ভারত ও পাকিস্তানের ১১৬ জন বিশিষ্ট রাজনীতিক, সাবেক কূটনীতিক, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং শেহবাজ শরিফের কাছে একটি যৌথ খোলা চিঠি লিখেছেন। সেখানে তারা দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার এবং স্বাভাবিক সংলাপ শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা, কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি, বাণিজ্য ও যোগাযোগ বন্ধ থাকা এবং কাশ্মীরসহ বিভিন্ন অমীমাংসিত ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরে সংলাপ স্থবির থাকায় দুই দেশের ১১৬ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি এই খোলা চিঠি লিখেছেন।
গত মঙ্গলবার (৩০ জুন) লেখা ওই চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ভারতের ৬১ জন এবং পাকিস্তানের ৫৫ জন ব্যক্তি রয়েছেন। চিঠিটি সমন্বয় করেছেন ও পি শাহ, যিনি সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড প্রোগ্রেস-এর চেয়ারম্যান।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি, স্বাভাবিক সম্পর্ক, সংলাপ ও সহযোগিতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় দুই সরকারের অর্থবহ ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। মতপার্থক্য নিরসনের একমাত্র কার্যকর পথ হচ্ছে অব্যাহত সংলাপ ও সম্পৃক্ততা।’
চিঠিতে যারা স্বাক্ষর করেছেন
স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক দুই মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহ ও মেহবুবা মুফতি, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং তথা ‘র’-এর সাবেক প্রধান এ এস দুলাত, রাজ্যসভার এমপি মনোজ ঝা, পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিক আশরাফ জাহাঙ্গির কাজি, বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা মিরওয়াইজ ওমর ফারুক, ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মণি শঙ্কর আইয়ার এবং পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী খুরশিদ মাহমুদ কাসুরি।
চিঠিতে যেসব দাবি জানানো হয়েছে
স্বাক্ষরকারীরা দুই সরকারের প্রতি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে: পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং একে অপরের দেশে আবার হাইকমিশনার নিয়োগ, ফের স্বাভাবিক ভিসা সেবা চালু করা, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা দ্বিপক্ষীয় সংলাপ পুনরায় শুরু করা এবং দুই দেশের মধ্যে সব ধরনের অমীমাংসিত ইস্যু নিয়ে নিয়মিত আলোচনা।
চিঠিতে জম্মু ও কাশ্মীর ইস্যুতে নতুন করে আলোচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ২০০৪ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে যে আলোচনার কাঠামো তৈরি হয়েছিল, সেটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে উভয় দেশের নিরাপত্তা উদ্বেগ বিবেচনায় রেখে সীমান্ত এলাকায় সামরিক উত্তেজনা হ্রাস এবং ধাপে ধাপে নিরস্ত্রীকরণের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
চিঠিতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে: দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য পুনরায় চালু করতে হবে, সমমানের বৈষম্যহীন বাণিজ্য ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং আটারি-ওয়াগাহ সীমান্তের স্থলবন্দর আবার খুলে দিতে হবে।
এছাড়া চিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা দিল্লি-লাহোর বাস সার্ভিস পুনরায় চালু করা, শ্রীনগর-মুজাফ্ফরাবাদ বাস সার্ভিস চালু করা, সমঝোতা এক্সপ্রেস ও থর এক্সপ্রেস ট্রেন পুনরায় চালু করা, কারগিল-স্কার্দু রুট খুলে দেওয়া এবং বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের জন্য দুই দেশের আকাশসীমা পুনরায় উন্মুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে: করতারপুর কোরিডর পুনরায় পুরোপুরি চালু করতে হবে, সারতা পীঠ তীর্থযাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, শিল্পী ও ব্যবসায়ীদের পারস্পরিক সফর সহজ করতে হবে এবং গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ শিথিল করতে হবে।
‘সংঘাত নয়, শান্তিই হোক দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ’
চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ বিভাজন ও সংঘাত নয়, বরং শান্তি, সমৃদ্ধি এবং যৌথ অগ্রগতির ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে। স্বাক্ষরকারীরা আরও উল্লেখ করেন, ভারত ও পাকিস্তান মিলিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ মানুষের আবাসস্থল, যার বড় অংশই তরুণ। দুই দেশের চলমান বৈরিতা লাখো তরুণের কর্মসংস্থান, উন্নয়ন এবং নিরাপদ ভবিষ্যতের সুযোগ সীমিত করছে।
চিঠির শেষাংশে দুই সরকারকে বিচ্ছিন্নতার পরিবর্তে সম্পৃক্ততা, বৈরিতার পরিবর্তে সংলাপ এবং সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতার পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
পূর্বকোণ/আদর
















