজকে, ভারতের অর্জনসমূহ উন্নয়নমূলক প্রয়োগের গণ্ডিকে ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হয়েছে। চন্দ্রযান মিশনসমূহ, মার্স অরবিটার মিশন, আদিত্য-এল১ সৌর পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ও আসন্ন গগনযান মানব মহাকাশযান কর্মসূচি ভারতকে এমন একটি দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যে দেশটি অত্যাধুনিক ও নির্ভরযোগ্য মহাকাশ অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম। চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে চন্দ্রযান-৩-এর সফল সফট ল্যান্ডিং ভারতকে বিশ্বের মহাকাশ শক্তিগুলোর একটি বিশেষ গোষ্ঠীতে স্থান করে দিয়েছে এবং একই সঙ্গে এটিও প্রমাণ করেছে যে তুলনামূলকভাবে স্বল্প খরচেও বিশ্বমানের উদ্ভাবন অর্জন করা সম্ভব।

 

বিশ্বের মহাকাশ অর্থনীতি যখন দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, তখনই ভারতের ক্রমবর্ধমান বিশ্বাসযোগ্যতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বর্তমানে ৬০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি মূল্যমানের এই খাতটি ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় ১.৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। স্যাটেলাইট যোগাযোগ, পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, নেভিগেশন, জলবায়ু পরিষেবা, ব্রডব্যান্ড সংযোগ এবং ইন-অরবিট সার্ভিসিং ও চন্দ্র অনুসন্ধানের মতো উদীয়মান ক্ষেত্রগুলোতে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা এই খাতের প্রবৃদ্ধিকে ক্রমশ ত্বরান্বিত করছে। অনেক দেশই এই ক্ষেত্রটিতে অংশগ্রহণ করার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে থাকে, কিন্তু তাদের নিজস্ব সক্ষমতার অভাব রয়েছে। তারা কেবল উৎক্ষেপণ পরিষেবা প্রদানকারী নয়, বরং নির্ভরযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার খুঁজছে।

 

এই চাহিদাসমূহ পূরণ করার সক্ষমতা ভারতের রয়েছে। ২০২০ সালে মহাকাশ খাতের উদারীকরণ বেসরকারি অংশগ্রহণের জন্য এই খাতকে উন্মুক্ত করে দেওয়ার মাধ্যমে সমগ্র ইকোসিস্টেমকে রূপান্তরিত করেছে। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল স্পেস প্রোমোশন অ্যান্ড অথরাইজেশন সেন্টার (ইন-স্পেস)-এর প্রতিষ্ঠা, নিউস্পেস ইন্ডিয়া লিমিটেডের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক ভূমিকা এবং বেসরকারি উদ্যোগসমূহের বিকাশ লাভ বিশ্বের অন্যতম গতিশীল উদীয়মান মহাকাশ ইকোসিস্টেমকে গড়ে তুলেছে। ভারতীয় স্টার্টআপগুলো উৎক্ষেপণযান, স্যাটেলাইট প্ল্যাটফর্ম, জিওস্পেশিয়াল অ্যাপ্লিকেশনসমূহ ও প্রপালশন প্রযুক্তির উন্নয়ন সাধন করছে, যা বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও গ্রাহকদের আকৃষ্ট করছে। স্কাইরুট অ্যারোস্পেস, পিক্সেল ও অগ্নিকুল কসমস-এর মতো সংস্থাগুলো প্রমাণ করেছে যে, উন্নত মহাকাশ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ভারতীয় বেসরকারি উদ্যোগসমূহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম। এর পরবর্তী পদক্ষেপ হলো এই ইকোসিস্টেমটির আন্তর্জাতিকীকরণ করা।

 

 

শুধুমাত্র একটি স্বল্প খরচের উৎক্ষেপণ গন্তব্য হিসেবে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ না করে, ভারত স্যাটেলাইট ডিজাইন, উৎক্ষেপণ পরিষেবা, মিশন পরিচালনা, গ্রাউন্ড স্টেশন, নভোচারী প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো প্রয়োগক্ষেত্রগুলোতে ব্যাপক অংশীদারিত্বের সুযোগ প্রদান করবে। এই ধরণের সমন্বিত অংশীদারত্ব গ্লোবাল সাউথ ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সেইসব দেশগুলোর জন্য মূল্যবান হবে, যেসব দেশ তাদের উন্নয়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারসমূহ পূরণ করার ব্যাপারে সাশ্রয়ী, প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি ও নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তির সন্ধান করছে।

 

 

ভারত এই ধরণের সহযোগিতার ক্ষেত্রে কূটনৈতিক গুরুত্ব প্রদর্শন করেছে। সাউথ এশিয়া স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ভারত প্রতিবেশী দেশগুলোকে যোগাযোগ ও উন্নয়নমূলক সুবিধা প্রদান করেছে। ভারতীয় উৎক্ষেপণ যানগুলো বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও বাণিজ্যিক সংস্থাসমূহের জন্য শত শত বিদেশি স্যাটেলাইটকে সফলভাবে কক্ষপথে স্থাপন করেছে। আর্টেমিস অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে ভারতের সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে চাঁদ অনুসন্ধানে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ভারতের আগ্রহের প্রতিফলন ঘটেছে। নাসা, ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি ও জাক্সা-র সঙ্গে সহযোগিতা ভারতের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে আরও সুদৃঢ় করে তুলেছে।

 

এই অংশীদারিত্বসমূহ গ্লোবাল সাউথের একটি নেতৃস্থানীয় কণ্ঠস্বর হিসেবে ভারতের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করে। ভারত প্রযুক্তিগত নির্ভরশীলতা সৃষ্টি করার পরিবর্তে সাশ্রয়ীতা, নির্ভরযোগ্যতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে উন্নয়নমূলক অংশীদারত্বের সুযোগ প্রদান করে থাকে। সুতরাং, মহাকাশ সহযোগিতা ভারতীয় কূটনীতির একটি ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার পাশাপাশি বাস্তব ও দৃশ্যমান উন্নয়নমূলক সুবিধাসমূহও প্রদান করছে।

 

এর পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য সংস্কারের গতিধারা অব্যাহত রাখাকে লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করবে ভারত। দ্রুততর নিয়ন্ত্রক অনুমোদন, ভেঞ্চার ক্যাপিটালের ক্ষেত্রে বৃহত্তর প্রবেশাধিকার, সুদৃঢ় মেধাস্বত্ব সুরক্ষা এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত ও শিক্ষাঙ্গনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতর সহযোগিতা অপরিহার্য হবে। সরকারি ক্রয় নীতিসমূহ ভারতীয় স্টার্টআপগুলোকে অব্যাহতভাবে সমর্থন প্রদান করে যাবে, যা তাদের কার্যক্রমের পরিসর বৃদ্ধি করতে, উদ্ভাবন করতে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে একীভূত হতে সক্ষম করবে।

 

মহাকাশ পরিচালনা ও শাসনব্যবস্থাকে রূপদান করার ক্ষেত্রে ভারত আরও বড়ো ভূমিকা পালনের অবস্থানে রয়েছে। কক্ষপথে ভিড়, মহাকাশের আবর্জনা, দায়িত্বশীলভাবে সম্পদের ব্যবহার এবং উদীয়মান মহাকাশ সুযোগসমূহে ন্যায়সঙ্গত প্রবেশাধিকার ক্রমেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জরুরি উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে। মহাকাশ কার্যক্রমের পরিধি যতো বৃদ্ধি পাবে, দায়িত্বশীল নীতি ও চর্চার বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে তুলতে সক্ষম দেশগুলোর প্রয়োজনও ততোই বৃদ্ধি পাবে। মহাকাশের শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের প্রতি ভারতের দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার এবং ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত সক্ষমতা একত্রে দেশটিকে স্বচ্ছতা, স্থায়িত্ব ও ন্যায়সঙ্গত প্রবেশাধিকারকে উৎসাহিত করে এমন বিধি প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে অর্থবহ অবদান রাখার সক্ষমতা প্রদান করেছে।

 

মহাকাশে কোন্‌ দেশগুলো নেতৃত্ব প্রদান করবে, আগামী দশকটি শুধু সেটাই নির্ধারণ করবে না, বরং মহাকাশ কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটাও নির্ধারণ করবে। বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা, উদ্যোক্তা ইকোসিস্টেম ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতার কারণে প্রতিষ্ঠিত ও উদীয়মান মহাকাশ শক্তিগুলোর মধ্যে ব্যবধান দূর করার ক্ষেত্রে ভারত এক অনন্য অবস্থানে রয়েছে। অন্তর্ভুক্তিমূলকতা, পারস্পরিক কল্যাণ ও উদ্ভাবনের ভিত্তিতে সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে ভারত তার মহাকাশ কর্মসূচিকে বৈশ্বিক সম্পৃক্ততার একটি প্রধান স্তম্ভে রূপান্তর করতে পারে।

 

ক্রমবর্ধমানভাবে বিভক্ত এই বিশ্বে, ভারতের মহাকাশ খাত একটি শক্তিশালী বার্তা প্রদান করে যে, মহাকাশ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অর্জনগুলো হলো সেগুলোই, যা দেশগুলোকে একত্রিত করে। এটিই হয়তো মানবজাতির পরবর্তী অগ্রযাত্রায় ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী অবদান হয়ে উঠবে।

লেখক: গুরজিৎ সিং, প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত এবং লেখক

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট